উন্নত জীবন আর স্থায়ী আবাসের স্বপ্ন নিয়ে প্রায় ৩০ বছর আগে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমিয়েছিলেন কাজী আজিজুল হক খোকন (৫৮)। দিন-রাত পরিশ্রম করেছেন, দেশে থাকা পরিবারের জন্য পাঠিয়েছেন উপার্জনের সিংহভাগ। কিন্তু যে গ্রিনকার্ডের আশায় জীবনের দীর্ঘ সময় পার করলেন, সেই স্বপ্ন আর পূরণ হলো না। তিন দশকেরও বেশি সময় পর দেশে ফিরছেন তিনি, তবে জীবিত নয়, কফিনবন্দি হয়ে।
গত ৩ অক্টোবর কর্মস্থলে যাওয়ার পথে চলন্ত বাসে হৃদ্রোগে আক্রান্ত হন খোকন। বাসচালকের ফোন পেয়ে পুলিশ ও অ্যাম্বুলেন্স তাঁকে নিউইয়র্কের জ্যামাইকা হাসপাতালে নিয়ে যায়। সেখানে তাঁকে মৃত ঘোষণা করা হয়। মৃত্যুর চার দিন পর, ৭ অক্টোবর তাঁর মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত হন স্বজন ও পরিচিতরা।
নিউইয়র্কের কুইন্সের রিচমন্ড হিলে বসবাস করতেন খোকন। কর্মস্থল ছিল জ্যাকসন হাইটসের পরিচিত প্রতিষ্ঠান ‘অবকাশ বুক কর্নার’। জীবনের দীর্ঘ সময় প্রবাসে কাটালেও গ্রিনকার্ড পাওয়ার স্বপ্ন পূরণ হয়নি তাঁর। বিয়েও করেননি। কঠোর পরিশ্রমে অর্জিত আয়ের সিংহভাগ পাঠাতেন মাগুরা জেলা সদরের বগিয়া ইউনিয়নের পুকুরিয়া গ্রামে থাকা মা-বাবা ও ভাই-বোনের কাছে। ফলে নিজের জন্য উল্লেখযোগ্য কোনো সঞ্চয়ও গড়ে ওঠেনি।
জীবিকার পাশাপাশি প্রবাসী রাজনীতিতেও সক্রিয় ছিলেন খোকন। বাংলাদেশে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের অঙ্গসংগঠন যুক্তরাষ্ট্র শ্রমিক লীগের নিউইয়র্ক স্টেট শাখার সাধারণ সম্পাদক এবং সংগঠনটির যুক্তরাষ্ট্র শাখার সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন তিনি। প্রায় ছয় বছর আগে গ্রহণ করেন যুক্তরাষ্ট্র শ্রমিক লীগের সভাপতির দায়িত্ব।
যুক্তরাষ্ট্র শ্রমিক লীগের উপদেষ্টা আব্দুর রহিম বাদশা মানবজমিনকে জানান, খোকনের মরদেহ দেশে পাঠানোর জন্য প্রয়োজনীয় সব আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হয়েছে। এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে বাংলাদেশ সোসাইটি।
স্থানীয় সময় শুক্রবার (৯ অক্টোবর) বাদ জুমা জ্যাকসন হাইটসের ডাইভার্সিটি প্লাজায় খোকনের জানাজা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। এরপর রাতে সংযুক্ত আরব আমিরাতের একটি ফ্লাইটে তাঁর মরদেহ ঢাকার উদ্দেশে পাঠানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
খোকনের মৃত্যুতে নিউইয়র্কের প্রবাসী বাংলাদেশি কমিউনিটিতে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। তাঁর দীর্ঘ প্রবাসজীবন ঘিরে গ্রিনকার্ড না পাওয়ার অনিশ্চয়তা ও ব্যক্তিগত ত্যাগের বিষয়গুলোও নতুন করে আলোচনায় এসেছে। তবে তাঁর মৃত্যুর সঙ্গে অভিবাসনসংক্রান্ত উদ্বেগের সরাসরি সম্পর্ক নিশ্চিত নয়।
৩০ বছর আগে একবুক স্বপ্ন নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে আসা মানুষটির শেষযাত্রার আয়োজন করতে হচ্ছে অন্যের সহযোগিতায়। পরিবারের মুখে হাসি ফোটাতে জীবনের দীর্ঘ সময় ব্যয় করা খোকন শেষ পর্যন্ত ফিরছেন স্বজনদের কাছে, তবে কফিনবন্দি হয়ে।
