বাংলাদেশের জন্য সুখবর অবশ্যই সুখবর। যুক্তরাজ্যের বাজারে বর্তমানে ৯৯.৮ শতাংশ পণ্যের ক্ষেত্রে শুল্কমুক্ত সুবিধা পাওয়া এবং এলডিসি থেকে উত্তরণের পরও উল্লেখযোগ্য অংশে সেই সুবিধা বহাল থাকার ঘোষণা নিঃসন্দেহে অর্থনীতির জন্য আশাব্যঞ্জক। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই সুবিধা কি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক নিরাপত্তার নিশ্চয়তা? উত্তর হলো, না। কারণ ২১ শতকের বিশ্বে শুধু শুল্কছাড় কোনো দেশের উন্নয়নের গ্যারান্টি নয়; বরং অর্থনীতি, ভূরাজনীতি এবং কৌশলগত কূটনীতির সমন্বিত শক্তিই নির্ধারণ করে একটি রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ অবস্থান।
বিশ্ব এখন এক অভূতপূর্ব রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বিশ্বায়নের যুগ ধীরে ধীরে স্থান দিচ্ছে কৌশলগত অর্থনীতির যুগকে। একসময় ব্যবসা ও রাজনীতি ছিল সমান্তরাল দুই রেখা; এখন তারা একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। কে কার সঙ্গে বাণিজ্য করবে, কোথায় বিনিয়োগ যাবে, কোন দেশের বাজার কতটা উন্মুক্ত থাকবে, এমনকি প্রযুক্তির প্রবাহ কোনদিকে যাবে, সেটিও আজ রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের অংশ হয়ে উঠেছে।
এই বাস্তবতায় বাংলাদেশের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এলডিসি উত্তরণ নয়; বরং এলডিসি-পরবর্তী পৃথিবীতে নিজেদের প্রাসঙ্গিক ও প্রতিযোগিতামূলক রাখা। বহু বছর ধরে স্বল্পোন্নত দেশের বিশেষ সুবিধা ভোগ করার পর বাংলাদেশ এখন এমন এক ধাপে পৌঁছেছে, যেখানে অর্জনের চেয়ে সক্ষমতার পরীক্ষা হবে বেশি। শুল্কমুক্ত সুবিধা একসময় শেষ হবে, কিন্তু প্রতিযোগিতা শেষ হবে না। বাজার থাকবে, কিন্তু বাজার দখলের লড়াই আরও কঠিন হবে।
বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি তৈরি পোশাক খাত। কিন্তু কেবল একটি খাতের ওপর দীর্ঘমেয়াদি নির্ভরতা কখনোই নিরাপদ কৌশল হতে পারে না। বিশ্ববাজারে প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সবুজ শিল্প এবং উচ্চমূল্যের রপ্তানিপণ্যের দিকে ঝুঁকছে উন্নয়নশীল দেশগুলো। সেখানে বাংলাদেশ যদি এখনও শ্রমঘন শিল্পের প্রাথমিক সুবিধার ওপর নির্ভর করে থাকে, তবে ভবিষ্যতে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হবে। এলডিসি উত্তরণ তাই কেবল একটি অর্থনৈতিক পরিচয়ের পরিবর্তন নয়; এটি একটি অর্থনৈতিক মানসিকতারও পরিবর্তন দাবি করে।
একই সঙ্গে বাংলাদেশের জন্য ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে কৌশলগত কূটনীতি। বঙ্গোপসাগর আজ শুধু ভৌগোলিক সীমানার অংশ নয়; এটি বৈশ্বিক শক্তির আগ্রহের কেন্দ্র। ইন্দো-প্যাসিফিককে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ভারত, জাপান, যুক্তরাজ্য এবং ইউরোপীয় শক্তিগুলোর নতুন কৌশলগত হিসাব-নিকাশে বাংলাদেশের অবস্থান আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
কিন্তু গুরুত্ব পাওয়া আর গুরুত্বকে কাজে লাগানো এক বিষয় নয়।
বাংলাদেশের কূটনীতির সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল ভারসাম্য। ঢাকা কখনও একক কোনো শক্তির ওপর নির্ভরতার পথ বেছে নেয়নি। এই নীতিই দেশকে জটিল আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার মধ্যেও স্থিতিশীল রেখেছে। আগামী বছরগুলোতে এই ভারসাম্য রক্ষার সক্ষমতাই হবে বাংলাদেশের সবচেয়ে মূল্যবান কৌশলগত সম্পদ। কারণ বর্তমান বিশ্বে মিত্রতা স্থায়ী নয়, স্বার্থই স্থায়ী।
দক্ষিণ এশিয়ার বৃহত্তর বাস্তবতাও একই বার্তা দিচ্ছে। ভারত দ্রুত অর্থনৈতিক শক্তিতে পরিণত হচ্ছে। পাকিস্তান দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে। শ্রীলঙ্কা ঋণসংকটের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেওয়ার চেষ্টা করছে। নেপাল ও মালদ্বীপ আঞ্চলিক শক্তিগুলোর প্রভাবের ভারসাম্য খুঁজছে। এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ যদি রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ এবং দক্ষ কূটনৈতিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে পারে, তবে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম নির্ভরযোগ্য অর্থনৈতিক কেন্দ্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করা অসম্ভব নয়।
তবে কেবল অর্থনীতি দিয়েও আগামী পৃথিবীকে ব্যাখ্যা করা যাবে না। জলবায়ু পরিবর্তন, সাইবার নিরাপত্তা, খাদ্য নিরাপত্তা এবং মানবিক সংকট নতুন ধরনের নিরাপত্তা বাস্তবতা তৈরি করেছে। রোহিঙ্গা সংকট তার সবচেয়ে বড় উদাহরণ। এক মিলিয়নের বেশি বাস্তুচ্যুত মানুষের দায়ভার বহন করে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক মানবিক দায়িত্ব পালন করেছে, কিন্তু এই সংকট দীর্ঘায়িত হওয়ার অর্থ হলো অর্থনীতি, পরিবেশ এবং নিরাপত্তার ওপর ক্রমবর্ধমান চাপ। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতিশ্রুতি যতটা গুরুত্বপূর্ণ, তার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ কার্যকর উদ্যোগ।
জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের অবস্থান একই রকম বৈপরীত্যপূর্ণ। দেশটি সংকটের অন্যতম বড় ভুক্তভোগী, আবার অভিযোজন সক্ষমতার ক্ষেত্রেও বিশ্বে একটি সফল উদাহরণ। তাই জলবায়ু কূটনীতি আগামী দিনে বাংলাদেশের জন্য শুধু পরিবেশগত বিষয় হবে না; এটি হবে অর্থনৈতিক এবং কৌশলগত স্বার্থ রক্ষারও একটি বড় হাতিয়ার।
আজকের পৃথিবীতে উন্নয়নের ভাষা বদলে গেছে। উন্নয়ন আর শুধু জিডিপি প্রবৃদ্ধির পরিসংখ্যান নয়; উন্নয়ন মানে বাজার, প্রযুক্তি, নিরাপত্তা, বিনিয়োগ, জলবায়ু সহনশীলতা এবং আন্তর্জাতিক প্রভাবের সমন্বিত শক্তি। যে দেশ এই বাস্তবতা যত দ্রুত উপলব্ধি করবে, সে দেশ তত দ্রুত এগিয়ে যাবে।
যুক্তরাজ্যের শুল্কমুক্ত সুবিধার ঘোষণা অবশ্যই স্বাগত। কিন্তু এটিকে চূড়ান্ত সাফল্য হিসেবে দেখলে ভুল হবে। বরং এটি বাংলাদেশের জন্য একটি সুযোগের জানালা। সেই জানালা দিয়ে বিশ্ববাজারে আরও শক্ত অবস্থান, বহুমুখী অর্থনীতি এবং প্রভাবশালী কৌশলগত অংশীদারিত্ব গড়ে তোলাই হওয়া উচিত আগামী দিনের লক্ষ্য।
কারণ ইতিহাস বলে, আন্তর্জাতিক সম্পর্কের টেবিলে স্থায়ী বন্ধু বা প্রতিপক্ষ বলে কিছু নেই; স্থায়ী থাকে কেবল জাতীয় স্বার্থ। আর সেই স্বার্থ রক্ষায় অর্থনৈতিক শক্তি, রাজনৈতিক দূরদর্শিতা এবং দক্ষ কূটনীতির কোনো বিকল্প নেই।
লেখক: সহিদুল আলম স্বপন; জেনেভাভিত্তিক রাজনৈতিক বিশ্লেষক, প্রাইভেট ব্যাংকিং ফিন্যান্সিয়াল ক্রাইম কমপ্লায়েন্স বিশেষজ্ঞ, কলামিস্ট ও কবি। দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতি, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, বৈশ্বিক আর্থিক স্বচ্ছতা ও কৌশলগত বিষয় নিয়ে নিয়মিত লেখেন।
ই-মেইল: [email protected]
শুল্কমুক্ত সুবিধার বাইরে: নতুন বিশ্বব্যবস্থায় বাংলাদেশের কূটনৈতিক পরীক্ষার সময়
সহিদুল আলম স্বপন
মত-মতান্তর
১ ঘন্টা আগে
৪ অক্টোবর (রবিবার), ২০২৬, ৯ঃ২২ (অপরাহ্ণ)
লিংক কপি হয়েছে!
ফন্ট সাইজ:
100%
