একই বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক পদে একদিনের ব্যবধানে দুই শিক্ষকের বদলির আদেশকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট জটিলতা সাত বছরেও কাটেনি। মামলা-মোকদ্দমা ও প্রশাসনিক জটিলতায় দীর্ঘদিন ধরে প্রধান শিক্ষক ছাড়াই চলছে সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর উপজেলা সদরের জগন্নাথপুর মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। এতে বিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ও শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে বলে দাবি করেছেন অভিভাবকরা। জানা গেছে, ২০১৯ সালে জগন্নাথপুর মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তৎকালীন প্রধান শিক্ষক বদলি হয়ে যাওয়ায় পদটি শূন্য হয়। ওই বছরের ১৮ই সেপ্টেম্বর উপজেলা শিক্ষা কার্যালয় প্রধান শিক্ষক নিয়োগের জন্য আবেদন আহ্বান করে। এতে উপজেলার দুইজন প্রধান শিক্ষক ও তিনজন চলতি দায়িত্বে থাকা প্রধান শিক্ষক আবেদন করেন।
৬ই অক্টোবর উপজেলা শিক্ষা কার্যালয় আবেদনকারীদের জ্যেষ্ঠতার তালিকা প্রকাশ করে। তালিকায় ১ নম্বরে ছিলেন দক্ষিণ হবিবপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক গোপাল চন্দ্র দাস এবং ৫ নম্বরে ছিলেন রতিয়ারপাড়া বাদশা মিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চলতি দায়িত্বের প্রধান শিক্ষক গণেশ চক্রবর্তী। জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে গোপাল চন্দ্র দাসকে জগন্নাথপুর মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক পদে বদলির জন্য উপজেলা শিক্ষা কার্যালয় ও জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কার্যালয় থেকে সিলেট বিভাগীয় প্রাথমিক শিক্ষা কার্যালয়ের উপ-পরিচালকের কাছে সুপারিশ পাঠানো হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে একই বছরের ১০ই ডিসেম্বর সিলেট বিভাগীয় প্রাথমিক শিক্ষা কার্যালয়ের উপ-পরিচালক গোপাল চন্দ্র দাসকে ওই বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক পদে বদলির আদেশ দেন।
পরদিন বদলিকৃত বিদ্যালয়ে যোগদানের জন্য উপজেলা শিক্ষা কার্যালয়ে গেলে গোপাল চন্দ্র দাস জানতে পারেন, তার যোগদানের আগেই প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর থেকে ই-মেইলে একই বিদ্যালয়ের একই পদে গণেশ চক্রবর্তীকে বদলির আরেকটি আদেশ দেয়া হয়েছে। একই পদে দুই শিক্ষকের বদলির বিষয়টির প্রতিকার চেয়ে গোপাল চন্দ্র দাস প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনাল, ঢাকা-১-এ মামলা করেন। ট্রাইব্যুনাল বিষয়টি আমলে নিয়ে গণেশ চক্রবর্তীর বদলি আদেশের উপর স্থগিতাদেশ দেন। পরে স্থগিতাদেশ প্রত্যাহারের আবেদন করেন গণেশ চক্রবর্তী। শুনানি শেষে আদালত স্থগিতাদেশ বহাল রাখেন। এরপর গণেশ চক্রবর্তী পরপর দুইবার মিস আপিল করলেও শুনানি শেষে আদালত তা খারিজ করেন। সর্বশেষ গণেশ চক্রবর্তীর তৃতীয় মিস আপিলের পর গত ১৪ই সেপ্টেম্বর আদালত আদেশ দেন।
এতে প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনাল অ্যাক্ট, ১৯৮০-এর ৪(২) ধারা অনুযায়ী বিভাগীয় কোনো আদেশে সংক্ষুব্ধ হলে প্রথমে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে আপিল বা রিভিউ করার কথা উল্লেখ করা হয়। আদালতের মতে, গোপাল চন্দ্র দাস তা করেননি। এ কারণে মামলাটি খারিজ করা হয়। তবে একই আদেশে প্রশাসনের উচ্চপর্যায়ের কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। গোপাল চন্দ্র দাস বলেন, সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সুপারিশ ও নীতিমালা অনুযায়ী তার বদলির আদেশ হওয়ার পরদিন অদৃশ্য কারণে গণেশ চক্রবর্তীর বদলি আদেশ দেয়া হয়েছিল। বর্তমানে ট্রাইব্যুনালের আদেশে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে পরবর্তী ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। তিনি আশা করছেন, দীর্ঘ সাত বছর পর তিনি ন্যায়বিচার পাবেন।
অন্যদিকে গণেশ চক্রবর্তী বলেন, নিয়োগের জন্য আবেদন আহ্বানের পর তিনি প্রথমে উপজেলা শিক্ষা কার্যালয়ে আবেদন করেন। ওই আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে গোপাল চন্দ্র দাসের একদিন আগে তাকে বদলির আদেশ দেয়া হয়। পরে গোপাল চন্দ্র দাস মামলা করে তার বদলি স্থগিত করান। এদিকে দীর্ঘদিন প্রধান শিক্ষক না থাকায় বিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ও শিক্ষা কার্যক্রমে নানা সমস্যা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন অভিভাবকরা। জগন্নাথপুর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোহাম্মদ মাহাবুবুল আলম বলেন, মামলার একটি আদেশ পাওয়ার পর ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণে মতামত চাওয়া হয়েছে। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ যে সিদ্ধান্ত দেবে, তা বাস্তবায়ন করা হবে।
