চব্বিশ-উত্তর বাংলাদেশে সাংবিধানিক সংস্কারের যে গুরুত্বপূর্ণ কাজ শুরু হয়েছে, তা এগিয়ে নিতে রাজনীতিতে বৃহত্তর ঐকমত্য গড়ে তোলার উদ্যোগ প্রয়োজন বলে মনে করেন ঢাকায় নিযুক্ত ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূত মাইকেল মিলার। ইউরোপের সফল রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক রূপান্তরের অভিজ্ঞতার আলোকে সরকারি প্রশাসন সংস্কারে দক্ষতা দেয়ার প্রস্তাবও দেন তিনি। মিলারের ভাষ্য, বাংলাদেশে সাংবিধানিক সংস্কারের যে কাজ শুরু হয়েছে তা কিন্তু শেষ হয়নি—এটি সম্পন্ন করতে রাজনীতিতে আরও ঐকমত্য দরকার।
রোববার রাজধানীর একটি হোটেলে বে অব বেঙ্গল কনভারসেশন-২০২৬ এর দ্বিতীয় দিনের কর্মঅধিবেশনে দেওয়া বক্তব্যে এ মন্তব্য করেন তিনি। তিন দিনব্যাপী আন্তর্জাতিক এই সম্মেলনের আয়োজক গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস)।
ইইউ রাষ্ট্রদূত বলেন, বাংলাদেশ তার উন্নয়ন অভিযাত্রার একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে রয়েছে। একদিকে স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণের প্রক্রিয়া চলছে, অন্যদিকে রাজনৈতিক রূপান্তর, জবাবদিহিতামূলক রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর পুনরুজ্জীবন, অর্থনৈতিক চাপ, জলবায়ুগত ঝুঁকি এবং জটিল বৈদেশিক পরিবেশ মোকাবিলা করতে হচ্ছে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশকে যদি এসব বাহ্যিক চাপ মোকাবিলা করতে হয়, তাহলে শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি, স্বাধীন তদারকি ব্যবস্থা এবং অনুমানযোগ্য ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া প্রয়োজন। সংবিধান সংস্কারের যে গুরুত্বপূর্ণ কাজ শুরু হয়েছে, অথচ এখনো শেষ হয়নি, তা এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। এর জন্য রাজনীতিতে বৃহত্তর ঐকমত্য গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
বাংলাদেশের সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সম্পর্কের বিষয়ে তিনি বলেন, বাংলাদেশকে এখন আর দাতা ও গ্রহীতার দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা হচ্ছে না। বরং ক্রমবর্ধমান কৌশলগত গুরুত্বের অংশীদার হিসেবে দেখা হচ্ছে। স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বাংলাদেশের মসৃণ ও সফল উত্তরণ নিশ্চিত করতে ইউরোপীয় ইউনিয়ন কাজ করতে চায়। পাশাপাশি ভবিষ্যতে বাংলাদেশের সঙ্গে একটি মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির সম্ভাবনাও যাচাই করা হচ্ছে।
ইইউ রাষ্ট্রদূত বলেন, এখনো স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণ না করা কোনো দেশের সঙ্গে এ ধরনের মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির প্রস্তাব ইউরোপীয় ইউনিয়নের জন্য প্রথম। বাংলাদেশ যে গতি ও উচ্চাকাঙ্ক্ষা দেখাবে, ইউরোপীয় ইউনিয়নও তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগিয়ে যেতে প্রস্তুত।
তিনি বলেন, একটি ভারসাম্যপূর্ণ, পারস্পরিক ও উভয় পক্ষের জন্য লাভজনক চুক্তির জন্য পর্যাপ্ত অভিন্ন ভিত্তি রয়েছে কি না, তা আগে চিহ্নিত করতে হবে। এ ক্ষেত্রে ইউরোপীয় ইউনিয়নের ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশের উন্নয়ন ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে জবাবদিহিতামূলক প্রতিষ্ঠান, আইনের শাসন, শ্রম অধিকারের প্রতি সম্মান, মানবাধিকার, পরিবেশ সুরক্ষা ও সুশাসনের ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
ইইউ রাষ্ট্রদূত বলেন, বাংলাদেশকে দেশি ও বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে এবং তরুণদের জন্য অর্থপূর্ণ কর্মসংস্থান তৈরি করতে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান ও তদারকি ব্যবস্থা প্রয়োজন। গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর ওপর নিয়ন্ত্রণ সুরক্ষিত রাখা এবং তথ্য ও উপাত্ত স্বচ্ছতার সঙ্গে পরিচালনার বিষয়েও সতর্ক থাকতে হবে।
বাংলাদেশে ইউরোপীয় বিনিয়োগের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রস্তাবের বিশেষত্ব হলো—ইউরোপীয় বিনিয়োগের সঙ্গে তাদের মূল্যবোধের সমন্বয়। প্রযুক্তি, আন্তর্জাতিক মান, দীর্ঘমেয়াদি পুঁজি ও উদ্ভাবনের মাধ্যমে বাংলাদেশকে সহযোগিতা করতে চায় ইউরোপীয় ইউনিয়ন। চট্টগ্রামের লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনাল এবং গ্রিন বন্ডের উদাহরণও তুলে ধরেন তিনি।
ইইউ রাষ্ট্রদূত বলেন, বাংলাদেশকে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার মধ্য দিয়ে এগিয়ে নিতে, আধুনিকায়ন করতে এবং একটি উন্মুক্ত, সার্বভৌম, স্থিতিস্থাপক ও সংযুক্ত দেশ হিসেবে এগিয়ে যেতে সহযোগিতা করতে চায় ইউরোপীয় ইউনিয়ন।
