উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন নিয়ে অস্ট্রেলিয়ায় পাড়ি জমিয়েছিলেন তাসনিম ঐশী। মাত্র দুই মাসের ব্যবধানে সেই স্বপ্ন থেমে গেল পার্থের এক সড়কে। ভয়াবহ এক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ২২ বছর বয়সী এই বাংলাদেশি শিক্ষার্থী। একই ঘটনায় আহত হয়েছেন গাড়িতে থাকা আরও তিন বাংলাদেশি শিক্ষার্থী।
বৃহস্পতিবার সকাল পৌনে ৮টার দিকে পার্থের প্রায় এক ঘণ্টা উত্তরে ব্রেটন বে এলাকায় ইন্ডিয়ান ওশান ড্রাইভে এ দুর্ঘটনা ঘটে।
বাংলাদেশি কমিউনিটি সূত্রে জানা গেছে, নিহত তাসনিম ঐশী পার্থের এডিথ কোওয়ান ইউনিভার্সিটির (ইসিইউ) শিক্ষার্থী ছিলেন। উচ্চশিক্ষার জন্য প্রায় দুই মাস আগে অস্ট্রেলিয়ায় আসেন তিনি। দুর্ঘটনার সময় ধূসর রঙের একটি বিএমডব্লিউ গাড়ির সামনের আসনে ছিলেন তাসনিম।
স্থানীয় সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, সকাল প্রায় ৭টা ৪৫ মিনিটে ইন্ডিয়ান ওশান ড্রাইভে চলার সময় গাড়িটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে রাস্তার পাশের একটি গাছে সজোরে ধাক্কা দেয়। এতে গাড়িটি দুমড়েমুচড়ে যায়। দুর্গম ঝোপঝাড় ও ধ্বংসস্তূপ পেরিয়ে জরুরি সেবাকর্মীদের গাড়িটির কাছে পৌঁছাতে হয়। দুর্ঘটনার পর তাসনিম গুরুতর আহত অবস্থায় গাড়ির ভেতরে আটকা পড়েছিলেন। তাঁকে উদ্ধারে চেষ্টা চালান উদ্ধারকর্মীরা। ঘটনাস্থলে পাঠানো হয় জরুরি উদ্ধারকারী হেলিকপ্টারও। তবে শেষ পর্যন্ত ঘটনাস্থলেই তাঁর মৃত্যু হয়েছে।
আহত তিনজন
দুর্ঘটনায় গাড়ির চালকসহ আরও তিনজন আহত হয়েছেন। স্থানীয় প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তাঁদের কারও আঘাত প্রাণঘাতী নয়। আহত দুই তরুণকে রয়্যাল পার্থ হাসপাতালে নেয়া হয়েছে। তাঁদের অবস্থা স্থিতিশীল বলে জানা গেছে। অপর আহত যাত্রীকে পার্থ চিলড্রেনস হাসপাতালে নেয়া হয়েছে।
বাংলাদেশি কমিউনিটি সূত্রে আহতদের লাবিব, বিপুল ও ঈশিতা হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে। তবে তাঁদের বয়স ও চিকিৎসার সর্বশেষ অবস্থা হাসপাতাল বা পুলিশের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়নি।
কীভাবে দুর্ঘটনা, তদন্তে পুলিশ
দুর্ঘটনার কারণ জানতে তদন্ত শুরু করেছে পশ্চিম অস্ট্রেলিয়া পুলিশের মেজর ক্রাশ ইনভেস্টিগেশন সেকশন (এমসিআইএস)। গাড়িটির গতি কত ছিল, কী কারণে চালক নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছিলেন কিংবা দুর্ঘটনার পেছনে অন্য কোনো কারণ ছিল কি না- তদন্ত শেষে তা স্পষ্ট হবে।
পুলিশ দুর্ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শীদের পাশাপাশি ওই সময় সড়কটিতে থাকা কোনো গাড়ির ড্যাশক্যাম ফুটেজ থাকলে তা সরবরাহের আহ্বান জানিয়েছে। দুর্ঘটনা সম্পর্কে তথ্য থাকলে পুলিশ অথবা ক্রাইম স্টপার্স-এর মাধ্যমে জানাতে বলা হয়েছে।
দুর্ঘটনার পর উদ্ধারকাজ ও তদন্তের জন্য ইন্ডিয়ান ওশান ড্রাইভের কে.ডব্লিউ. রোড থেকে ‘গিনগিন ব্রুক রোড’ পর্যন্ত সড়কের বড় একটি অংশ দুই দিকেই বন্ধ করে দেয়া হয়। পরে কাজ শেষ হলে সড়কটি যান চলাচলের জন্য খুলে দেয়া হয়েছে।
যে সড়কে বারবার ঝরেছে প্রাণ
ইন্ডিয়ান ওশান ড্রাইভের এই অংশটি দীর্ঘদিন ধরেই ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনার জন্য পরিচিত। স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সাম্প্রতিক বছরগুলোতেও এই মহাসড়কে একাধিক প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা ঘটেছে।
শোকের ছায়া পার্থের বাংলাদেশি কমিউনিটিতে
তাসনিমের আকস্মিক মৃত্যুতে পার্থের বাংলাদেশি শিক্ষার্থী ও প্রবাসী কমিউনিটিতে নেমে এসেছে শোকের ছায়া।
পার্থ ভিত্তিক বাংলাদেশি ইন্টারন্যাশনাল স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন পার্থ (বিআইএশএপি) তাঁর মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছে বলে কমিউনিটি সূত্রে জানা গেছে।
সংগঠনটি তাসনিমের আত্মার চিরশান্তি কামনা করে তাঁর পরিবার, স্বজন, বন্ধু, সহপাঠী ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানিয়েছে। মাত্র ২২ বছর বয়সে, বিদেশের মাটিতে উচ্চশিক্ষার নতুন অধ্যায় শুরু করেছিলেন তাসনিম। কিন্তু একটি মুহূর্তের সড়ক দুর্ঘটনায় শেষ হয়ে গেল তাঁর জীবনের সব স্বপ্ন। শোক আর অনিশ্চয়তায় এখন তাঁর স্বজন, বন্ধু ও সহপাঠীরা।
