রাজনীতিতে ভবিষ্যদ্বাণী একটি মজার বিদ্যা। এখানে কেউ কেউ এমনভাবে ভবিষ্যৎ দেখতে পান, যেন তাঁদের ড্রয়িংরুমে বসেই ভাগ্যের কাঁচের গোলকটি রাখা আছে। সমস্যা শুধু এই যে, গোলকের ভেতর যা দেখা যায়, বাস্তবে তার সঙ্গে মিল খুঁজতে গেলে গোলকটিকেই কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে হয়।
গত কয়েক সপ্তাহ ধরে আওয়ামী লীগের একাংশের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বেশ সরগরম প্রচারণা—শেখ হাসিনা নাকি আগামী ডিসেম্বরে দেশে ফিরছেন! কীভাবে ফিরবেন, সঙ্গে কারা থাকবেন, ফিরে কী কী করবেন—তারা সবই প্রায় তৈরি করে ফেলেছেন! ৭ অক্টোবর থেকে কল্পনার পালে নতুন হাওয়া লেগেছে। কেউ কেউ চার/পাঁচটি সূত্রের বরাত দিয়ে দায়িত্ব নিয়ে প্রচার করছেন, “আন্তর্জাতিক বাহিনী তাঁকে নিয়ে আসবে”; কেউ বলছেন, “সেনাবাহিনী তাঁকে পূর্ণ নিরাপত্তা দেবে”; আর কারও কল্পনায় “ভারতীয় সার্জিক্যাল স্ট্রাইক” তাঁকে সরাসরি বাংলাদেশে নামিয়ে দেবে! রাজনীতির বাজারে কল্পনার দাম চড়া, বিশেষত যখন বাস্তবের দোকানে বিক্রি করার মতো খবর কম থাকে।
এ প্রসঙ্গে গত ৬ অক্টোবর এক বন্ধুকে লিখেছিলাম, “মোদি যদি নিজেও সঙ্গে আসেন, তবুও হাসিনাকে ফেরাতে পারবেন না। যিনি জীবনের ভয়ে দেশ ছেড়েছেন, তিনি আর কখনো ফিরবেন না। দেশে তাঁর জীবনের নিরাপত্তা নেই, এটা তিনি নিজেও জানেন। তাই যতই লোভ বা সম্মান দেখানো হোক, তাতে লাভ নেই। এসব আওয়াজের উদ্দেশ্য, দেশে একটা হ-য-ব-র-ল পরিস্থিতি তৈরি করে সরকার পরিবর্তনের সুযোগ খোঁজা ছাড়া আর কিছু নয়।”
পরদিন দেখলাম, সেই হ-য-ব-র-ল তৈরির মহড়া যেন শুরু হয়ে গেছে। অনলাইন দুনিয়ায় ঢাকঢোল, দামামা, শঙ্খধ্বনি—সবই আছে; শুধু হাসিনার ফেরার নির্ভরযোগ্য খবরটি নেই। তারা হাওয়াই গল্প ছড়াচ্ছে, “ভারত, আমেরিকা ও ব্রিটেন নাকি যৌথ নিরাপত্তা বাহিনী পাঠানোর চুক্তি করেছে”! গল্পের ডালপালা এমনভাবে ছড়াচ্ছে যে, শেষ পর্যন্ত গাছটি কোথায় লাগানো হয়েছিল, তা খুঁজে পাওয়াই মুশকিল। প্রচারণার সূত্র হিসেবে ভারতের নর্থ ইস্ট নিউজের একটি ভোঁজবাজি প্রতিবেদনকে সামনে আনা হচ্ছে। সেই সূত্র ধরে বিভিন্ন পর্যায়ের আওয়ামী নেতা ও অনলাইন কর্মীরা প্রচারটিকে আরও ছড়িয়ে দিচ্ছেন। কিন্তু একটি অনলাইনে দায়িত্বহীন ও সূত্রবিহীন প্রতিবেদনে কিছু লেখা থাকলেই তা রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত হয়ে যায় না। তা হলে সংবাদপত্রের বদলে ভবিষ্যতে রূপকথার বই পড়েই পররাষ্ট্রনীতি নির্ধারণ করা যেত।
স্মরণ করে দেখুন তো, শেখ হাসিনা দেশ ছাড়লেন কেন? তিনি বাংলাদেশ থেকে পালিয়ে গেছেন মৃত্যুর ভয়ে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের আগে তাঁর সামনে রাজনৈতিক সমঝোতার কোনো পথ ছিল কি না, সে বিতর্ক থাকতেই পারে। কিন্তু তার নির্দেশে হাজার হাজার মানুষ খুন ও অর্ধলক্ষ আহত করার পর তাঁর আর করার কিছু ছিল না। যখন বুঝতে পারলেন, পায়ের নিচ থেকে মাটি সরে গেছে, তখন দেশে থাকা মানে জনতার হাতে নিশ্চিত মৃত্যু। তখন পালানো ছাড়া তাঁর জীবন বাঁচানোর কোনো উপায় ছিল না। তাঁর শাসনামলকে ঘিরে যে গভীর ক্ষত ও ক্ষোভ তৈরি করেছে, তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কয়েকটি পোস্ট দিয়ে মুছে ফেলা সম্ভব নয়। ক্ষমতার মসনদে বসে যে মানুষটি দীর্ঘদিন রাষ্ট্রযন্ত্রের ওপর নির্ভর করেছেন, ক্ষমতা হারানোর পর তাঁর সামনে সেই রাষ্ট্রযন্ত্রের জবাবদিহির প্রশ্নই বড় হয়ে উঠেছে। আশ্রয় পাওয়া আর দেশে ফিরে রাজনৈতিক বৈধতা ফিরে পাওয়া এক কথা নয়। প্রথমটির জন্য অন্য রাষ্ট্রের দরজা যথেষ্ট; দ্বিতীয়টির জন্য প্রয়োজন নিজ দেশের জনগণের আস্থা, আর গুরুতর অভিযোগ থাকলে আইনের মুখোমুখি হওয়ার সাহস।
ভারত তাঁকে আশ্রয় দিয়েছে—এটি এক বিষয়; তাঁকে আবার বাংলাদেশের ক্ষমতার রাজনীতিতে ফিরিয়ে আনার ঝুঁকি নেওয়া সম্পূর্ণ অন্য বিষয়। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থান ভারতের নীতিনির্ধারকদের জন্যও বড় ধাক্কা ছিল। বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়ে গবেষণা, গোয়েন্দা বিশ্লেষণ ও কূটনৈতিক যোগাযোগের বিশাল ব্যবস্থা থাকার পরও বাংলাদেশে হাসিনার বিরুদ্ধে জনরোষের গভীরতা ও বিস্ফোরণক্ষমতা যথাসময়ে অনুধাবন করতে পারেনি দেশটি। প্রতিবেশী দেশ হিসেবে বাংলাদেশের জনগণের মনোভাব বোঝার চেয়ে কোনো একটি সরকারের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হলে তার মাশুল একসময় কূটনীতিকেও দিতে হয়। রাষ্ট্রের সঙ্গে রাষ্ট্রের সম্পর্ক আর একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক পরিবারের সঙ্গে সম্পর্ক যে এক জিনিস নয়, সেটি বুঝতে দেরি হয়ে গেলে খেসারত দিয়ে পার পাওয়া যায় না।
এবার একটু অনলাইন রাজনীতির কথা বলা যাক। আমি ‘৩৬ জুলাই’র প্রবর্তক; জুলাই আন্দোলনের সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয় থেকে আন্দোলনে শক্তি যুগিয়েছিলাম, মানুষজনকে রাস্তায় নামতে উদ্বুদ্ধ করেছিলাম। দীর্ঘ ফ্যাসিস্ট আমলে অনলাইনে বিরামহীন প্রচার চালিয়েছি, মানুষকে আন্দোলনে যুক্ত হওয়ার আহ্বান জানিয়েছি, স্বৈরাচারবিরোধী জনমত তৈরিতে অংশ নিয়েছি। ফলে অনলাইন প্রচারণার শক্তি ও সীমাবদ্ধতা—দুটিই আমার অজানা নয়। কিন্তু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হইচই করলেই কি সরকার পড়ে যায়? তা হলে পৃথিবীর প্রতিটি দেশের সরকারই প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে প্রথমে ফেসবুক পরীক্ষা করত, তারপর মন্ত্রিসভার বৈঠকে বসত!
বাস্তবতা হলো, অনলাইন প্রচারণা জনমত তৈরিতে সাহায্য করে; কিন্তু শাসন পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজন মাঠের আন্দোলন, জনসমর্থন, রাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তন এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ভিত নড়ে যাওয়ার মতো বাস্তব অবস্থা। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে এসব উপাদান একসঙ্গে মিলেছিল। সেই জায়গায় পৌঁছাতে দীর্ঘ ১৬ বছরব্যাপি সংগ্রাম করতে হয়েছে। এখন যারা ভাবছেন, কয়েক মাস ধরে ‘ডিসেম্বরে হাসিনা ফিরবেন’ বলে প্রচার চালালেই পরিস্থিতি পাল্টে যাবে, তাঁরা সম্ভবত মাধ্যমটিকে ফলাফল ভেবে বসেছেন। মাইক্রোফোনে আওয়াজ বাড়ালেই বক্তার যুক্তি বাড়ে না; কখনো শুধু প্রতিবেশীর বিরক্তি বাড়ে।
আমার ব্যক্তিগত হিসাব বলছে, শেখ হাসিনার দেশে ফেরার সম্ভাবনা নিয়ে এই প্রচারণার সঙ্গে বাস্তবতার দূরত্ব অনেক। তবে ভবিষ্যৎ সম্পর্কে শতভাগ নিশ্চয়তা দেওয়ার দাবি করছি না। রাজনীতিতে অসম্ভব বলে কিছু নেই, কিন্তু সব সম্ভাবনারই দাম এক নয়। “ডিসেম্বরে হাসিনা ফিরবে” বলে নানা রকম আওয়াজ তোলা হলেও আসলে হাসিনা আসবে না। কেননা সূত্র বলে, “গণহত্যাকারী পালিয়ে বাঁচতে পারলে সে আর দেশে ফিরে না”। আমার মতে, বাস্তবে হাসিনা কিন্তু ভীষণ ভীতু, ক্ষমতায় থেকেও নিজের এরিয়াতে নিজের লোকদের মধ্যে পাবলিক প্রোগ্রাম করতে তার বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট পরতে হতো! তাই আমার হিসাব বলে, তিনি আর কখনই আসবেন না। এখন ক্ষমতার বাইরে থেকে দেশে ফেরার সিদ্ধান্ত নিতে হলে তাঁকে শুধু নিরাপত্তার হিসাব করতে হবে না; করতে হবে জনরোষ, আইনি পরিণতি ও রাজনৈতিক ভবিষ্যতের হিসাবও। অতএব ডিসেম্বরের ক্যালেন্ডারে তাঁর নাম লিখে রাখলেই তিনি বিমান থেকে নেমে পড়বেন, এমন সরল অঙ্ক রাজনীতিতে সচরাচর মেলে না। ডিসেম্বর এসে যদি দেখা যায় কিছুই ঘটেনি, তখন প্রচারকদের ব্যাখ্যা তৈরি করতে হবে—হয়তো তারিখ বদলেছে, হয়তো গোপন পরিকল্পনা, নয়তো ‘শেষ মুহূর্তে কৌশলগত সিদ্ধান্ত’। রাজনীতির ভবিষ্যদ্বক্তাদের হাতে অজুহাতের অভাব হয় না।
অনলাইনে ক্যাম্পেন চালিয়ে আমরা সফল হয়েছি দেখে তারাও মনে করছে সফল হবে। এখন প্রশ্ন হলো, হাসিনাকে নিয়ে ভারতকে জড়িয়ে এই কাঁচা হাতের প্রোপাগান্ডার দায় ঐ দেশটি কতদিন বহন করবে? হিসাব না করেই যারা “ভারতীয় সহায়তায় হাসিনা ফিরে আসছে” আওয়াজ তুলছেন—তারা কি জানেন না যে হাসিনা ও তাঁর দলবল গণহত্যাকারী হিসেবে অভিযুক্ত? হাসিনা যদি দেশে ফিরে আসে, তবে সকল বিভেদ ভুলে জুলাই যোদ্ধারা লাখ লাখ মানুষ নিয়ে আবার মাঠে নামবে হাসিনাকে ফাঁসিতে ঝোলাতে। তার আগমন ঠেকানোর জন্য যদি জনতা রাস্তায় নামে তবে সেই পরিস্থিতি সামাল দিবে কে?
এই প্রচারণার সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক অন্যত্র। ভারতকে জড়িয়ে এমন দাবি ছড়ালে দুই দেশের সম্পর্কেও অপ্রয়োজনীয় চাপ তৈরি হতে পারে। প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে সম্পর্কের নামে প্রতিবেশীকেই বিপদে ফেলা কূটনীতির কোন অধ্যায়ে শেখানো হয়, তা আমার জানা নেই। বিএনপি সরকারের কাঠোর অবস্থান এবং আওয়ামী লীগের বাড়াবাড়ির অত্যাচারে শেষ পর্যন্ত খোদ ভারত সরকারই বলতে বাধ্য হয়েছে যে—"আমরা আইন অনুযায়ী হাসিনার প্রত্যার্পণ করব।" অর্থাৎ, ডিসেম্বর মাসে তারা হাসিনাকে পাঠাচ্ছে না। তার মানে ভারত নিজেই ডিসেম্বরে থিওরিতে জল ঢেলে দিয়েছে। ভারতও নিশ্চয়ই জানে, বাংলাদেশের জনগণের প্রতিক্রিয়া উপেক্ষা করে একজন হাসিনাকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা কূটনৈতিকভাবে কতটা ব্যয়বহুল হতে পারে।
শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ নিয়ে ভারতের অবস্থানটি গুরুত্বপূর্ণ। প্রত্যর্পণের আইনি প্রক্রিয়া, রাজনৈতিক আশ্রয় বা অবস্থান এবং কোনো ব্যক্তির স্বেচ্ছায় দেশে ফেরা—এগুলো আলাদা বিষয়। সুতরাং ডিসেম্বরে ফিরছেন’ প্রচারণার পক্ষে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ না থাকলে তাকে রাজনৈতিক কল্পকাহিনি হিসেবেই দেখা উচিত।
আরও একটি কথা আছে। আওয়ামী লীগের রাজনীতি চিরতরে বন্ধ হবে কি না, তা এখনই বলা কঠিন। তবে নিষিদ্ধের কাজটি বিচার প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে গেলে ভালো হয়, এমন মতটি খুব জোড়ালো। গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন, গুম, খুন ও প্রাণহানির অভিযোগের বিচার হওয়া দরকার। গুম-খুনের বিচার এবং নিজেদের অপকর্মের দায় স্বীকার করে ক্ষমা চাওয়া—এই রিকনসিলিয়েশন ছাড়া হাসিনা বা আওয়ামী লীগের জন্য আর কোনো পথ খোলা নেই। ভবিষ্যতে রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তনের কোনো পথ খুলতে হলে সত্য স্বীকার, দায় নির্ধারণ, ভুক্তভোগীদের ন্যায়বিচার এবং ক্ষমা প্রার্থনার মতো কঠিন বিষয়গুলো এড়িয়ে যাওয়ার উপায় নেই।
শেষ কথা হলো, অনলাইনে একসময় আমরা প্রচার চালিয়েছিলাম, মানুষকে রাস্তায় নামার আহ্বান জানিয়েছিলাম, আর বাস্তবের আন্দোলন যখন পূর্ণতা পেয়েছিল, তখন ক্ষমতার পতন ঘটেছিল। সেই অভিজ্ঞতা থেকে কেউ যদি শিক্ষা নিতে চান, তবে তাঁকে বুঝতে হবে—ফেসবুকের পোস্ট আন্দোলনের বিকল্প নয়, আর গুজব জনসমর্থনের বিকল্প নয়। ‘হাসিনা ফিরবেন’ বলে প্রতিদিন ঢাকঢোল পেটানো যেতে পারে; কিন্তু ঢাকের শব্দে সীমান্ত খুলে যায় না, সেনাবাহিনীর অবস্থান বদলায় না, জনমতের রায়ও পাল্টায় না।
ডিসেম্বর আসবে, শীত পড়বে, চায়ের কাপে ধোঁয়া উঠবে। প্রচারণার বাজারে তখন নতুন গল্পও আসতে পারে। কিন্তু গল্প যতই জমুক, বাস্তবতার দরজায় কড়া নাড়তে হলে প্রমাণ লাগে। আর প্রমাণ না থাকলে রাজনীতির এই কল্পবিলাসের শেষ পরিণতি হতে পারে সেই পুরোনো প্রবাদটির মতো—গাছে কাঁঠাল, গোঁফে তেল। কাঁঠাল পাকল কি না, তা পরে দেখা যাবে; আপাতত গোঁফে তেল দেওয়ার আয়োজনটাই বেশি চোখে পড়ছে।
লেখক: সরকারের সাবেক সিনিয়র সচিব
(মতামত লেখকের নিজস্ব)
