গত ৬ই অক্টোবর ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী নয়াদিল্লিতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। সংবেদনশীল বা গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপক্ষীয় মিশনে নিযুক্ত ভারতীয় মিশন প্রধানদের জন্য নয়াদিল্লিতে পরামর্শের সময় সরাসরি তথ্য জানানো বা কৌশলগত নির্দেশনা নেয়া নতুন কিছু নয়। মোদির দপ্তর পররাষ্ট্রনীতির বাস্তবায়নে সরাসরি যোগাযোগ রক্ষা করে থাকে। তবে ত্রিবেদীর ক্ষেত্রে এই বৈঠকের প্রেক্ষাপট বেশ তাৎপর্যপূর্ণ।
২০২৬ সালের এপ্রিলে কোনো পেশাদার কূটনীতিকের পরিবর্তে ক্ষমতাসীন বিজেপি’র সাবেক রাজনীতিক ও ব্যবসায়ী ত্রিবেদীকে ঢাকায় নিয়োগ দেয়া হয়। এটি এমন এক সময় ঘটে যখন ভারত ও বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক গভীর সংকটে পড়েছিল। ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ভারতে আশ্রয় নিয়ে থাকা সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ফেরত পাঠানোর যে দাবি বাংলাদেশ জানিয়ে আসছে, তা একটি প্রধান বিরোধের জায়গা। ২০১৩ সাল থেকে দুই দেশের মধ্যে প্রত্যর্পণ চুক্তি থাকা সত্ত্বেও নতুন বিএনপি সরকার ও পূর্ববর্তী অন্তর্বর্তী সরকারের বারবার জানানো অনুরোধ কার্যত উপেক্ষা করেছে ভারত। তবে চুক্তির ৬ নম্বর অনুচ্ছেদে কোনো অপরাধ রাজনৈতিক প্রকৃতির হলে প্রত্যর্পণ প্রত্যাখ্যান করার সুযোগ রয়েছে।
মোদির সঙ্গে বৈঠকের তিনদিন আগে ঢাকায় সেন্টার ফর গভর্নেন্স স্টাডিজ (সিজিএস) আয়োজিত আন্তর্জাতিক সম্মেলন ‘বে-অব বেঙ্গল কনভারসেশন’ (বিওবিসি)-এ এক প্রশ্নের জবাব দিয়ে আলোচনায় আসেন ত্রিবেদী। এক বাংলাদেশি শিক্ষার্থী যখন তাকে সরাসরি জিজ্ঞেস করেন, ‘ভারত কবে হাসিনাকে ফেরত পাঠাবে?’ তখন তিনি এই দায় কার্যত বাংলাদেশের সেনাবাহিনীর ওপর চাপিয়ে দেন। তিনি উল্লেখ করেন যে, তিনি পদত্যাগের আগেই একটি সামরিক বিমানে তাকে ভারতে পাঠানো হয়েছিল এবং সেখান থেকে তৃতীয় কোনো দেশে যাওয়ার কথা থাকলেও তা ঘটেনি। ত্রিবেদী বলেন, ‘সেই মুহূর্তে তিনি তখনো বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। আমাদের সামনে অন্য কোনো বিকল্প ছিল না। প্রতিবেশী হিসেবে জীবনের এই বাস্তবতাকে মেনে নেয়া আমাদের দায়িত্ব ছিল।’ তিনি যোগ করেন যে, প্রত্যর্পণের অনুরোধটি আইনি প্রক্রিয়ার অধীনে বিবেচনাধীন থাকায় কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দেয়া সম্ভব নয়।
বৈঠকের বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো বিবৃতি প্রকাশ না করা হলেও ধারণা করা হচ্ছে, মোদি তার নিজস্ব প্রতিনিধির কাছ থেকে ঢাকার সার্বিক মনোভাব বোঝার চেষ্টা করেছেন। বাংলাদেশের নতুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে দিল্লি সফরের জন্য ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আমন্ত্রণ জানালেও ঢাকা তা আমলে নেয়নি। সম্মেলনের ফাঁকে এক সাক্ষাৎকারে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবীর স্পষ্ট জানান, তারেক রহমানের ভারত সফরের ক্ষেত্রে ‘প্রধান চ্যালেঞ্জ’ হলো সেখানে অবস্থানরত হাসিনা ও তার সহযোগীদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড। হাসিনাকে তিনি ‘সন্ত্রাসী’ হিসেবেও আখ্যা দেন। ২০২৫ সালের নভেম্বর থেকে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলে আসছে, প্রত্যর্পণের আনুষ্ঠানিক অনুরোধটি বিচারিক ও অভ্যন্তরীণ আইনি প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তবে ১১ মাস পার হলেও এই প্রক্রিয়ার কোনো সুরাহা হয়নি। কৌশলগত বাধ্যবাধকতা ও পারস্পরিক নির্ভরতার কারণে নয়াদিল্লি ঢাকার সঙ্গে সম্পর্ক পুরোপুরি ছিন্ন করতে না চাইলেও এখনো এমন কোনো পরিবেশ তৈরি করতে পারেনি যা আস্থা ফেরাতে পারে। বিপরীতে ভারতের কিছু পদক্ষেপ বাংলাদেশে সংশয় বাড়িয়েছে।
প্রথমত, ঢাকার আপত্তি সত্ত্বেও ভারত থেকে শেখ হাসিনাকে মাঝে মাঝেই বিএনপি সরকারের সমালোচনা করে বিবৃতি দেয়ার সুযোগ দেয়া হচ্ছে। দ্বিতীয়ত, রাতের আঁধারে সীমান্ত দিয়ে তথাকথিত ‘অবৈধ বাংলাদেশি অভিবাসীদের’ জোরপূর্বক ঠেলে পাঠানোর অভিযোগ রয়েছে। তৃতীয়ত, বাণিজ্য ক্ষেত্রে ভারত থেকে আমদানি বাড়লেও আরোপিত বিভিন্ন বিধিনিষেধের কারণে ভারতে বাংলাদেশি রপ্তানি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। চতুর্থত, চিকিৎসার জন্য আসা রোগীদের ক্ষেত্রে ভারতের ভিসা প্রদানের সংখ্যা ব্যাপকভাবে হ্রাস পেয়েছে। এর বিপরীতে ঢাকা এখন ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ নতুন একটি কাঠামো গড়ে তুলছে। অতীতে প্রতিবেশীদের কাছ থেকে যে ধরনের একতরফা আনুগত্য ও অনুকূল আচরণ পেতে ভারত অভ্যস্ত ছিল, বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সেই পরিস্থিতি বদলে গেছে। বর্তমান সরকার তার নীতিকে দু’টি প্রধান স্তম্ভের ওপর দাঁড় করিয়েছে- কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন এবং সমতার নীতি। বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলে নিজেকে একটি উদীয়মান মাঝারি শক্তি হিসেবে বিবেচনা করছে বাংলাদেশ।
বিওবিসি ২০২৬-এর উদ্বোধনী ভাষণে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জাতীয় স্বার্থের সুরক্ষা, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের পাশাপাশি আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে সংলাপ, অংশীদারিত্ব ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন। এর অংশ হিসেবে চীন ও পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক নতুন করে মূল্যায়ন করছে ঢাকা। পাশাপাশি ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’তে বাংলাদেশের যোগ দেয়ার আগ্রহের বিষয়টি নয়াদিল্লির নীতিনির্ধারক মহলে অস্বস্তি তৈরি করেছে। এ ছাড়া তিস্তা ও গঙ্গার মতো অভিন্ন নদীর পানি বণ্টন চুক্তিকে ‘ত্রুটিপূর্ণ’ বিবেচনা করে পূর্ববর্তী চুক্তিগুলোর কেবল মেয়াদ না বাড়িয়ে নতুন করে আলোচনা শুরুর ইঙ্গিত দিয়েছে ঢাকা।
ফলে আগামী দিনগুলোতে বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক কোনদিকে যাবে তা বলা কঠিন হলেও ত্রিবেদী-মোদি বৈঠক একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত বহন করে। নয়াদিল্লি একদিকে তাদের পুরনো মিত্রকে রক্ষা করতে চাইছে, অন্যদিকে নিষ্ক্রিয়তার মূল্য যে দিন দিন বাড়ছে তাও বুঝতে পারছে। তবে ঢাকা স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, ভারতের সুবিধা-অসুবিধাকে আর নিজেদের পররাষ্ট্রনীতির কেন্দ্রবিন্দু রাখা হবে না। ভারত যদি কেবল প্রতীকী পদক্ষেপ ও অস্পষ্ট আইনি প্রক্রিয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ থেকে বাস্তব সমস্যাগুলো সমাধানে উদ্যোগী না হয়, তবে এ সম্পর্ক দীর্ঘমেয়াদি অচলাবস্থার দিকেই এগিয়ে যাবে।
লেখক: ড. শান্তি মারিয়েট ডি’সুজা। মন্ত্রয়া ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ-এর প্রতিষ্ঠাতা ও সভাপতি, ইউনিভার্সিটি অব ম্যাসাচুসেটস অ্যামহার্স্ট-এর একজন সিনিয়র রিসার্চ ফেলো এবং ভারতের গোয়ায় অবস্থিত নেভাল ওয়ার কলেজের ভিজিটিং ফ্যাকাল্টি।
