দুঃস্বপ্নে শুরু অমরত্বে শেষ

দুঃস্বপ্নে শুরু অমরত্বে শেষ

ফন্ট সাইজ:

ফুটবল কখনো কখনো শুধু একটি খেলা থাকে না। হয়ে ওঠে আবেগ, ভালোবাসা, স্বপ্ন আর জীবনের গল্প। বিবাদ মিলিয়ে মিলিয়ে লিখতে পারে জীবনের গল্প। সেই গল্পের সবচেয়ে সুন্দর অধ্যায়গুলোর একটি- লিওনেল মেসি। যার বাঁ পায়ের জাদুতে মুগ্ধ হয়নি, এমন ফুটবলপ্রেমী খুঁজে পাওয়া কঠিন। তবে মেসিকে ভালোবাসার কারণ শুধু গোল, অ্যাসিস্ট কিংবা অসংখ্য ট্রফি নয়। তাকে ভালোবাসার সবচেয়ে বড় কারণ অদম্য লড়াই।

ছোট্ট শরীর। বয়স মাত্র ১৩। আর্জেন্টিনার রোজারিও থেকে পাড়ি জমালেন স্পেনে। সামনে অচেনা দেশ, অচেনা পরিবেশ, নতুন জীবন। তার ওপর শারীরিক বৃদ্ধিসংক্রান্ত সমস্যা। নিয়মিত হরমোন থেরাপির প্রয়োজন, যার খরচ বহন করা পরিবারের জন্য ছিল কঠিন। সেই দুঃসময়ে পাশে দাঁড়ায় বার্সেলোনা। আর সেখান থেকেই শুরু হয় এমন এক যাত্রা, যার শেষ কোথায়- সম্ভবত মেসি নিজেও জানতেন না।

বার্সেলোনার হয়ে একের পর এক সাফল্য, ব্যক্তিগত পুরস্কার আর রেকর্ডের পাহাড় গড়লেও আর্জেন্টিনার জার্সিতে সাফল্য যেন অধরাই থেকে যাচ্ছিল। দেশের মানুষের প্রত্যাশা যত বেড়েছে, ততই বেড়েছে সমালোচনা। ক্লাবের মেসি আর জাতীয় দলের মেসির মধ্যে যেন তৈরি হয়েছিল এক অদৃশ্য দেয়াল। বারবার ফাইনালে হেরে, ব্যর্থতার দায় কাঁধে নিয়ে একসময় অভিমানে আন্তর্জাতিক ফুটবলকেই বিদায় বলেছিলেন তিনি। কিন্তু মেসি যে হাল ছাড়ার মানুষ নন! অবসর ভেঙে ফিরে এলেন। আর সেই প্রত্যাবর্তন যেন ছিল নতুন এক মেসির জন্ম। একের পর এক রেকর্ড, একের পর এক শিরোপা। যে মানুষটিকে একসময় দেশের মানুষের কাছে ব্যর্থতার প্রতীক বলা হতো, তিনিই হয়ে উঠলেন আর্জেন্টিনার সবচেয়ে বড় গর্ব। তারপর এলো সেই রাত, যে রাতে শেষ হলো একটি যুগ।

২০০৫: দুঃস্বপ্নের রাত
আন্তর্জাতিক ফুটবলে লিওনেল মেসির অভিষেক হাঙ্গেরির বিপক্ষে ২০০৫ সালে। বয়স মাত্র ১৮। কিন্তু অভিষেকের রাতটি ছিল ভয়াবহ। পুসকাস অ্যারেনায় ৬৩ মিনিটে বদলি হিসেবে মাঠে নামার মাত্র ৪৪ সেকেন্ড পরই লাল কার্ড দেখেন তিনি। হাঙ্গেরির ভিলমোস ভাঙ্কজাকের মুখে মেসির কনুই লেগেছিল। ঘটনাটি ছিল অনিচ্ছাকৃত। কিন্তু সেই মুহূর্তেই আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের প্রথম অধ্যায়ে নেমে আসে কালো ছায়া। কে জানতো, সেই দুঃস্বপ্নের রাতের পরই লেখা হবে ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে উজ্জ্বল গল্পগুলোর একটি!

২০০৬: বিশ্বকাপে অভিষেক
এক বছর পরই বিশ্বকাপের মঞ্চে মেসি। সার্বিয়ার বিপক্ষে ৬-০ গোলের জয়ে বিশ্বকাপে অভিষেক হয় তার। শুধু অভিষেকই নয়, গোলও করেন। হয়ে ওঠেন আর্জেন্টিনার হয়ে বিশ্বকাপে গোল করা অন্যতম কনিষ্ঠ খেলোয়াড়। সেদিন হয়তো কেউ ভাবেননি, একদিন এই ছেলেটিই বিশ্বকাপের ইতিহাসে নিজের জন্য আলাদা একটি অধ্যায় লিখবেন।
২০০৮: অলিম্পিক চ্যাম্পিয়ন
২০০৮ বেইজিং অলিম্পিকে আসে মেসির ক্যারিয়ারের প্রথম বড় আন্তর্জাতিক সাফল্য। নাইজেরিয়াকে ১-০ গোলে হারিয়ে স্বর্ণপদক জেতে আর্জেন্টিনা। মেসিও ওঠেন অলিম্পিকের সর্বোচ্চ মঞ্চে। তবে জাতীয় দলের হয়ে বড় ট্রফির অপেক্ষা তখনো শেষ হয়নি।

২০১০-১১: সাফল্যের বদলে হতাশা
২০০৯ সালে হাতে ওঠে আর্জেন্টিনার বিখ্যাত ১০ নম্বর জার্সি। বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে ভারী দায়িত্বগুলোর একটি যেন এসে পড়ে তার কাঁধে। কিন্তু ২০১০ বিশ্বকাপ ও ২০১১ কোপা আমেরিকা- দুই আসরেই হতাশা। দু’বারই কোয়ার্টার ফাইনাল থেকে বিদায় নেয় আর্জেন্টিনা। দুই টুর্নামেন্টে মেসির পা থেকে আসেনি কোনো গোল। সমালোচনা তখন তুঙ্গে। বার্সেলোনার মেসি আর আর্জেন্টিনার মেসি- এই তুলনা যেন প্রতিদিনই আরও নির্মম হয়ে উঠছিল।

২০১৪-১৬: স্বপ্নভঙ্গ, রেকর্ড আর অবসর
২৪ বছর বয়সেই আর্জেন্টিনার অধিনায়কত্বের বাহুবন্ধনী পান মেসি। তার নেতৃত্বে ২০১৪ বিশ্বকাপের ফাইনালে ওঠে আর্জেন্টিনা। স্বপ্নের ট্রফি তখন হাতছোঁয়া দূরত্বে। কিন্তু মারাকানার সেই রাতে জার্মানি গোল করলো। অতিরিক্ত সময়ে। মারিও গোটশে। আর্জেন্টিনার স্বপ্ন ভেঙে গেল ১-০ ব্যবধানে। এরপর ২০১৫ ও ২০১৬ কোপা আমেরিকার ফাইনাল। দু’বারই প্রতিপক্ষ চিলি। দু’বারই টাইব্রেকারে হার। টানা ফাইনাল হারের যন্ত্রণা আর দেশের মানুষের তীব্র সমালোচনা শেষ পর্যন্ত ভেঙে দেয় মেসিকে। দুঃখে, অভিমানে আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসরের ঘোষণা দেন আটবারের ব্যালন ডি’অরজয়ী। একটি জাতি তখন হারানোর মুখে তাদের সবচেয়ে বড় নায়ককে।

২০১৮-২১: প্রত্যাবর্তন ও দায় মোচন
রাশিয়া বিশ্বকাপকে সামনে রেখে অবসর ভেঙে ফিরে এলেন মেসি। বিশ্বকাপে খেলতে হলে শেষ ম্যাচে নাইজেরিয়ার বিপক্ষে জয় প্রয়োজন ছিল আর্জেন্টিনার। সেই ম্যাচে গোল করে দলকে বিশ্বকাপের টিকিট এনে দেন তিনি। রাশিয়ায় শেষ ষোলোয় বিদায় নিতে হয় আর্জেন্টিনাকে। বিশ্বকাপের হতাশা তখনো কাটেনি। কিন্তু মেসির গল্পে এবার নতুন অধ্যায়।

২০২১: কোপা আমেরিকা
অবশেষে এলো সেই ট্রফি, যার জন্য এত বছর অপেক্ষা। ব্রাজিলকে হারিয়ে কোপা আমেরিকা চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা। মেসির হাতে উঠলো জাতীয় দলের হয়ে প্রথম বড় ট্রফি।
২৮ বছরের শিরোপা-খরা শেষ হলো। আর মেসির কাঁধ থেকে নেমে গেল সবচেয়ে বড় বোঝাটি- দেশের হয়ে কিছু জিততে না পারার অভিযোগ। সেই আসরেই আর্জেন্টিনার হয়ে সর্বোচ্চ ম্যাচ খেলার রেকর্ডও গড়েন তিনি।

২০২২-২৪: আজন্ম স্বপ্ন পূরণ, তারপর কোপায় রাজত্ব
তারপর এলো কাতার। যে ট্রফির জন্য একটি জীবন অপেক্ষা, যে স্বপ্নের জন্য অসংখ্য রাত নির্ঘুম- অবশেষে সেটি ধরা দিলো। ফ্রান্সকে হারিয়ে ২০২২ বিশ্বকাপ চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা। ৩৬ বছরের অপেক্ষার অবসান। আর মেসির আজন্ম স্বপ্ন পূরণ। সাত গোল করে টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড়ের স্বীকৃতি পান তিনি। বিশ্বকাপের ইতিহাসে প্রথম ফুটবলার হিসেবে দ্বিতীয়বার গোল্ডেন বল জেতেন। ব্যক্তিগত অর্জনের পাশাপাশি পেলেন ফুটবলের সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত দলীয় পুরস্কার। দুই বছর পর, ২০২৪ কোপা আমেরিকাতেও চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা। একসময় যে মেসির হাতে জাতীয় দলের ট্রফি ছিল না, সেই মেসির হাতেই তখন বিশ্বকাপ, কোপা আমেরিকা- সবকিছু।

২০২৬: ‘মেসি যুগের’ অবসান
ট্রফি ধরে রাখার মিশনে ২০২৬ বিশ্বকাপে নামে আর্জেন্টিনা। আবারো সামনে মেসি। আবারো নেতৃত্ব। আবারো কোটি মানুষের প্রত্যাশা। দলকে ফাইনালে তুললেন তিনি। কিন্তু শেষ হাসি হাসতে পারলো না আর্জেন্টিনা। স্পেনের কাছে হেরে স্বপ্নভঙ্গ। বিশ্বকাপে ২১ গোল করে নতুন ইতিহাস গড়েছিলেন মেসি। পরে অবশ্য সেই রেকর্ড নিজের করে নেন কিলিয়ান এমবাপ্পে ২২ গোল নিয়ে। তবু রেকর্ড দিয়ে কি মেসিকে মাপা যায়? সম্ভবত না। বিশ্বকাপের সেই শোক কাটিয়ে ওঠার আগেই আরও বড় আঘাত আসে। ৮ই আগস্ট হারান বাবা হোর্হে মেসিকে। বাবার মৃত্যুতে ভেঙে পড়েন তিনি। মাত্র ২৩ দিন পর জাতীয় দল থেকে অবসরের ঘোষণা দেন। কিন্তু আর্জেন্টিনা তাকে শেষবারের মতো দেখতে চেয়েছিল। মেসিও ফিরলেন। বেনিনের বিপক্ষে শেষ ম্যাচ। শেষবারের মতো আর্জেন্টিনার জার্সি। শেষবারের মতো অধিনায়কের বাহুবন্ধনী। শেষবারের মতো জাতীয় সংগীতের সময় সতীর্থদের পাশে দাঁড়ানো। শেষবারের মতো সেই বাঁ পায়ের জাদু। তারপর বিদায়।

যে ছেলেটির আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার শুরু হয়েছিল মাত্র ৪৪ সেকেন্ডে লাল কার্ড দেখে, সেই ছেলেটিই শেষ পর্যন্ত আর্জেন্টিনার হয়ে জিতে গেল বিশ্বকাপ, কোপা আমেরিকা, অলিম্পিক স্বর্ণসহ অসংখ্য সম্মান। শুরুটা ছিল দুঃস্বপ্নের। মাঝের পথটা ছিল কান্না, সমালোচনা, ব্যর্থতা আর অসংখ্য প্রশ্নে ভরা। শেষটা? অমরত্বের। মেসি হয়তো আর আর্জেন্টিনার জার্সিতে মাঠে নামবেন না। তার বাঁ পায়ে আর দেখা যাবে না জাতীয় দলের হয়ে সেই পরিচিত জাদু। গ্যালারিতে উঠবে না ‘মেসি, মেসি’ ধ্বনি। কিন্তু কিছু মানুষ অবসর নেন, গল্প নয়। কিছু মানুষ মাঠ ছাড়েন, ইতিহাস নয়। লিওনেল মেসিও তাই। তিনি চলে গেলেন। রেখে গেলেন এমন এক গল্প, যার শেষ নেই। মেসি বিদায় নিলেন, কিন্তু মেসি থেকে যাবেন।