ফ্লাইদুবাইয়ের ফ্লাইটকে ৯/১১ স্টাইলে বিধ্বস্ত করার পরিকল্পনা করেছিলেন সহ-পাইলট হামাম আল-হামামি। এ জন্য তিনি বেছে নিয়েছিলেন ইসরাইলের বেন গুরিয়ন বিমানবন্দর। সেখানেই তার টার্গেট সম্পন্ন করার পরিকল্পনা করেন। তার আগে মূল পাইলটকে হত্যা করার পরিকল্পনা করেন, যাতে ওই বিমানবন্দরে অবতরণের অনুমতি পেতে সমস্যা না হয়। এ খবর দিয়েছে অনলাইন এনডিটিভি। এতে বলা হয়, গ্রেপ্তার হওয়া ওমানের ফার্স্ট অফিসার হামাম আল-হামামি সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) তদন্তকারীদের এসব তথ্য জানিয়েছেন। ফ্লাইদুবাইয়ের ১০৭৩ নম্বর ফ্লাইটের ক্যাপ্টেন স্মিত মাচ্চারকে হত্যার পর তিনি
স্বাভাবিকভাবেই বিমানটি চালিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করেন। যাতে কোনো সন্দেহ তৈরি না হয় এবং প্রয়োজনীয় সব অবতরণের অনুমতি পাওয়া যায়। এরপর বিমানবন্দরে পৌঁছে ৯/১১-এর মতো হামলা চালিয়ে বিমানটি কোনো ভবন বা অন্য একটি বিমানের ওপর বিধ্বস্ত করার পরিকল্পনা ছিল তার। ইসরাইলের হিব্রু ভাষার সংবাদমাধ্যমগুলো এ তথ্য জানিয়েছে।
ওয়াইনেট জানিয়েছে, পরিকল্পনা বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে ইসরাইলের কাছাকাছি পৌঁছানোর সময় জর্ডানের আকাশসীমায় মাচ্চারের ওপর হামলা চালান আল-হামামি।
তিনি মনে করেছিলেন, একেবারে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত অপেক্ষা করলে কেউ তার পরিকল্পনা বুঝতে পারবে না। ফলে তাকে থামানো বা সতর্ক করার মতো সময়ও কারও হাতে থাকবে না। তিনি আরও জানিয়েছেন, বিমানবন্দরে হামলা সফল না হলে তেল আবিবের কোনো সুউচ্চ ভবন অথবা জর্ডানে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটিগুলোর কোনো একটিতে বিমানটি বিধ্বস্ত করার পরিকল্পনা ছিল তার।
তবে তার পরিকল্পনা ব্যর্থ হয়ে যায়। আহত হওয়া সত্ত্বেও ভারতীয় পাইলট পাল্টা প্রতিরোধ করেন। তিনি বিপদসংকেত পাঠান এবং ককপিটের দরজা খুলে দেন। এরপর ক্রু ও যাত্রীরা মিলে সহকারী পাইলটকে নিয়ন্ত্রণে নেন এবং বিমানের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে ফিরিয়ে নেন। পরে দায়িত্বে থাকা দুই অফ-ডিউটি পাইলট বিমানটি নিরাপদে সৌদি আরবে অবতরণ করান। গত সপ্তাহে আবুধাবির একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ক্যাপ্টেন মাচ্চার ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে জানিয়েছেন, তাকে হামলার কয়েক মিনিট আগে আল-হামামি নামাজ পড়ার কথা বলেন। এরপর একটি ক্র্যাশ অ্যাক্স দিয়ে তার মাথায় জোরালো আঘাত করেন।
প্রথমে ক্যাপ্টেন মাচ্চার ভেবেছিলেন, বিমানটি হয়তো কোনো কিছুর আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কিন্তু পরে তিনি বলেন, আঘাতের পর আঘাত আসতেই থাকল। তখন বুঝতে পারলাম, এটা বিমানের কোনো সমস্যা নয়; আমার সঙ্গে ককপিটে থাকা অন্য লোকটিই আমাকে আঘাত করছে।
ইসরাইলের চ্যানেল ১২-এর কাছে সূত্রগুলো জানিয়েছে, আল-হামামি প্রথমে জুলাই মাসে তার পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু শেষ মুহূর্তে তিনি পিছিয়ে যান। কারণ ক্রু সদস্যদের একজনের সঙ্গে তার বন্ধুত্ব ছিল। প্রতিবেদনগুলোতে বলা হয়েছে, ফ্লাইদুবাইয়ে যোগ দেয়ার পর সাম্প্রতিক মাসগুলোতে আল-হামামি বেশ কয়েকবার বেন গুরিয়ন বিমানবন্দরে গিয়েছিলেন। তদন্তকারীদের তিনি জানিয়েছেন, জুন মাসে ইসরাইলে একটি সফরের সময় তিনি পুরোপুরি গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ ও হামলার পরিকল্পনা তৈরিতে মনোযোগ দিয়েছিলেন।
চ্যানেল ১৩-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক স্বল্পমূল্যের বিমান সংস্থা ফ্লাইদুবাইয়ে যোগ দেয়ার আগেই ওমানি সহকারী পাইলট হামলার পরিকল্পনা করেন। ফ্লাইদুবাই ইসরাইল ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যে নিয়মিত ফ্লাইট পরিচালনা করে। তদন্তকারীদের আল হামামি বলেছেন, তেল আবিবে কোন বিমান সংস্থা ফ্লাইট পরিচালনা করে, তা আমি খুঁজে দেখেছিলাম। এ কারণেই ফ্লাইদুবাইকে বেছে নিই। আমি চাকরিতে নেয়ার আগেই এ পরিকল্পনা করি।
ইতালির সংবাদপত্র কোরিয়েরে দেল্লা সেরা জানিয়েছে, ক্যাপ্টেন মাচ্চারের ওপর হামলার পর আল-হামামি বিমানের ইঞ্জিন বন্ধ করে দেন এবং রাডার সামনে ঠেলে দেন। এর ফলে এক মিনিটেরও কম সময়ে বিমানটি ১৬ হাজার ফুট নিচে নেমে যায় এবং প্রায় শব্দের গতির কাছাকাছি পৌঁছে যায়। ফ্লাইদুবাইয়ের এই ঘটনা নিয়ে তদন্ত চলার মধ্যেই প্রাথমিক তথ্যগুলোতে নিরাপত্তাব্যবস্থার বেশ কয়েকটি বড় ধরনের ঘাটতির বিষয় উঠে এসেছে। কর্মকর্তারা ইতিমধ্যে জানিয়েছেন, চরমপন্থী মতাদর্শ নিয়ে উদ্বেগ থাকায় ওমান সরকারই একসময় ওই ওমানি সহকারী পাইলটকে বিমান চালানো থেকে নিষিদ্ধ করেছিল। এখনও প্রশ্ন রয়েছে, ইসরাইলের সঙ্গে কোনো কূটনৈতিক সম্পর্ক নেই- এমন একটি আরব দেশ ওমানের নাগরিক কীভাবে বিপুলসংখ্যক ইসরাইলি যাত্রী নিয়ে তেল আবিবগামী একটি বিমান চালানোর সুযোগ পেলেন।
২৯ বছর বয়সী হামামি ওমানের নাগরিক। তার বাবা ওমানি এবং মা সিরীয়। সিরিয়ার গৃহযুদ্ধের সময় তিনি সেখানে বসবাস করেন। অনলাইনে তিনি আল-কায়েদার সমর্থনে বিভিন্ন বার্তা পোস্ট করেন বলেও জানা গেছে। ফ্লাইদুবাই কীভাবে ওই ওমানি পাইলটকে নিরাপত্তাঝুঁকি হিসেবে শনাক্ত করতে ব্যর্থ হলো, সেটিও এখনও স্পষ্ট নয়। আঞ্চলিক কর্মকর্তারা বার্তা সংস্থা এপি’কে জানিয়েছেন, আমিরাতের কর্তৃপক্ষ যাত্রী ও ক্রুদের জাতীয়তাসহ তাদের সম্পর্কে তথ্য ইসরাইলি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে শেয়ার করে নিয়েছিল।
কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ইসরাইল কোনো যাত্রী বা ক্রু সদস্যের ব্যাপারে কোনো সতর্কসংকেত দেয়নি। ইসরাইলের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা সংস্থা শিন বেত জানিয়েছে, বিদেশি ফ্লাইটের যাত্রী তালিকা যাচাইয়ের দায়িত্ব পরিবহন মন্ত্রণালয়ের। ইসরাইলের পরিবহনমন্ত্রী মিরি রেগেভ এক্সে লিখেছেন, ফ্লাইটের নিরাপত্তার দায়িত্ব নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর এবং তার মন্ত্রণালয়কে কোনো যাত্রী তালিকা বা কোনো সতর্কবার্তা দেওয়া হয়নি।
