নিউ মুরিং টার্মিনাল আধুনিকায়নে ১০০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করবে ডিপি ওয়ার্ল্ড

নিউ মুরিং টার্মিনাল আধুনিকায়নে ১০০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করবে ডিপি ওয়ার্ল্ড

ফন্ট সাইজ:

চট্টগ্রাম বন্দরের নিউ মুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) আধুনিকায়নে আগামী ১০ বছরে এক হাজার কোটি টাকার বেশি বিনিয়োগ করবে আরব আমিরাতভিত্তিক অপারেটর ডিপি ওয়ার্ল্ড। এ বিনিয়োগের জন্য সরকারের কোনো ঋণ নিতে হবে না। পাশাপাশি টার্মিনাল পরিচালনার বিনিময়ে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ (সিপিএ) পাবে প্রায় ৬০০ কোটি টাকা অগ্রিম ফি, নির্দিষ্ট বার্ষিক ফি ও রাজস্বের অংশ।

এনসিটি পরিচালনায় বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে কনসেশন চুক্তি সই হয়েছে। রাজধানীর আগারগাঁওয়ে ইনভেস্ট বাংলাদেশ অডিটোরিয়ামে এ চুক্তি হয়। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের তরফে চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল মনিরুজ্জামান এবং ডিপি ওয়ার্ল্ডের তরফে কোম্পানির চেয়ারম্যান এসা কাজিম এতে সই করেন।

আধুনিকায়নের এ উদ্যোগে এনসিটিতে নতুন যন্ত্রপাতি, প্রযুক্তি ও ডিজিটাল অপারেশন ব্যবস্থা যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। একই সঙ্গে টার্মিনালের পরিচালন দক্ষতা বাড়াতে পারফরম্যান্স সূচক নির্ধারণ এবং লক্ষ্যমাত্রা পূরণে ব্যর্থ হলে আর্থিক জরিমানার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।

এনসিটির আধুনিকায়নে অপারেটরের বিনিয়োগ হবে ১০ বছরে এক হাজার কোটি টাকার বেশি। এর বাইরে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষকে অগ্রিম হিসেবে প্রায় ৬০০ কোটি টাকা দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। অর্থাৎ রাষ্ট্রীয় অর্থায়ন বা সরকারি ঋণের ওপর নির্ভর না করেই বিদ্যমান একটি কৌশলগত বন্দর অবকাঠামো আধুনিকায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

ইনভেস্ট বাংলাদেশ জানায়, চট্টগ্রাম বন্দর বাংলাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের প্রায় ৯২ শতাংশ পরিচালনা করে। এর মধ্যে এনসিটি একাই বন্দরের মোট কনটেইনার ট্রাফিকের প্রায় ৪৪ শতাংশ পরিচালনা করছে। তবে সক্ষমতার তুলনায় বন্দরের কার্যক্রমে সময় লাগছে অনেক বেশি। ২০২৫ সালের কনটেইনার পোর্ট পারফরম্যান্স ইনডেক্সে বিশ্বের ৪০০টি কনটেইনার বন্দরের মধ্যে চট্টগ্রাম বন্দরের অবস্থান ছিল ৩৬৪তম। বন্দরে একটি কনটেইনার অবস্থান করে গড়ে ৯ দশমিক ৪ দিন। একটি জাহাজকে বন্দরে অবস্থান করতে হয় গড়ে ২ দশমিক ৫৩ দিন।

আন্তর্জাতিক প্রতিযোগী বন্দরগুলোর সঙ্গে ব্যবধানটি আরও স্পষ্ট। ওমানের সালালাহ বন্দরে কনটেইনার অবস্থানের সময় এক দিনেরও কম। ভিয়েতনামের কাই মেপ বন্দরে তা দুই থেকে তিন দিন। সিঙ্গাপুরের পিএসএ বন্দরে এক দিনেরও কম এবং ভারতের জওহরলাল নেহরু বন্দরে দুই দিনেরও কম।

দীর্ঘ সময় কনটেইনার ও জাহাজ আটকে থাকায় দেশের অর্থনীতিতেও এর প্রভাব পড়ছে। ইনভেস্ট বাংলাদেশের হিসাবে, বন্দরের অদক্ষতার কারণে বছরে আনুমানিক তিন হাজার কোটি টাকার অর্থনৈতিক ক্ষতি হচ্ছে। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, কনটেইনারের অবস্থানের সময় মাত্র এক দিন কমানো গেলে বাংলাদেশের রপ্তানি প্রায় ৭ দশমিক ৪ শতাংশ বাড়তে পারে।

এ কারণে এনসিটির আধুনিকায়নে শুধু নতুন যন্ত্রপাতি সংযোজন নয়, পরিচালন পদ্ধতিতেও পরিবর্তন আনার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ডিজিটাল অপারেশন ও কাগজবিহীন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে স্বচ্ছতা বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি স্থানীয় কর্মীদের আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণের সুযোগ তৈরি হবে।

সংস্থাটি জানায়, নতুন ব্যবস্থায় টার্মিনালের মালিকানা অবশ্য চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের কাছেই থাকবে। ডিপি ওয়ার্ল্ড ১৫ বছরের জন্য পরিচালনার অধিকার পাবে। টার্মিনালের জমি ও অবকাঠামোর মালিকানা সরকারের কাছেই থাকবে। নিরাপত্তা ব্যবস্থাও আগের মতো নৌবাহিনী, কোস্টগার্ড, কাস্টমস, ইমিগ্রেশনসহ সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোর নিয়ন্ত্রণে থাকবে।

চট্টগ্রাম বন্দরের সক্ষমতা বাড়ানোর ক্ষেত্রে এনসিটির আধুনিকায়নের পাশাপাশি নতুন টার্মিনালও যুক্ত হচ্ছে। ডেনমার্কভিত্তিক এপিএম টার্মিনালস লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনাল (এলসিটি) উন্নয়ন করছে, যা ২০৩০ সালের মধ্যে চালু হওয়ার কথা রয়েছে।

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল মো. মনিরুজ্জামান বলেন, এই চুক্তি লজিস্টিক ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা কমাবে এবং আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে বাংলাদেশের যোগাযোগ আরও শক্তিশালী করবে। দেশীয় শিল্পকে সহায়তা এবং আরও দক্ষ বাণিজ্য প্রবাহ নিশ্চিত করার মাধ্যমে এই অংশীদারত্ব আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থায় বাংলাদেশের অবস্থান আরও শক্তিশালী করবে।

ইনভেস্ট বাংলাদেশের চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী বলেন, ‘বাংলাদেশের জন্য এই চুক্তির অর্থ হলো এমন একটি বন্দরব্যবস্থা গড়ে তোলা, যা আমরা যে মাত্রার বাণিজ্য সম্প্রসারণ করতে চাই, তার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আরও কার্যকরভাবে কাজ করতে সক্ষম হবে।’