বড় স্বপ্ন নিয়ে জাপানে গিয়েছিল বাংলাদেশ এশিয়াড দল। ছিল পদকের আশ্বাস, ছিল সম্ভাবনার লম্বা তালিকা। গেমসে যাওয়ার আগে সংবাদ সম্মেলনেও বড় বড় আশার কথা শুনিয়েছিলেন বাংলাদেশ অলিম্পিক এসোসিয়েশনের (বিওএ) সহ-সভাপতি ও শেফ দ্য মিশন ইমরোজ আহমেদ। কিন্তু গেমস শেষে হিসাবের খাতা খুলতেই সামনে এলো চেনা ছবি- প্রত্যাশা আর প্রাপ্তির বিশাল ফারাক। ২২টি ডিসিপ্লিনে ১৮৭ ক্রীড়াবিদ, কোচ-কর্মকর্তাসহ ২৬০ সদস্যের বহর; অথচ অর্জন মাত্র একটি ব্রোঞ্জ। ১৯৮৬ সালের সিউল এশিয়ান গেমসে বক্সার মোশাররফ হোসেনের ব্রোঞ্জ অর্জনের ৪০ বছর পর ব্যক্তিগত ইভেন্টে বাংলাদেশের কোনো ক্রীড়াবিদের এটিই প্রথম পদক। ফলে জিন্নাত আক্তারের অর্জনের গুরুত্ব কম নয়। কিন্তু সামগ্রিক বিচারে আইচি-নাগোয়া এশিয়ান গেমস বাংলাদেশের জন্য হতাশারই।
এ ধরনের বড় আসরের আগে প্রস্তুতি, প্রশিক্ষণ, আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ, সরঞ্জাম, কোচিং, আবাসন ও যাতায়াত- সবকিছু মিলিয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও বিনিয়োগ প্রয়োজন। ভারত, চীন, জাপান কিংবা দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশগুলো পদকের জন্য বছরের পর বছর প্রস্তুতি নেয়, বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করে। ব্যতিক্রম বাংলাদেশ। এখানে অনেক সময় ক্রীড়াবিদের প্রস্তুতির চেয়ে কর্মকর্তাদের তালিকা নিয়েই ব্যস্ততা বেশি দেখা যায়। আইচি-নাগোয়াও তার ব্যতিক্রম ছিল না। মাস ছয়েক আগে বাংলাদেশ দলের জাপান সফর নিশ্চিত হলেও বেশির ভাগ ক্রীড়াবিদ প্রস্তুতির সুযোগ পেয়েছেন মাত্র তিন সপ্তাহ। এশিয়ার সেরা ক্রীড়াবিদদের সঙ্গে লড়াইয়ের জন্য তিন সপ্তাহের প্রস্তুতি কতটা যথেষ্ট, সেই প্রশ্নের উত্তর এবারের ফলাফলই দিয়েছে। এর মধ্যে ব্যতিক্রম ক্রিকেট। তারা সারা বছরই খেলার মধ্যে থাকে। কিন্তু সবচেয়ে বড় হতাশাটাও এসেছে ক্রিকেট থেকে।
সর্বশেষ এশিয়ান গেমসে (হাংঝু) নারী ও পুরুষ দুই দলই ব্রোঞ্জ জিতেছিল। ফলে এবারও ক্রিকেট থেকে পদকের প্রত্যাশা ছিল। কিন্তু নারী-পুরুষ দুই দলই ফিরেছে শূন্য হাতে। কাবাডি, শুটিং, আরচারি, গলফসহ কয়েকটি ডিসিপ্লিন নিয়েও ছিল প্রত্যাশা। কিন্তু সম্ভাবনাকে পদকে রূপ দেয়ার মতো ধারাবাহিক পরিকল্পনার অভাব আবারও স্পষ্ট হয়েছে। জিন্নাত আক্তারের ব্রোঞ্জকে অবশ্য ভাগ্যের বলে ছোট করার সুযোগ নেই। প্রথম রাউন্ডে বাই এবং কোয়ার্টার ফাইনালে প্রতিপক্ষের ওয়াকওভারে সেমিফাইনালে উঠলেও সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে পদক জেতেন এই উশু তারকা। তার সাফল্য প্রমাণ করে, বাংলাদেশের ক্রীড়াবিদদের সামর্থ্য আছে। কিন্তু সেই সামর্থ্যকে নিয়মিত পদকে পরিণত করার ব্যবস্থা নেই।
এখন দরকার নীতিতে পরিবর্তন। ২২ বা তারও বেশি ডিসিপ্লিনে অংশ নেয়াই সাফল্যের মাপকাঠি হতে পারে না। বরং ১০-১৫টি সম্ভাবনাময় ডিসিপ্লিন চিহ্নিত করে চার বছর ধরে কাজ করতে হবে। সেটিই এবার করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক। তিনি বলেন, ‘ব্যর্থতার প্রকৃত কারণ অনুসন্ধান ও ভবিষ্যৎ করণীয় নির্ধারণের জন্য এরই মধ্যে একটি বিশেষ মূল্যায়ন কমিটি গঠন করা হয়েছে। সরকারের বর্তমান লক্ষ্য কেবল কোনো আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করা নয়, বরং সরাসরি পদকের জন্য লড়াই করা। আগামীতে আমরা সেভাবেই নিজেদের প্রস্তুত করেই গেমসে যাবো।’ অর্থাৎ শুধু ‘ট্যুরিস্ট’ হয়ে বড় মঞ্চে মার্চ-পাস্ট করার দিন যে ফুরিয়েছে, সেই কড়া বার্তাটা এবার টেবিল থেকেই দিয়ে দেয়া হলো।
প্রতিবেশীদের দিকে তাকালেও বাংলাদেশের চিত্রটি আরও স্পষ্ট হয়। ভারত ২১টি স্বর্ণ, ২৭টি রৌপ্য ও ৩৭টি ব্রোঞ্জসহ মোট ৮৫টি পদক নিয়ে আসর শেষ করেছে। ক্রিকেট, কাবাডি, আরচারি ও হকির মতো দলগত ও গুরুত্বপূর্ণ ইভেন্টে তারা স্বর্ণ জিতেছে। শ্রীলঙ্কা পুরুষ জ্যাভলিন থ্রোতে স্বর্ণের পাশাপাশি নারী ক্রিকেটে রৌপ্য পেয়েছে। পাকিস্তান পুরুষ ক্রিকেটে রৌপ্যসহ মোট ১০টি পদক নিয়ে ফিরেছে। নেপালও জিতেছে দুটি ব্রোঞ্জ। অথচ বাংলাদেশের ঝুলিতে একটি মাত্র ব্রোঞ্জ।
