গাজায় যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার এক বছর পরও সেখানকার স্বাস্থ্যব্যবস্থার পরিস্থিতির খুব সামান্যই উন্নতি হয়েছে। যুদ্ধবিরতি হলেও সেখানে অবাধে ভয়াবহ হামলা চালিয়ে যাচ্ছে ইসরাইলি সেনারা। গাজার স্বাস্থ্যব্যবস্থা নিয়ে ফিজিশিয়ানস ফর হিউম্যান রাইটস ইসরাইল (পিএইচআরআই) প্রকাশিত নতুন এক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। এ খবর দিয়েছে অনলাইন টাইমস অব ইসরাইল। গাজায় যুদ্ধ চলাকালে ইসরাইল বারবার দাবি করেছে, হামাস সামরিক কাজে হাসপাতাল ও অন্যান্য চিকিৎসাকেন্দ্র ব্যবহার করেছে। এসব স্থাপনার মধ্যে কমান্ড পোস্ট, অস্ত্র সংরক্ষণাগার এবং সুড়ঙ্গ নেটওয়ার্কের আড়াল হিসেবে হাসপাতাল ব্যবহারের অভিযোগও রয়েছে।
যুদ্ধের সময় ইসরাইলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) গাজার বেশ কয়েকটি চিকিৎসাকেন্দ্রে সুড়ঙ্গ ও অস্ত্রের সন্ধান পাওয়ার দাবি করে। এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত ছিল গাজা সিটির শিফা হাসপাতাল। এ ছাড়া রান্তিসি, ইন্দোনেশিয়ান ও ইউরোপিয়ান হাসপাতালসহ অন্যান্য চিকিৎসাকেন্দ্রেও হামাসের অবকাঠামোর প্রমাণ পাওয়ার দাবি করেছে আইডিএফ। হাসপাতাল চত্বর থেকে হামাসের বন্দুকধারীরা অভিযান পরিচালনা করত বলেও দাবি করেছে তারা। তবে হামাস ও গাজার স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা বারবার এসব হাসপাতালকে সামরিক কমান্ড সেন্টার হিসেবে ব্যবহারের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। যুদ্ধের কারণে আইডিএফ গাজার উল্লেখযোগ্যসংখ্যক হাসপাতাল খালি করে দেয়। এসব হাসপাতালের চিকিৎসক-কর্মী ও রোগীদেরও সরিয়ে নেয়া হয়। হামাস ও ইসরাইলি বাহিনীর লড়াইয়ে কয়েকটি হাসপাতাল ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত বা পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যায়।
হামাস একটি কমান্ড সেন্টার হিসেবে ব্যবহার করত বলে ইসরাইলের দাবি করা শিফা হাসপাতালও দুই দফা তীব্র লড়াইয়ে ব্যাপকভাবে ধ্বংস হয়। গত এক বছরে হাসপাতালটি পুনর্নির্মাণ করা হয়েছে। তবে পিএইচআরআইয়ের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমানে গাজার কোনো হাসপাতালই পুরোপুরি কার্যকর নয়। ২০২৫ সালের অক্টোবরে গাজার ৩৬টি হাসপাতালের মধ্যে মাত্র ১৪টি আংশিকভাবে চালু ছিল। প্রায় এক বছর পর এখন ২০টি হাসপাতাল আংশিকভাবে কার্যক্রম চালাচ্ছে। কিন্তু একটি হাসপাতালও পূর্ণ সক্ষমতায় ফিরতে পারেনি। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালের অক্টোবরে গাজায় নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের (আইসিইউ) শয্যা ছিল ১০৩টি। ২০২৬ সালের জুলাই নাগাদ সেই সংখ্যা মাত্র একটি বেড়ে ১০৪টিতে দাঁড়িয়েছে। চিকিৎসা সরিয়ে নেয়ার অপেক্ষায় থাকা রোগীদের মৃত্যুও অব্যাহত রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। হামাস-নিয়ন্ত্রিত গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৬ সালের ২রা জুলাই পর্যন্ত চিকিৎসার জন্য অন্যত্র সরিয়ে নেয়ার অপেক্ষায় অন্তত ১ হাজার ৫৭০ রোগীর মৃত্যু হয়েছে। তাদের মধ্যে ৫০৫ জন ক্যানসার রোগী এবং অন্তত ২৬৪ জন শিশু।
৭ই অক্টোবরের আগে গাজার রোগীদের চিকিৎসার জন্য পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুজালেমের হাসপাতালে নেয়া যেত। কিন্তু ৭ই অক্টোবরের হামলার পর ইসরাইল এ ধরনের স্থানান্তর বন্ধ করে দেয়। নির্দিষ্ট কিছু ফিলিস্তিনি হাসপাতাল- বিশেষ করে পূর্ব জেরুজালেমের হাসপাতালগুলোতে ফিলিস্তিনি রোগীদের চিকিৎসার জন্য আলাদা তহবিল রয়েছে এবং দীর্ঘদিন ধরে এসব হাসপাতাল গাজার রোগীদের চিকিৎসা দিয়ে আসছে। তারপরও সেখানে গাজার রোগীদের নেয়ার অনুমতি দেয়া হচ্ছে না। বর্তমানে গাজা থেকে চিকিৎসার জন্য রোগীদের সরিয়ে নেয়া কেবল তৃতীয় কোনো দেশে যাওয়ার ক্ষেত্রেই অনুমোদিত। ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড নিয়ে কাজ করা পিএইচআরআইয়ের প্রকল্প সমন্বয়কারী কেরেন শাভিত দ্য টাইমস অব ইসরাইল’কে বলেন, বছরের পর বছর এসব হাসপাতাল ফিলিস্তিনি স্বাস্থ্যব্যবস্থার অংশ হিসেবে গাজার রোগীদের চিকিৎসা দিয়েছে। তারা এখনো রোগীদের গ্রহণ করতে প্রস্তুত এবং সক্ষম।
অনেক ক্ষেত্রেই রোগীদের যে জরুরি চিকিৎসা প্রয়োজন, তা তাদের বাড়ি থেকে মাত্র এক-দুই ঘণ্টা দূরের হাসপাতালেই পাওয়া যায়। অথচ ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ইসরাইল গাজার রোগীদের এসব হাসপাতালে স্থানান্তরের ওপর সার্বিক নিষেধাজ্ঞা দিয়ে রেখেছে। গাজার রোগীদের চিকিৎসার জন্য ইসরাইল ও পশ্চিম তীরে যাওয়ার ওপর সরকারের নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে করা একটি আবেদনও হাইকোর্ট সরাসরি খারিজ করেনি। বরং আদালত বিভিন্ন সময়ে এ বিষয়ে সরকারের নীতিতে হস্তক্ষেপ করা উচিত কি না, তা বিবেচনা করেছে। সর্বশেষ ২০২৬ সালের জুলাইয়ে দেয়া সিদ্ধান্তে হাইকোর্ট ওই পর্যায়ে সরকারের নীতিতে হস্তক্ষেপ না করার সিদ্ধান্ত নেয়। একই সঙ্গে গাজার রোগীদের চিকিৎসার জন্য ইসরাইল ও পশ্চিম তীরে যাতায়াতের ওপর নিষেধাজ্ঞা সংক্রান্ত নীতির বিষয়ে ২০২৬ সালের ২১শে ডিসেম্বরের মধ্যে রাষ্ট্রকে হালনাগাদ তথ্য জমা দেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
