জালিয়াতি করে পদোন্নতি, বিমানবন্দরের উন্নয়ন প্রকল্পের নামে শত শত কোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের দুই প্রকৌশলীকে ভর্ৎসনা করা হয়েছে খোদ জাতীয় অর্থনৈতিক কমিটি (একনেকের) সভায়। পরে তিন বিমানবন্দরে উন্নয়ন প্রকল্পে দুর্নীতির বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে গঠন করা হয়েছে এক যুগ্ম সচিবের নেতৃত্বে তিন সদস্যবিশিষ্ট তদন্ত কমিটি। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের এই তদন্ত কমিটি তাদের দুর্নীতি ও কেন তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হয়নি- তা তদন্ত করবেন। ২৯শে সেপ্টেম্বর গঠিত তদন্ত কমিটিকে আগামী ৪ কার্যদিবসের মধ্যেই এই রিপোর্ট জমা দেয়ার জন্য বলা হয়েছে। আলোচিত এই দুই প্রকৌশলী হলেন- আমিনুল হাসিব ও মইদুর রহমান মো. মওদুদ।
সূত্র জানায়, থার্ড টার্মিনালের ব্যয় বাড়ানোর বিষয়টি একনেকে উঠলে সেটি অনুমোদন হয়। একইসঙ্গে তিন বিমানবন্দরের উন্নয়ন প্রকল্পের ব্যয় বাড়ানো ও বাস্তবায়নে ধীরগতির বিষয়টি আলোচনায় আসে। একই আলোচনায় আসে প্রকৌশলী আমিনুল হাসিব ও মওদুদের বিষয়টিও। এ সময় তাদের বিরুদ্ধে গৃহীত ব্যবস্থা সম্পর্কে জানতে চাইলে তার কোনো উত্তর না আসায় এক ধরনের ক্ষোভ প্রকাশ হয়। পরবর্তীতে তিনটি বিমানবন্দর যথাক্রমে যশোর, রাজশাহী ও সৈয়দপুর উন্নয়ন প্রকল্পে প্রক্রিয়াগত অনিয়মের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী আনুষ্ঠানিক তদন্তের নির্দেশ দেন। এই তিন বিমানবন্দরেরই প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক আমিনুল হাসিব।
বিমান ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের জানতে চাওয়ার প্রেক্ষিতে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) চলতি বছর ১১ই মার্চ মামলা বিচারাধীন থাকার পরও সিএএবি, সিভিল সার্কেল প্রকল্প নির্বাহী প্রকৌশলী (সিভিল) মোহাম্মদ আমিনুল হাসিবকে দায়মুক্তি দেয়া হয়। অভিন্ন চিঠিতে দায়মুক্তি দেয়া হয় ওসমানি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নির্বাহী প্রকৌশলী (সিভিল) মইদুর রহমান মো. মওদুদকেও। বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় বরাবর লেখা দুদক পরিচালক মোহাম্মদ নাজমুল হাসান স্বাক্ষরিত চিঠিতে বলা হয়, এ কার্যালয়ে (দুদক) প্রাপ্ত তথ্যমতে, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের নিম্নবর্ণিত মোট দু’জন কর্মচারীর বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনে কোনো মামলা তদন্তাধীন বা বিচারাধীন নেই। কর্মকর্তারা হলেন- ১. মোহাম্মদ আমিনুল হাসিব, নির্বাহী প্রকৌশলী (সিভিল), সিভিল সার্কেল প্রকল্প, সিএএবি। ২. মইদুর রহমান মো. মওদুদ, নির্বাহী প্রকৌশলী (সিভিল), ওসমানি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, সিএএবি। এর পরপরই আমিনুল হাসিব নির্বাহী প্রকৌশলী থেকে তত্ত্বাবাধায়ক প্রকৌশলী পদে পদোন্নতি পান। বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পর বিভিন্ন মাধ্যমে সমালোচনা শুরু হয়।
প্রতিস্থাপন চিঠিতে বলা হয়েছে, আমিনুল হাসিব দুদকের সমন্বিত জেলা কার্যালয়, ঢাকা-১-এর ৮৫ নম্বর মামলার এজাহারভুক্ত ৯ নম্বর আসামি। ২০২৫ সালের ২৭শে জানুয়ারি করা মামলাটি তদন্তাধীন। মওদুদ একই কার্যালয়ের ৮৪ নম্বর মামলার এজাহারভুক্ত ৯ নম্বর আসামি। ওই মামলাও ২০২৫ সালের ২৭শে জানুয়ারি করা হয়। সেটির তদন্তও চলছে। প্রথম চিঠিতে সই করা পরিচালক মোহাম্মাদ নাজমুল হাসানই প্রতিস্থাপন চিঠিতে সই করেছেন। জানা যায়, ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে একাধিক বিমানবন্দর প্রকল্পে ৮১২ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে তারিক আহমেদ সিদ্দিকসহ ১৯ জনের বিরুদ্ধে দুদক ৪টি মামলা করে। দুদকের মামলার নথি অনুযায়ী, কক্সবাজার বিমানবন্দরের প্রকল্পে ১৫০ কোটি টাকা আত্মসাতের মামলায় আমিনুল ৯ নম্বর আসামি। ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর সমপ্রসারণ প্রকল্পে ২১২ কোটি টাকা আত্মসাতের মামলায় মওদুদ ৯ নম্বর আসামি। দু’টি মামলার তদন্তই দুদকের মানি লন্ডারিং শাখায় চলছে।
দুদক থেকে মামলা থাকার চিঠি পাওয়ার পর মন্ত্রণালয় থেকে বেবিচককে ব্যবস্থা নিতে একাধিকবার চিঠি দেয়া হলেও কোনো ব্যবস্থা নেয়নি বেবিচক। সর্বশেষ গত ১০ই সেপ্টেম্বরও মন্ত্রণালয় থেকে গৃহীত ব্যবস্থা দ্রুত অবগত করার জন্য নির্দেশ দেয়া হয়। কিন্তু সেই চিঠিরও কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। বেবিচকের একাধিক কর্মকর্তা নিশ্চিত করেন, মন্ত্রণালয়ের চিঠি পাওয়ার পরও অজ্ঞাতকারণে কোনো পদক্ষেপ নেয়া হয়নি।
একনেকের সভা শেষ হওয়ার পরপরই তিন সদস্যবিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির প্রধান হলেন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন সেক্টর ৭-এর মহাপরিচালক (যুগ্ম সচিব) মনজুরুল ইসলাম। বাংলাদেশ পাবলিক প্রকিউরমেন্টের পরিচালক (উপ-সচিব) মোহাম্মদ সালাহ্ উদ্দীন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন সেক্টরের ৬-এর পরিচালক (উপ-সচিব) নিশাত জাহান। এই তদন্ত কমিটি তিন বিমানবন্দরের উন্নয়ন প্রকল্পের ব্যয় সংশোধনের কারণ ও বৃদ্ধি তদন্ত করবেন এবং প্রকল্পের সিসিজিপি’র ক্রয় প্রক্রিয়ার বিষয়টি ডিপিপি সংশোধন পালনের শর্ত পালন সাপেক্ষ অনুমোদিত হলেও কেন তা দেরি হলো অনুসন্ধান করে তাদের মতামত প্রদান করবেন। এ ছাড়াও প্রকৌশলী হাসিব ও মওদুদ কীভাবে পদোন্নতি পেলেন সেটিও আসবে তদন্তের আওতায়।
২০১৯ সালের নভেম্বরে কক্সবাজার প্রজেক্টে দুর্নীতির অভিযোগে হাসিবকে বরখাস্ত করে বেবিচক। পরে আওয়ামী লীগের সাবেক মন্ত্রী কর্নেল (অব.) ফারুক খানের সুপারিশে ২০২১ সালে আবার তিনি চাকরিতে নিয়মিত হন।
