উন্নয়নের জন্য শক্তিশালী রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান অপরিহার্য

ফন্ট সাইজ:

উন্নয়নের জন্য শক্তিশালী রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান অপরিহার্য বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। শনিবার প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস) এর উদ্যোগে তিনদিনব্যাপী ‘বে অব বেঙ্গল কনভারসেশ ‘এর এই উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি এ মন্তব্য করেন। এতে সার্বিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট বরিস তাদিচ এবং মালির সাবেক প্রধানমন্ত্রী মুসা মারাসহ বিভিন্ন দেশের কূটনীতিক, নীতিনির্ধারক, গবেষক ও বিশেষজ্ঞগণ অংশ নেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, উন্নয়নের জন্য শক্তিশালী রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান অপরিহার্য। আমরা প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতাকে সুদৃঢ় করছি। মানবাধিকার, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা অবশ্যই সুরক্ষিত রাখতে হবে। আইনের শাসন প্রতিটি নাগরিকের জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য হতে হবে। আমরা এমন একটি প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতি গড়ে তুলবো, যেখানে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো সত্যিকার অর্থেই বাংলাদেশের জনগণের সেবায় নিয়োজিত থাকবে।

তিনি বলেন, বাংলাদেশ একটি বড় বৈশ্বিক দায়িত্ব পালন করে চলেছে। সেটি হচ্ছে, আমরা এখনো প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়ে যাচ্ছি। আমাদের প্রধান লক্ষ্য হলো মিয়ানমারে তাদের দ্রুত, স্বেচ্ছায়, নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করা। এর জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের অব্যাহত রাজনৈতিক সমর্থন এবং আন্তর্জাতিক অর্থায়ন প্রয়োজন। পাশাপাশি এই সংকটের মূল কারণগুলোর সমাধান করাও জরুরি; যে সংকটের উৎপত্তি মিয়ানমারে, তার সমাপ্তিও হতে হবে মিয়ানমারেই।

সরকারের কর্ম পরিকল্পনা তুলে ধরে সরকারপ্রধান বলেন, আমাদের অগ্রাধিকারগুলো হলো জাতীয় স্বার্থ সুরক্ষা, নীতিমালার ধারাবাহিকতা বজায় রাখা, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার। আমরা এখন প্রতিশ্রুতি থেকে সরাসরি বাস্তবায়নের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি। আমরা বাংলাদেশকে বিনিয়োগের জন্য একটি আকর্ষণীয় গন্তব্যে পরিণত করছি। একইসঙ্গে দেশকে একটি শক্তিশালী উৎপাদন ও বিনিয়োগের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলছি। উৎপাদন, সেবা, রপ্তানিসহ সকল খাতে আমরা ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে চাই। বিনিয়োগকারীদের জন্য নীতিগত নিশ্চয়তা অপরিহার্য, আর আমাদের দীর্ঘমেয়াদি নীতিমালার ধারাবাহিকতাই সেই নিশ্চয়তা প্রদান করবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ সংলাপ, অংশীদারিত্ব এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধে বিশ্বাসী। আমরা আমাদের জাতীয় স্বার্থ ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা করবো। একইসঙ্গে আমরা আমাদের সকল আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক অংশীদারদের সঙ্গে ইতিবাচকভাবে কাজ করে যাবো। কারণ শান্তি ও সম্প্রীতিই হলো যৌথ সমৃদ্ধি ও উন্নয়নের মূল ভিত্তি।
তিনি বলেন, বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলটি এমন একটি এলাকায় পরিণত হোক, যেখানে প্রতিটি রাষ্ট্র একসঙ্গে বিকশিত হবে, পারস্পরিক সমান সুবিধা গ্রহণ করবে এবং নাগরিকরা অর্থবহ সহযোগিতার হাতকে প্রসারিত করবে। বাংলাদেশ এক্ষেত্রে তার যথাযথ ভূমিকা পালনে সম্পূর্ণ প্রস্তুত।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, বঙ্গোপসাগর প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে আমাদের ভাগ্য নির্ধারণ করে চলেছে। বাংলাদেশের ভৌগোলিক ও কৌশলগত অবস্থানের কারণে আমাদের সমুদ্রবন্দর, নৌপথ ও উপকূলীয় অর্থনীতি পুরো বিশ্বের সঙ্গে যুক্ত হতে পারে। জাহাজ চলাচল, মৎস্যসম্পদ, পর্যটন, জ্বালানি এবং আঞ্চলিক সরবরাহ চেইনে অপার সম্ভাবনা রয়েছে। আঞ্চলিকভাবে আমাদের এই অভিন্ন ভৌগোলিক অবস্থানকে অভিন্ন সমৃদ্ধিতে রূপান্তর করতে হবে। আর সেজন্য প্রয়োজন আরও গভীর দ্বিপক্ষীয় ও বহুপাক্ষিক সম্পৃক্ততা।
তিনি আরও বলেন, আমরা বাণিজ্য, জ্বালানি, শিক্ষা, প্রযুক্তি, জলবায়ু ও সমুদ্র খাতে পারস্পরিক সহযোগিতা আরও সম্প্রসারিত করতে পারি। আমরা নতুন বাজার উন্মুক্ত করতে পারি এবং আমাদের তরুণদের জন্য আরও সুযোগ সৃষ্টি করতে পারি। সমতা, ন্যায্যতা ও ন্যায়বিচারের ভিত্তিতে আমরা আরও শক্তিশালী সহযোগিতার সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারি। ভৌগোলিক অবস্থান আমাদের একত্রিত করেছে। আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, জনগণের সঙ্গে জনগণের নিবিড় সম্পর্ক আমাদের আরও বহুদূর এগিয়ে নিয়ে যাবে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিগুলো এমনভাবে সাজানো হয়েছে, যাতে সবচেয়ে সুবিধাবঞ্চিত মানুষরা অগ্রাধিকার পান। ‘ফ্যামিলি কার্ড’-এর মাধ্যমে প্রতিটি পরিবারের মায়ের হাতে আর্থিক সহায়তা পৌঁছে দেয়া হবে, যা সবচেয়ে দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠী থেকে শুরু হবে। ‘কৃষক কার্ড’ কৃষকদের সরকারি প্রণোদনা, কৃষি সেবা ও বাজার ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করবে। ‘হেলথ কার্ড’ নিশ্চিত করবে সবার জন্য চিকিৎসাসেবা। চূড়ান্তভাবে, ‘ইউনিভার্সেল কার্ড’-এর মাধ্যমে নাগরিকরা এক ছাতার নিচে সমন্বিত সরকারি সেবাসমূহ গ্রহণ করতে পারবেন। স্বাস্থ্যসেবা প্রতিটি ঘরে ঘরে পৌঁছে দিতে হবে। আমরা ১ লাখ স্বাস্থ্যসেবাকর্মী নিয়োগে কাজ করছি, যার মধ্যে প্রায় ৮০ শতাংশই হবেন নারী। তারা তৃণমূল পর্যায়ে প্রাথমিক চিকিৎসাসেবা, স্বাস্থ্যবিষয়ক পরামর্শ এবং প্রয়োজনীয় রেফারেল সেবা প্রদান করবেন। পাশাপাশি আমরা মা ও শিশুর স্বাস্থ্য সুরক্ষায় বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছি।
সরকারপ্রধান বলেন, আমি বিশ্বাস করি, শিক্ষাব্যবস্থা শিক্ষার্থীদের শুধু সনদের জন্য নয়, বরং বাস্তব জীবনের জন্য তৈরি করবে। আমরা আনন্দময় শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করতে কাজ করছি। আমাদের সন্তানদের চরিত্র গঠনে পাঠ্যক্রমে সংস্কৃতি, খেলাধুলা, মূল্যবোধ ও নৈতিকতার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকবে। তাদের জন্য একটি তৃতীয় ভাষা শেখার সুযোগও থাকবে। সাধারণ শিক্ষার পাশাপাশি কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার প্রসার ঘটানো হবে। আমাদের সরকার প্রথম শ্রেণি থেকেই বিনামূল্যে ইউনিফর্ম, স্কুলব্যাগ, মিড-ডে মিল ও বৃত্তি প্রদান করবে। এ ছাড়া স্নাতক পর্যায় পর্যন্ত মেয়েদের জন্য বিনামূল্যে শিক্ষার পরিধি আমরা সম্প্রসারিত করছি।

তরুণ জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থান জন্য সরকারের নেয়া পরিকল্পনা তুলে ধরে তিনি বলেন, আমাদের বিশাল তরুণ জনগোষ্ঠী জাতীয় অগ্রগতির এক অনন্য চালিকাশক্তি। তবে এই জনমিতিক সুবিধা কাজে লাগাতে প্রয়োজন দক্ষতা ও উপযুক্ত কর্মসংস্থান। আমরা ভাষাগত দক্ষতা বৃদ্ধি ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির পাশাপাশি প্রযুক্তিগত রূপান্তর ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে গ্রহণ করছি। আমরা উদ্ভাবন, উদ্যোক্তা উন্নয়ন এবং স্টার্ট-আপগুলোকে সহায়তা দিচ্ছি। আমরা চাই আমাদের তরুণরা বিশ্বমঞ্চে প্রতিযোগিতা করুক এবং ব্রেইন ড্রেনকে ব্রেইন সার্কুলেশনে রূপান্তর করুক।

কৃষি খাতের উন্নয়ন প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা প্রযুক্তি, সেচ, কৃষি অর্থায়ন ও কৃষিপণ্যের বাজার সংযোগ আরও সহজলভ্য করছি। আমরা মৎস্য, প্রাণিসম্পদ ও গ্রামীণ উদ্যোক্তাদের সহায়তা প্রদান করছি। খাদ্য নিরাপত্তার পরিপূরক হিসেবে কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ ও কৃষি রপ্তানি শিল্পকে এগিয়ে নিতে হবে। কারণ আমি বিশ্বাস করি, একটি শক্তিশালী গ্রামীণ অর্থনীতিই গড়ে তুলতে পারে একটি শক্তিশালী বাংলাদেশ।
তিনি আরও বলেন, পানি নিরাপত্তাও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। আগামী ৫ বছরে আমরা ২০ হাজার কিলোমিটার খাল ও জলপথ খননের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছি। পানি সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার লক্ষ্যে আমরা পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প এগিয়ে নিচ্ছি। এ ছাড়া আমরা তিস্তা মহাপরিকল্পনা প্রণয়ন করছি। এসব পদক্ষেপ কৃষি খাতকে সহায়তা করবে এবং জলবায়ু সহনশীলতা বৃদ্ধি করবে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, পরিবেশ রক্ষায় আমাদের সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। আগামী ৫ বছরে আমরা ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ করবো। আমরা সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার সম্প্রসারিত করছি। বাংলাদেশ বর্জ্য পুনর্ব্যবহার এবং পরিবেশবান্ধব গ্রিন ফ্যাক্টরি স্থাপনে অগ্রণী ভূমিকা রাখছে, বিশ্বের শীর্ষ ১০০টি লিড সার্টিফাইড ফ্যাক্টরির মধ্যে ৫৩টিই এখন বাংলাদেশে। পরিচ্ছন্ন ও পরিবেশবান্ধব শহর গড়ে তোলার মাধ্যমে আমরা বর্জ্য হ্রাস, জলবায়ু সহনশীলতা অর্জন এবং দেশের অর্থনীতিকে আরও গতিশীল করতে পারি।

সিজিএসের প্রেসিডেন্ট জিল্লুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য রাখেন এক্সিকিউটিভ ডাইরেক্টর পারভেজ করিম আব্বাসী। এ ছাড়া অনুষ্ঠানে বিএনপি’র স্থায়ী কমিটির সদস্য বেগম সেলিমা রহমান, বিমানমন্ত্রী রশিদুজ্জামান মিল্লাত, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ, জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম, প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা জহির উদ্দিন স্বপন, স্বাস্থ্যবিষয়ক প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী এসএম জিয়াউদ্দিন হায়দার প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।