প্যারিসে ব্যাংক অব আমেরিকায় হামলার নেপথ্যে ইরানপন্থি নেটওয়ার্ক, এফবিআইয়ের তদন্তে নতুন তথ্য

ফন্ট সাইজ:

প্যারিসে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাংক অব আমেরিকার কার্যালয়ে মার্চে ব্যর্থ বোমা হামলার ঘটনায় নতুন ও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সামনে এসেছে। মার্কিন ফেডারেল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন, এফবিআইয়ের তদন্ত অনুযায়ী, হামলাটি বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা ছিল না। এর সঙ্গে ইরানপন্থি সশস্ত্র গোষ্ঠীর একটি বিস্তৃত নেটওয়ার্কের যোগসূত্র থাকার তথ্য পাওয়া গেছে।
ফরাসি দৈনিক ল্য মন্ডে বৃহস্পতিবার প্রকাশিত এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে জানিয়েছে, এফবিআইয়ের তদন্ত থেকে পাওয়া তথ্য ফরাসি সন্ত্রাসবিরোধী বিচারকদের কাছে পাঠানো হয়েছে। ২৯ জুলাইয়ের একটি বিচারিক অনুরোধের মাধ্যমে এসব তথ্য ফরাসি তদন্তকারীদের হাতে পৌঁছায়।
তদন্তে ইরাকি নাগরিক মোহাম্মদ এ.-এস.-কে প্যারিসের ওই হামলার কথিত পরিকল্পনাকারী হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে। এফবিআইয়ের তথ্য অনুযায়ী, মার্চ থেকে মে মাসের মধ্যে ইউরোপে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থসংশ্লিষ্ট স্থাপনা এবং ইহুদি সম্প্রদায়ের সঙ্গে সম্পর্কিত বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে ১৮টি হামলা অথবা হামলার পরিকল্পনার সঙ্গে তার সম্পৃক্ততার সন্দেহ রয়েছে। তাকে মে মাসে তুরস্কে গ্রেপ্তার করা হয়।

ঘটনার সূত্রপাত গত ২৭ থেকে ২৮ মার্চের রাতে। প্যারিসের অষ্টম অ্যারোন্ডিসমেন্টে ব্যাংক অব আমেরিকার কার্যালয়ের সামনে দুই কিশোর একটি হাতে তৈরি বিস্ফোরক সক্রিয় করার চেষ্টা করছিল। পুলিশের টহলদল তাদের আটক করে। ফরাসি বিশেষজ্ঞদের পরীক্ষায় বিস্ফোরকটিকে অত্যন্ত শক্তিশালী বলে উল্লেখ করা হয়।
তদন্তে ওই দুই কিশোর জানিয়েছিল, একজন মধ্যস্থতাকারীর মাধ্যমে কয়েকশ ইউরোর বিনিময়ে তাদের এই কাজের জন্য নিয়োগ করা হয়েছিল। তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, তারা যে একটি সন্ত্রাসী হামলার অংশ হিসেবে কাজ করছে, সে বিষয়ে তাদের সম্পূর্ণ ধারণা ছিল না।
পরবর্তী তদন্তে ফরাসি কর্মকর্তারা জানতে পারেন, তুরস্কে একজন ইরাকি নাগরিককে গ্রেপ্তার করেছে মার্কিন কর্তৃপক্ষ। এফবিআইয়ের অনুসন্ধানে ওই ব্যক্তির সঙ্গে ইউরোপে সংঘটিত আরও কয়েকটি সহিংস ঘটনার যোগসূত্রের তথ্য পাওয়া যায়।
মার্কিন তদন্ত অনুযায়ী, সন্দেহভাজন ব্যক্তি ইরাকভিত্তিক শিয়া সশস্ত্র সংগঠন কাতায়েব হিজবুল্লাহর সঙ্গে যুক্ত। যুক্তরাষ্ট্র সংগঠনটিকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে। তদন্তে আরও বলা হয়েছে, কাতায়েব হিজবুল্লাহর সঙ্গে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে।
তবে ফরাসি তদন্তে এখন পর্যন্ত এমন কোনো তথ্য প্রকাশ করা হয়নি, যাতে সরাসরি ইরান সরকারকে প্যারিসের হামলার নির্দেশদাতা হিসেবে চিহ্নিত করা যায়। তদন্তকারীদের হাতে থাকা তথ্য মূলত ইরানপন্থি সশস্ত্র গোষ্ঠী, তাদের কথিত সহযোগী এবং ইউরোপে সক্রিয় বিভিন্ন মধ্যস্থতাকারীর ওপর কেন্দ্রীভূত।
এফবিআইয়ের তদন্তে উঠে এসেছে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। ইউরোপে হামলা পরিচালনার জন্য স্থানীয় অপরাধজগতের লোকজনকে ব্যবহার করার চেষ্টা করা হয়েছিল বলে তদন্তকারীদের ধারণা। বিশেষ করে মাদক পাচারের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের বিভিন্ন সহিংস কর্মকাণ্ডে নিয়োগ করা হয়েছিল বলে তদন্তে উল্লেখ রয়েছে।
তদন্তকারীদের মতে, এ ধরনের পদ্ধতির উদ্দেশ্য ছিল হামলার জন্য সরাসরি সংগঠনের সদস্যদের ব্যবহার না করে বিভিন্ন স্তরের মধ্যস্থতাকারী ও স্থানীয় অপরাধীদের মাধ্যমে কাজ সম্পন্ন করা। এতে হামলার পরিকল্পনাকারীদের পরিচয় আড়াল করা সহজ হয়।
প্যারিসের ব্যাংক অব আমেরিকার ঘটনাতেও এমন একটি কাঠামোর অস্তিত্বের ইঙ্গিত পেয়েছেন তদন্তকারীরা। হামলার কয়েক দিন আগে এনক্রিপ্টেড যোগাযোগমাধ্যম টেলিগ্রামে ব্যাংকটিকে লক্ষ্য করে হুমকি দেওয়া হয়েছিল। ওই হুমকির পর ব্যাংকের আশপাশে পুলিশি টহল বাড়ানো হয়। পরবর্তীতে সেই নজরদারির মধ্যেই দুই কিশোরকে বিস্ফোরকসহ আটক করা সম্ভব হয়।
তদন্তে হারাকাত আশাব আল-ইয়ামিন আল-ইসলামিয়া, সংক্ষেপে এইচএওয়াইআই নামের একটি সংগঠনের কথাও উঠে এসেছে। এফবিআইয়ের অনুসন্ধান অনুযায়ী, সংগঠনটি কাতায়েব হিজবুল্লাহর একটি আড়াল বা ফ্রন্ট সংগঠন হিসেবে কাজ করেছে বলে সন্দেহ করা হচ্ছে।
তদন্তকারীদের হাতে থাকা তথ্যের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি হলো সন্দেহভাজন মোহাম্মদ এ.-এস.-এর কথোপকথনের রেকর্ড। এফবিআইয়ের একটি সূত্রের মাধ্যমে পাওয়া ওই কথোপকথনে তিনি ইউরোপে পরিচালিত কয়েকটি হামলার সঙ্গে নিজের সম্পৃক্ততার কথা বলেছেন বলে তদন্তে উল্লেখ করা হয়েছে।
তদন্তের একটি অংশে সন্দেহভাজন ব্যক্তির সঙ্গে মার্কিন এক গোপন এজেন্টের যোগাযোগের কথাও উঠে এসেছে। ওই এজেন্ট নিজেকে মেক্সিকোর একটি অপরাধী চক্রের সদস্য হিসেবে পরিচয় দিয়ে তার সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তদন্ত অনুযায়ী, তাকে যুক্তরাষ্ট্রে একটি ইহুদি উপাসনালয়ে হামলার দায়িত্ব দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল এবং অর্থ ও নির্দেশনা দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
এই তদন্তের তথ্যের ভিত্তিতেই মার্কিন কর্তৃপক্ষ তুরস্কে থাকা সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করে। এরপর তার বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রে সন্ত্রাসবিষয়ক অভিযোগ আনা হয়।
প্যারিসের ঘটনাকে কেন্দ্র করে ফ্রান্সের তদন্তও এগিয়েছে। জুলাইয়ের শেষ এবং আগস্টের মাঝামাঝি সময়ে দুই বেলজিয়ান নারীকে আটক করে বিচারিক হেফাজতে রাখা হয়। তাদের বিরুদ্ধে বেলজিয়াম থেকে প্যারিসে বিস্ফোরক পরিবহনে ভূমিকা রাখার সন্দেহ রয়েছে।
ফরাসি তদন্তে এখন পর্যন্ত মোট ছয়জন সন্দেহভাজনকে আনুষ্ঠানিকভাবে তদন্তের আওতায় নেওয়া হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী অপরাধমূলক ষড়যন্ত্র এবং সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সম্পর্কিত ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডের চেষ্টার অভিযোগ রয়েছে।
প্যারিসের ঘটনাটি এখন ফ্রান্সের জন্য শুধু একটি ব্যর্থ বোমা হামলার তদন্ত নয়। এর সঙ্গে ইউরোপের আরও কয়েকটি দেশে যুক্তরাষ্ট্র ও ইহুদি সম্প্রদায়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে সংঘটিত হামলা এবং হামলার পরিকল্পনার সম্ভাব্য যোগসূত্র খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
ফরাসি তদন্তকারীরা বিশেষভাবে খতিয়ে দেখছেন, ইউরোপের বিভিন্ন দেশে স্থানীয় অপরাধী চক্রকে ব্যবহার করে কোনো সমন্বিত নেটওয়ার্ক এসব হামলা পরিচালনা করেছে কি না। একই সঙ্গে বিদেশি কোনো রাষ্ট্র বা সশস্ত্র সংগঠনের প্রত্যক্ষ নির্দেশনা ছিল কি না, সেটিও তদন্তের অংশ।
তবে তদন্ত এখনো চলমান। ফলে হামলার সঙ্গে ইরান সরকারের সরাসরি সম্পৃক্ততা কিংবা রাষ্ট্রীয় নির্দেশের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো তথ্য প্রকাশ্যে আসেনি। বর্তমানে তদন্তের মূল কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ইরানপন্থি সশস্ত্র গোষ্ঠী, তাদের কথিত ফ্রন্ট সংগঠন এবং ইউরোপে নিয়োগ করা স্থানীয় সহযোগীদের নেটওয়ার্ক।
প্যারিসের ব্যাংক অব আমেরিয়ার সামনে মার্চের সেই বিস্ফোরক হামলা ব্যর্থ হওয়ায় বড় ধরনের প্রাণহানি এড়ানো সম্ভব হয়েছিল। কিন্তু কয়েক মাস পর এফবিআইয়ের তদন্তের নতুন তথ্য প্রকাশ পাওয়ায় ঘটনাটি আবারও ইউরোপের নিরাপত্তা আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে। ফ্রান্সসহ ইউরোপীয় দেশগুলোর জন্য এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে, বিদেশি সংঘাতের প্রভাব ইউরোপের মাটিতে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের নতুন ঝুঁকি তৈরি করছে কি না।