আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে সাবেক মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসানের পক্ষে মামলা পরিচালনার জন্য বিদেশি আইনজীবী নিয়োগের অনুমোদন চেয়ে বাংলাদেশ বার কাউন্সিলে আবেদন করেছেন যুক্তরাজ্যের আইনজীবী স্টিভেন কে সি। তিনি বৃটিশ আন্তর্জাতিক অপরাধ ও মানবাধিকার আইন বিশেষজ্ঞ। বার কাউন্সিলে ওই আবেদনের বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ না নেয়ায় জিয়াউল আহসানের পক্ষে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে আবেদন করেছেন তার আইনজীবী নাজনীন নাহার। আবেদনে বার কাউন্সিলকে জিয়াউল আহসানের করা আবেদনের বিষয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত দেয়ার নির্দেশনা এবং বিদেশি আইনজীবীকে ট্রাইব্যুনালে হাজির হয়ে মামলা পরিচালনার অনুমতি দেয়ার জন্য প্রয়োজনীয় আদেশ চাওয়া হয়েছে।
একইসঙ্গে জিয়াউল আহসানের মামলায় সাক্ষীদের সম্পর্কিত মোট ৫২টি ডকুমেন্টস পেতে সেনাবাহিনী, র্যাব ও অন্যান্য আইনপ্রোয়োগকারী সংস্থাকে নিদের্শ দিতে আবেদন করেন তার আইনজীবী নাজনীন। মঙ্গলবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন দুই সদস্যর বিচারিক প্যানেলে এই আবেদন দু’টির উপর শুনানি সম্পন্ন হয়। পরে আদেশের জন্য আজ (বুধবার) দিন ধার্য করেন ট্রাইব্যুনাল।
শুনানি শেষে প্রসিকিউটর এস. এম. তাসমিরুল ইসলাম মানবজমিনকে বলেন, জিয়াউলের পক্ষে ইতিপূর্বেও ২৫টি ডকুমেন্টস চেয়ে ট্রাইব্যুনালে আবেদন করেছিলেন তার আইনজীবী। ট্রাইব্যুনাল সেটি নামঞ্জুর করেন। কিন্তু সম্পূণ বেআইনিভাবে এই ২৫টি ডকুমেন্টসসহ মোট ৫২টি ডকুমেন্টস চেয়ে আবার আবেদন করা হয়েছে। আসামিপক্ষ ট্রাইব্যুনালের রুল-২০১০ সালের ১৯ (ক) উপধারা অনুযায়ী আবেদন করেন। অথচ এটি করার ক্ষমতা তাদের নেই। এটি সম্পূর্ণ রাষ্ট্রপক্ষ এবং শুধু রুল ১৯ অনুযায়ী ট্রাইব্যুনাল ডকুমেন্টস চেয়ে নিদের্শ দিতে পারেন।
এ ছাড়া র্যাবের কিছু মিটিংয়ের মিউনিটস চেয়ে আবেদন করেন। কিন্তু জবানবন্দিতেই সাক্ষী বলে গেছেন এসব সিদ্ধান্ত মৌখিকভাবে হয়েছে। কোনো লিথিত ডকুমেন্টস নাই। তাসমিরুল আরও বলেন, বিচার কাজে বিলম্ব করতেই জিয়াউলের আইনজীবীরা এসব আবেদন করছেন বলে অভিযোগ করেন তিনি। এদিকে জিয়াউলের আনজীবী শিব্বির আহমেদ বলেন, আমরা কিছু ডকুমেন্টস চেয়ে করা আবেদনের উপর শুনানি সম্পন্ন করেছি। আজ আদালত তার সিদ্ধান্ত জানাবেন।
বার কাউন্সিলে স্টিভেন কে সি’র আবেদন: গত ১৩ই জানুয়ারি করা আবেদনে স্টিভেন কে সি বলেন, মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসান তাকে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে তার পক্ষে ডিফেন্স আইনজীবী হিসেবে প্রতিনিধিত্ব করার জন্য অনুরোধ করেছেন। আবেদনটি ১৮ই জানুয়ারি বার কাউন্সিল রিসিভ করে। আবেদনে তিনি উল্লেখ করেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইন, ১৯৭৩-এর ১০(৮) ধারার বিধান অনুযায়ী তিনি জিয়াউল আহসানের পক্ষে ট্রাইব্যুনালের কার্যক্রমে আন্তর্জাতিক প্রতিরক্ষা আইনজীবী হিসেবে প্রতিনিধিত্ব করতে চান। স্টিভেন কে সি আরও বলেন, বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের আইন ও বিধিবিধান সম্পর্কে তিনি অবগত। ২০১০ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত ট্রাইব্যুনালে অনুষ্ঠিত বিচার কার্যক্রমে তিনি কয়েকজন আসামির পক্ষে আইনজীবী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
বার কাউন্সিলে আবেদন করেও সাড়া মেলেনি: এদিকে ট্রাইব্যুনালে করা আবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ বার কাউন্সিল ওই আবেদনের বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। পরে জিয়াউল আহসানের পক্ষে তার আইনজীবী নাজনীন ২৭শে জানুয়ারি বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের সচিবের কাছে একটি আবেদন করেন। ওই আবেদনে বলা হয়, ততদিনে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মামলাটিতে প্রসিকিউশন ১৫ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ শেষ করেছে। ফলে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার স্বার্থে জিয়াউল আহসানকে বিদেশি আইনজীবীর মাধ্যমে মামলা পরিচালনার সুযোগ দেয়ার আবেদনটি দ্রুত নিষ্পত্তি করা প্রয়োজন। কিন্তু এরপরও বাংলাদেশ বার কাউন্সিল এ বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ নেয়নি বলে ট্রাইব্যুনালে করা আবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। আবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের পক্ষ থেকে কোনো ব্যবস্থা না নেয়ায় জিয়াউল আহসানের নিজের পছন্দের বিদেশি আইনজীবী নিয়োগ করে আত্মপক্ষ সমর্থনের অধিকার নিশ্চিত করতে ট্রাইব্যুনালের হস্তক্ষেপ প্রয়োজন।
জুলাই হত্যা মামলা: এদিকে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত হত্যা মামলায় যুগ্ম সচিব ধনঞ্জয় কুমার দাসকে আত্মসমর্পণের নির্দেশ দিয়ে পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের নির্দেশ দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২। প্রসিকিউশন জানায়, ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ধনঞ্জয় কুমার দাসের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি ছিল। কিন্তু স্থায়ী ও অস্থায়ী ঠিকানায় গেলেও তার খোঁজ পাননি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। ফলে নন-এক্সিকিউশন রিপোর্ট (এনইআর) দিয়েছেন তারা। তাই তাকে হাজিরের জন্য দু’টি জাতীয় পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ প্রয়োজন। একইসঙ্গে পরবর্তী শুনানির জন্য সময় চায় প্রসিকিউশন। পরে ধনঞ্জয় কুমারকে আত্মসমর্পণের জন্য পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের নির্দেশ দেন ট্রাইব্যুনাল। এ ছাড়া পরবর্তী শুনানির জন্য আগামী ২৫শে অক্টোবর দিন ধার্য করা হয়। মামলার অপর আসামি সাবেক স্বরাষ্ট্র সচিব জাহাঙ্গীর আলম গ্রেপ্তার রয়েছেন।
