রাজধানীর মিরপুর-১০ নম্বর এলাকায় ফুটপাথের হকারদের উচ্ছেদ করা হয়েছে। তুলে দেয়া হয়েছে অবৈধ দোকান। ভেঙে দেয়া হয়েছে অবৈধ স্থাপনাও। ফলে পুরো এলাকায় ফিরেছে শৃঙ্খলা। মিরপুর-১০ নম্বর গোলচত্বর এলাকায় মানুষ আর যানবাহনের জটলা লেগে থাকতো দিনভর। যান চলাচলে ছিল অচলাবস্থা ও বিশৃঙ্খলা। জনগণের ভোগান্তি নিত্যদিনের। রাজধানীর সবচেয়ে ধীরগতির সিগনালের মধ্যে এটি একটি। কিন্তু হকারদের উচ্ছেদের একদিনের মাথায় বদলে গেছে পুরো এলাকার চিত্র। নেই মানুষ কিংবা যানবাহনের জটলা। নেই কোনো জ্যাম। মানুষ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলছেন। কিন্তু এই স্বস্তি কতোদিন থাকবে? এই প্রশ্ন এলাকার বাসিন্দাদের।
এর আগেও উচ্ছেদ করা হয়েছিল হকারদের। কিন্তু কয়েক দিনের মাথায় একই অবস্থায় ফিরে আসে। দু’-একদিনের মধ্যে ফুটপাথ দখলে নেন হকাররা। বুধবার উচ্ছেদ অভিযানে গিয়ে ফুটপাথের হকারদের অতর্কিত হামলার শিকার হন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) ভ্রাম্যমাণ আদালতের ম্যাজিস্ট্রেট ও পুলিশ সদস্যরা। এরপর আরও জোরালো হয় উচ্ছেদ অভিযান। এ ঘটনায় চারটি মামলায় অজ্ঞাত ২ হাজার জনকে আসামি করা হয়েছে। গ্রেপ্তার করা হয়েছে ২৫ জনকে।
বৃহস্পতিবার সরজমিন দেখা যায়, অরিজিনাল-১০ নম্বর মোড় থেকে ডান পাশে ফায়ার সার্ভিসের গেট এবং বাম পাশে আলোক হাসপাতাল থেকে এফএস স্কয়ার মার্কেট পর্যন্ত ফুটপাথ, কাজীপাড়া থেকে মিরপুর-১০ নম্বর গোলচত্বর, সেখান থেকে মিরপুর-১৩ নম্বর পর্যন্ত পুরো এলাকা হকারমুক্ত করা হয়েছে। ফলে পুরো এলাকা হয়েছে যানজটমুক্ত। গতকাল পুরো এলাকা ছিল শান্ত। খুব একটা কোলাহলও ছিল না। মানুষ সহজেই যাতায়াত করছেন। রাস্তার মধ্যেও খুব একটা চাপ নেই। কয়েক মিনিট পর পর সিগন্যাল বদল হচ্ছে। যানবাহনগুলো খুব সহজেই পার হচ্ছে। হকারমুক্ত হওয়ায় স্বস্তি প্রকাশ করেন নিয়মিত যাত্রীরা। কিন্তু তাদের মাঝে শঙ্কা রয়েই গেছে। এর আগেও অনেকবার অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। হকারদের উচ্ছেদ করা হয়েছে। কিন্তু ফের হকাররা ফিরে আসেন। এর পেছনে রয়েছে রাজনীতিবিদ, স্থানীয় সন্ত্রাসী ও প্রশাসনের আর্থিক সুবিধা। ফলে প্রশ্ন উঠেছে, এবার এই উচ্ছেদের ফল কতোদিন পাবে মানুষ?
সাইফুল ইসলাম নামে এক অফিসগামী যাত্রী বলেন, আমার অফিস ১০ নম্বরে। প্রতিদিন মেট্রোতে যাতায়াত করি। আগে হকার ও ক্রেতার ভিড়ে হাঁটাচলা খুবই কষ্টকর ছিল। এখন হকাররা না থাকায় খুব সহজেই চলাচল করা যাচ্ছে। এর আগেও বেশ কয়েকবার হকারদের উচ্ছেদ করা হয়েছিল। কিন্তু কিছুদিন পর আবারো তারা ফুটপাথগুলো দখল করে নেয়। এবারো যদি এমনই হয় তাহলে কোনো লাভ নেই। পথচারী বুলবুল আহমেদ বলেন, আগে দোকান আর ক্রেতার ভিড়ে ফুটপাথ দিয়ে হাঁটা যেতো না। ভিড়ের সুযোগে মোবাইল চুরির ঘটনাও ঘটতো। এখন স্বস্তিতে চলাচল করা যাচ্ছে। খাইরুল ইসলাম নামে এক মোটরসাইকেলচালক বলেন, মিরপুরের দুঃখ হকার ও অটোরিকশা। হকারদের উচ্ছেদের একদিনেই অর্ধেক শৃঙ্খলা ফিরে এসেছে। এখন বাকি রিকশা। রিকশাগুলো প্রধান সড়ক থেকে সরাতে পারলেই পুরোপুরি শৃঙ্খলা ফিরে আসবে।
৫ বছরে যত অভিযান: এদিকে, চলতি বছরের এপ্রিলের শুরুতে ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় সমন্বিত অভিযান চালায় ঢাকা মহানগর পুলিশ ও সিটি করপোরেশন। ১ থেকে ৫ই এপ্রিলের অভিযানে আটটি ট্রাফিক বিভাগে অভিযান চালিয়ে জরিমানা, মামলা ও গ্রেপ্তার করা হয়। কিন্তু মাত্র কয়েকদিন পরই বিভিন্ন এলাকায় আবার ফুটপাথ দখল হয়ে যাওয়ার চিত্র উঠে আসে। একই পরিস্থিতি ছিল মিরপুর-১০ নম্বর এলাকা। এমনকি গত এক সপ্তাহেই ডিএনসিসি মিরপুর-১০ ও এর আশপাশের এলাকায় টানা তিনবার অভিযান পরিচালনা করে। তবুও পুরোপুরি উচ্ছেদ করতে পারেনি। কিন্তু বুধবার হকারদের হামলার পর পাল্টে যায় অভিযানের চিত্র। দখলমুক্ত করা হয় পুরো এলাকা। গত কয়েক বছর ধরে অভিযান চালানো হচ্ছে।
২০২২ সালে মেট্রোরেল প্রকল্পের কাজ শেষ পর্যায়ে থাকায় সড়ক সংস্কারের জন্য মিরপুর-১০ নম্বর গোলচত্বরের আশপাশ থেকে বেশ কয়েকবার হকারদের জোরপূর্বক সরিয়ে দেয়া হয়। সে সময় হকাররা মিরপুর-১১ ও ১৩ নম্বরের ভেতরের শাখা সড়কগুলোতে সাময়িকভাবে সরে যান। কিন্তু মূল সড়ক সংস্কারের পরপরই আবার ফিরে আসে।
২০২২ সালের ডিসেম্বরে মেট্রোরেল চালুর পর ২০২৩ সাল জুড়ে মিরপুর-১০ স্টেশনের নিচে ও সিঁড়ির প্রবেশমুখে হকার উচ্ছেদে দফায় দফায় বিশেষ অভিযান চালানো হয়। যাত্রীদের নির্বিঘ্নে চলাচলের স্বার্থে প্রশাসন কঠোর অবস্থানে যায় এবং প্রতিনিয়ত ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। অনেক হকার দিনের পরিবর্তে রাতে বসা শুরু করে। এরপর ধীরে ধীরে সবকিছু হকারদের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়।
সার্বিক বিষয়ে ডিএনসিসি’র প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খান (মিল্টন) মানবজমিনকে বলেন, এর আগেও কয়েকবার অভিযান পরিচালনা করেছি। তখন তারা সময় চেয়েছিল। তাদেরকে অন্য জায়গায় পুনর্বাসনের কথা বলেছিলাম। তাদের কথা অনুযায়ী, ডিএনসিসি’র পক্ষ থেকে ২০৪টি রেজিস্ট্রেশন কার্ড দিয়েছি। তাদেরকে জায়গা নির্ধারণ করে দেয়া হয়েছে। কিন্তু তারা কথা রাখেনি। তাই এবার আমরা কঠোর হতে বাধ্য হয়েছি। তিনি বলেন, ফুটপাথ দখল জাতীয় ইস্যু হয়ে দাঁড়িয়েছে। ঢাকাবাসী সবাই চায়, ফুটপাথ দখলমুক্ত হোক। সেই কারণেই এই প্রচেষ্টা। এই চেষ্টা অব্যাহত থাকবে। এবার আমি ঘোষণা দিয়েছি, যতবার এরকম হবে ততবার অভিযান পরিচালনা করা হবে। ডিএনসিসি’র প্রশাসক বলেন, আমার বিশ্বাস, একপর্যায়ে এই অভিযান সফল হবে। ফুটপাথ দখল করে যারা অবৈধভাবে ব্যবসা করছেন তাদের উৎখাত করা হবে। ফুটপাথ জনগণকে ফিরিয়ে দেবো। এটা আমার অঙ্গীকার।
