প্রেমিকের মরদেহ দেখতে ঢামেকে এসেছিলেন তন্ময়ী, কয়েক ঘণ্টা পর মিললো মরদেহ

ফন্ট সাইজ:

গত সোমবার সকাল ১০টার দিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের পুরোনো ভবনের ১১০ ও ১১১ নম্বর ওয়ার্ডের মাঝখানে বাথরুম থেকে উদ্ধার করা হয় ইব্রাহিম কার্ডিয়াক হাসপাতালের সিনিয়র স্টাফ নার্স তন্ময়ী মণ্ডলের ঝুলন্ত মরদেহ।

পুলিশ ও নিহতের পরিবার সূত্রে জানা যায়, নিহত তন্ময়ী মণ্ডলের প্রেমিক আকাশ মিত্র গত রোববার (৪ঠা অক্টোবর) কেরানীগঞ্জে আত্মহত্যা করেন। এর পরদিন সোমবার (৫ই অক্টোবর) ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে তার মরদেহের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়। সেদিন প্রেমিক আকাশের মরদেহ দেখতে ঢামেকের মর্গে গিয়েছিলেন তিনি । পুলিশের প্রাথমিক ধারণা, প্রেমিকের মরদেহ দেখার পর মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন তিনি। একপর্যায়ে শোক সইতে না পেরে নিজের হাত কেটে রক্তাক্ত করেন। পরবর্তীতে রক্তাক্ত অবস্থাতেই হাসপাতালের পুরোনো ভবনের নিচতলার একটি বাথরুমে প্রবেশ করে গলায় ফাঁস দেন। রক্তে তার পুরো শরীর ভেসে যায়। পুলিশের ধারণা, তন্ময়ী আত্মহত্যা করেছেন। তবে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ ও ঘটনার পূর্ণাঙ্গ বিশ্লেষণের জন্য ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনের অপেক্ষায় রয়েছে পুলিশ।

এর আগে গত ৪ঠা অক্টোবর কেরানীগঞ্জে আত্মহত্যা করেন প্রেমিক আকাশ মিত্র। দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) রফিকুল ইসলাম জানান, আর্থিক সংকট ও ঋণে জর্জরিত হয়ে আকাশ মিত্র মানসিকভাবে বিপর্যস্ত ছিলেন। মৃত্যুর আগে একটি চিঠি লিখেছিলেন আকাশ। সেখানে লেখা ছিল— “পৃথিবী ছেড়ে যেতে ইচ্ছে করে না, কিন্তু টাকা নেই।” চিঠিতে তন্ময়ী তার কাছে টাকা পাবেন বলেও উল্লেখ করা হয়েছিল। তবে টাকার পরিমাণ সম্পর্কে তিনি নিশ্চিত নন। এসআই রফিকুল ইসলাম আরও জানান, আকাশের মৃত্যুর জন্য কেউ দায়ী নন বলেও চিঠিতে উল্লেখ ছিল।

নিহত তন্ময়ীর বোন তন্দ্রা মণ্ডল বলেন, তন্ময়ী বরিশালের আগৈলঝাড়া উপজেলার মৃত বিভূত মণ্ডলের মেয়ে। কেরানীগঞ্জের আকাশ নামের এক ছেলের সঙ্গে তন্ময়ীর সম্পর্ক ছিল। আকাশ বিবাহিত ছিলেন, তন্ময়ী তা জানতেনও। আকাশ তার স্ত্রীকে ডিভোর্স দেবে বলে তাকে (তন্ময়ী) বলেছিলেন। এতে আকাশের সংসারে অশান্তি লেগেই ছিল। তার দাবি, আকাশ তন্ময়ীর সঙ্গে প্রতারণা করেছেন। বিভিন্ন অজুহাতে তার কাছ থেকে দুই লাখ টাকা নিয়েছিলেন। ওই টাকা তন্ময়ী আবার কয়েকজনের কাছ থেকে সংগ্রহ করে আকাশকে দিয়েছিলেন।‎ তন্দ্রা আরও বলেন, রোববার বিকালে কেরানীগঞ্জের বাসায় আকাশের মৃত্যু হয়। পরে তার মরদেহ ঢামেক হাসপাতালের মর্গে রাখা হয়। বিষয়টি জানতে পেরে তন্ময়ী ঢামেক হাসপাতালে যান। সেখানে কিছুক্ষণ ঘোরাঘুরি করেন। পরে হাসপাতালের টয়লেটে তার মরদেহ পাওয়া যায়।

শাহবাগ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মনিরুজ্জামান মানবজমিনকে বলেন, তন্ময়ী ও আকাশ মিত্রের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক ছিল। আকাশ মিত্রের মৃত্যুর পর তার মরদেহ দেখতে ঢামেকে আসেন তন্ময়ী। প্রেমিকের মরদেহ দেখার পর তিনি মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে তন্ময়ী আত্মহত্যা করে থাকতে পারেন। তবে ময়নাতদন্তের পর মৃত্যুর সঠিক কারণ জানা যাবে। এ বিষয়ে আইনি প্রক্রিয়া চলমান।

ভোরে প্রশাসনিক ব্লকের সামনে রক্তাক্ত ছুরি‎: সোমবার ভোরে হাসপাতালের প্রশাসনিক ব্লকের সম্মেলেন কক্ষের দ্বিতীয় গেটের সামনে একটি রক্তাক্ত কালো স্টিলের ফল কাটার ছুরি পড়ে থাকতে দেখা যায়। পরিচ্ছন্নতাকর্মী কাশী পেল্লী সন্তোষ জানান, সকাল আনুমানিক ৬টা থেকে সাড়ে ৬টার মধ্যে তিনি ছুরিটি রক্তাক্ত অবস্থায় দেখতে পান। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার নির্দেশে তিনি ওই এলাকার মেঝে পরিষ্কার করেন এবং ছুরিটি ধুয়ে নিজের কাছে সংরক্ষণ করে রাখেন।

হাসপাতালের সহকারী পরিচালক ডা. শায়লা ফেরদৌস আহসান বলেন, প্রশাসনিক ব্লকের সম্মেলন কক্ষের দুই নম্বর গেটের বাইরে রক্তাক্ত অবস্থায় একটি ছুরি পড়ে থাকতে দেখা যায়। সকাল ৮টার আগে আনসার সদস্যদের ডিউটি পরিবর্তন হয়। তখন দায়িত্বে থাকা আনসার সদস্য হাসপাতালের অফিস স্টাফ ও ক্লিনার সন্তোষকে ডেকে সম্মেলন কক্ষের সামনে রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে থাকা জায়গাটি পরিষ্কার করতে বলেন। তিনি বলেন, প্রথমে বিষয়টি নিয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত ছিল না। হাসপাতালে অনেক রোগী থাকায় বিভিন্ন সময় মেঝেতে রক্ত পড়ে থাকতে দেখা যায়। এ কারণে তারা ধারণা করেছিলেন, কোনো রোগী নিজের শরীরে আঘাত করার কারণে কিংবা কোনো ঝগড়ার ঘটনায় রক্ত পড়ে থাকতে পারে। পরে পরিচ্ছন্নতাকর্মী সন্তোষ কেমিক্যাল দিয়ে মেঝে পরিষ্কার করেন এবং ছুরিটি নিজের কাছে রাখেন। সহকারী পরিচালক আরও জানান, সম্মেলন কক্ষের দ্বিতীয় গেটের সামনেও রক্তের দাগ ছিল। আশপাশে ফোঁটা ফোঁটা রক্তের চিহ্নও পাওয়া যায়। সেগুলোও পরিষ্কার করা হয়েছে। হাসপাতালের ওই এলাকায় সিসিটিভি ক্যামেরা রয়েছে। পরে ক্যামেরার ফুটেজ পর্যালোচনা করলে বিষয়টি সম্পর্কে বিস্তারিত জানা যেতে পারে।