শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর বিষয়ে ভারত কোনো নির্দিষ্ট টাইমফ্রেম দিতে পারবে না, ঢাকায় ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর এই বক্তব্যকে নিছক একটি কূটনৈতিক বাক্য হিসেবে দেখলে ভুল হবে। বক্তব্যটির ভেতরে একই সঙ্গে আছে আইনের কথা, কূটনীতির ভাষা এবং একটি স্পষ্ট রাজনৈতিক বার্তা। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্তাটি হলো, নয়াদিল্লি এখনই শেখ হাসিনাকে ফেরত পাঠানোর কোনো টাইমফ্রেম দিতে প্রস্তুত নয়।
৩ অক্টোবর ঢাকায় বে অব বেঙ্গল কনভারসেশন-২০২৬-এর এক অধিবেশনে প্রশ্নের জবাবে ত্রিবেদী বলেন, শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ নিয়ে একটি ‘সু-গঠিত আইনি প্রক্রিয়া’ চলছে এবং এতে আদালতও যুক্ত। ফলে ‘কেউ কোনো টাইমফ্রেম দিতে পারবে না’। একই আলোচনায় তিনি ২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনার ভারতে যাওয়ার ঘটনাটিও ব্যাখ্যা করেন। তার ভাষ্য, শেখ হাসিনা ভারতীয় বিমানবাহিনী বা সেনাবাহিনীর মাধ্যমে ভারতে যাননি; বাংলাদেশের সামরিক বিমানে করে তিনি ভারতে পৌঁছেছিলেন। তখন তিনি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন এবং পরিস্থিতিতে ভারতীয়দের সামনে তাকে অবতরণের অনুমতি দেওয়া ছাড়া ‘খুব বেশি বিকল্প’ ছিল না। এখানেই আসল প্রশ্নটি।
ভারত যদি বলে, প্রত্যর্পণ একটি আইনি প্রক্রিয়া—তাহলে সেই আইনি প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা কোথায়? আর যদি বিষয়টি আইনি হওয়ার পাশাপাশি সরকারের সিদ্ধান্তের সঙ্গেও সম্পর্কিত হয়, তাহলে শুধু আদালতের দোহাই দিয়ে অনির্দিষ্ট সময় অপেক্ষা করার যুক্তি কতটা গ্রহণযোগ্য?
প্রথমে আইনের জায়গাটি পরিষ্কার করা দরকার। ভারত-বাংলাদেশের মধ্যে ২০১৩ সালের প্রত্যর্পণ চুক্তি কার্যকর রয়েছে; ২০১৬ সালে এর একটি সংশোধনও করা হয়। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নিজস্ব তালিকায় বাংলাদেশকে প্রত্যর্পণ চুক্তি থাকা দেশ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। চুক্তির মূল কাঠামো অনুযায়ী, দুই দেশ নির্দিষ্ট শর্তসাপেক্ষে অপর দেশের ভূখণ্ডে থাকা অভিযুক্ত বা দণ্ডিত ব্যক্তিকে প্রত্যর্পণের বিষয়ে সহযোগিতা করার অঙ্গীকার করেছে।
অর্থাৎ বিষয়টি এমন নয় যে ভারত চাইলে আজই কাউকে বিমানে তুলে পাঠিয়ে দিল, অথবা না চাইলে অনির্দিষ্টকাল বসিয়ে রাখল, মাঝখানে কোনো আইন নেই। আইন আছে, দ্বিপক্ষীয় চুক্তি আছে, প্রক্রিয়া আছে এবং রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষের দায়িত্বও আছে।
ভারতের Extradition Act, 1962 সেই কাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ অংশ। আরও তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নিজেই বলছে, প্রত্যর্পণ বিষয়ে তারাই কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষ এবং প্রত্যর্পণ-সংক্রান্ত অনুরোধ প্রক্রিয়াকরণে তাদের কেন্দ্রীয় ভূমিকা রয়েছে। প্রয়োজন অনুযায়ী আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা, আদালত ও অন্যান্য সরকারি কর্তৃপক্ষও প্রক্রিয়ায় যুক্ত হয়।
তাই ‘আদালত যুক্ত আছে, ফলে সময়সীমা বলা যায় না’ এই ব্যাখ্যা পুরো ছবির একাংশ মাত্র।
আইনের অধীনে ম্যাজিস্ট্রেট পর্যায়ের অনুসন্ধান, গ্রেপ্তার, হেফাজত এবং পরবর্তী প্রত্যর্পণ-সংক্রান্ত ধাপ রয়েছে। আবার কেন্দ্রীয় সরকারেরও গুরুত্বপূর্ণ ক্ষমতা রয়েছে। এমনকি আইনের ২৯ ধারায় নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে কেন্দ্রীয় সরকার প্রত্যর্পণ-প্রক্রিয়া স্থগিত বা কোনো ব্যক্তিকে অব্যাহতি দেওয়ার ক্ষমতা রাখে। ফলে ভারতের প্রত্যর্পণ ব্যবস্থা ‘শুধু আদালত’ নয়, আবার ‘শুধু সরকার’ও নয়; এটি বিচারিক ও নির্বাহী দুই ধরনের আইনি ভূমিকার সমন্বিত কাঠামো। এই জায়গাটিই বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
ভারত যদি বলে, ‘প্রক্রিয়া চলছে’, তাহলে ঢাকার স্বাভাবিক প্রশ্ন হওয়া উচিত প্রক্রিয়ার কোন ধাপে বিষয়টি আছে? বাংলাদেশের প্রত্যর্পণ অনুরোধ কি আনুষ্ঠানিকভাবে গৃহীত হয়েছে? নথিপত্রের আইনি পরীক্ষা কোথায় দাঁড়িয়েছে? কোনো অতিরিক্ত নথি বা ব্যাখ্যা ভারত চেয়েছে কি না? সংশ্লিষ্ট আদালত বা কর্তৃপক্ষের সামনে বিষয়টি কোন পর্যায়ে? এসব প্রশ্নের উত্তর প্রকাশ করা সম্ভব না হলে অন্তত কূটনৈতিক পর্যায়ে তার একটি কাঠামোবদ্ধ ব্যাখ্যা থাকা প্রয়োজন। কারণ ‘সময় বলা যাবে না’ আর ‘কোনো অগ্রগতি জানানো যাবে না’ দুটি এক জিনিস নয়।
ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এর আগেও বলেছে, বাংলাদেশের প্রত্যর্পণ অনুরোধ তারা পরীক্ষা করছে এবং আইনি ও বিচারিক বিষয় বিবেচনায় নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। জুলাই ২০২৬-এ মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়ালও একই অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেছিলেন। অর্থাৎ ৩ অক্টোবরের বক্তব্য ভারতের পূর্ববর্তী অবস্থান থেকে মৌলিকভাবে আলাদা নয়; বরং সেটিকে আরও সরাসরি ও রাজনৈতিকভাবে দৃশ্যমান করেছে।
এখন আসা যাক ২০২৪ সালের ঘটনাটিতে। দীনেশ ত্রিবেদী বলেছেন, শেখ হাসিনা তখনও বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন এবং হঠাৎ তৈরি হওয়া পরিস্থিতিতে ভারত প্রস্তুত ছিল না। তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, ভারত যদি সেই বিমানকে অবতরণের অনুমতি না দিত, তাহলে কী পরিস্থিতি তৈরি হতো? তার বক্তব্যের রাজনৈতিক তাৎপর্য স্পষ্ট: ভারত শেখ হাসিনাকে পরিকল্পিতভাবে ‘নিয়ে যায়নি’; বরং একটি আকস্মিক ও সংকটপূর্ণ পরিস্থিতিতে প্রতিবেশী হিসেবে তাকে গ্রহণ করেছিল।
এই ব্যাখ্যার একটি মানবিক ও কূটনৈতিক ভিত্তি আছে। একটি রাষ্ট্রের সরকার পতনের মুহূর্তে কোনো সাবেক বা ক্ষমতাসীন নেতার নিরাপত্তা নিয়ে তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ বিষয় নয়। কিন্তু ২০২৪ সালের সিদ্ধান্তের যৌক্তিকতা ব্যাখ্যা করা আর ২০২৬ সালে তার প্রত্যর্পণ প্রশ্নের উত্তর দেওয়া দুটি পৃথক বিষয়।
বাংলাদেশের জন্য আজকের প্রশ্ন ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট কেন ভারত তাকে গ্রহণ করেছিল, শুধু সেটি নয়। প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে প্রত্যর্পণ চাওয়ার পর দুই বছর পেরিয়ে গেলেও প্রক্রিয়াটি কোথায় এসে দাঁড়িয়েছে? এখানেই সময়ের প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ।
আইনে সব প্রত্যর্পণ মামলার জন্য একটি অভিন্ন ‘৩০ দিন’, ‘৬০ দিন’ বা ‘ছয় মাস’ ধরনের বাধ্যতামূলক সময়সীমা থাকতেই হবে—এমন কথা বলা যায় না। আন্তর্জাতিক প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়া অনেক সময় নথি যাচাই, অভিযোগের প্রকৃতি, আদালতের সিদ্ধান্ত, দ্বিপক্ষীয় চুক্তির ব্যতিক্রম এবং সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রের আইনি কাঠামোর ওপর নির্ভর করে। ফলে ত্রিবেদীর ‘কোনো টাইমফ্রেম দেওয়া সম্ভব নয়’ বক্তব্যের একটি আইনি ভিত্তি আছে। কিন্তু এখানেই কূটনৈতিক জবাবদিহির প্রশ্ন।
একটি রাষ্ট্র কোনো নির্দিষ্ট তারিখ দিতে না পারলেও একটি ‘প্রক্রিয়াগত অবস্থান’ জানাতে পারে। যেমন—অনুরোধ পরীক্ষাাধীন, আইনি মতামত চাওয়া হয়েছে, অতিরিক্ত নথি প্রয়োজন, আদালতের পর্যবেক্ষণ অপেক্ষমাণ, অথবা সরকারের সিদ্ধান্তের পর্যায়ে রয়েছে। এর কোনটি সত্য, সেটিই বাংলাদেশের জানার অধিকার।
কারণ অনির্দিষ্ট সময়সীমা যদি একবারের জন্য আইনি বাস্তবতা হয়, সেটি গ্রহণযোগ্য। কিন্তু অনির্দিষ্ট সময়সীমা যদি সিদ্ধান্ত এড়িয়ে যাওয়ার কূটনৈতিক কৌশলে পরিণত হয়, তখন প্রশ্ন উঠবেই।
এখানে বাংলাদেশেরও আত্মসংযম প্রয়োজন। প্রত্যর্পণকে শুধু আবেগের প্রশ্ন বানালে কূটনৈতিক ফল কমে যাবে। ‘আজই ফেরত দিতে হবে’, এই ধরনের রাজনৈতিক চাপ আন্তর্জাতিক আইনি প্রক্রিয়াকে দ্রুত করার বদলে উল্টো কঠিন করতে পারে। ঢাকার উচিত আইনি নথি, বিচারিক ভিত্তি, প্রত্যর্পণ চুক্তির বিধান এবং আন্তর্জাতিক আইনের যুক্তি সামনে রেখে ধারাবাহিকভাবে চাপ তৈরি করা।
অন্যদিকে ভারতের জন্যও বিষয়টি শুধু শেখ হাসিনাকে আশ্রয় দেওয়ার প্রশ্ন নয়। বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক দীর্ঘমেয়াদি এবং বহুমাত্রিক। বাণিজ্য, সীমান্ত, পানি, যোগাযোগ, নিরাপত্তা, জ্বালানি, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা, প্রতিটি ক্ষেত্রেই দুই দেশের পারস্পরিক স্বার্থ রয়েছে। ত্রিবেদী নিজেও বলেছেন, প্রতিবেশী দুই দেশের সমস্যার সমাধান সংলাপ ও পরামর্শের মাধ্যমে হওয়া উচিত এবং সম্পর্ক অন্য দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের ওপর নির্ভর করবে না।
সুতরাং হাসিনা প্রশ্নটি এখন ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের একটি পরীক্ষাও বটে।
ভারত চাইলে বলতে পারে, আমরা আইন মেনে চলছি। বাংলাদেশও বলতে পারে, আমরাও আইনের পথেই প্রত্যর্পণ চেয়েছি। এই দুই বক্তব্যের মাঝখানে আসল প্রয়োজন হচ্ছে প্রক্রিয়ার বিশ্বাসযোগ্যতা।
শেখ হাসিনাকে ভারত কবে ফেরত দেবে? এই মুহূর্তে তার উত্তর সত্যিই হয়তো কারও হাতে নেই। কিন্তু ভারত কী করছে, কোন আইনি কাঠামোয় করছে এবং সিদ্ধান্তের পথে পরবর্তী ধাপ কী—এই প্রশ্নগুলোর উত্তর অস্পষ্ট থাকার কথা নয়। কারণ সময়সীমা না থাকা এক বিষয়; জবাবদিহি না থাকা আরেক বিষয়।
আর বাংলাদেশের জন্য মূল শিক্ষা আরও সরল: কূটনীতিতে আবেগ দিয়ে দাবি তোলা যায়, কিন্তু ফল আদায় করতে হয় আইন, নথি, আন্তর্জাতিক সমর্থন এবং ধারাবাহিক আলোচনার মাধ্যমে।
শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ তাই শুধু একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রীর দেশে ফেরার প্রশ্ন নয়। এটি একই সঙ্গে বাংলাদেশের বিচারপ্রক্রিয়ার বিশ্বাসযোগ্যতা, ভারতের আইনের শাসনের প্রতি অঙ্গীকার এবং দুই প্রতিবেশী রাষ্ট্রের পারস্পরিক আস্থার পরীক্ষা।
ভারত সময়সীমা না-ও দিতে পারে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাকে একটি প্রশ্নের উত্তর দিতেই হবে—প্রক্রিয়া চলছে, ঠিক আছে; কিন্তু সেই প্রক্রিয়ার শেষ কোথায়?
লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিস্ট
email: [email protected]
