২০১৩ সালে রাজধানীর মতিঝিলের শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশ ঘিরে হত্যার ঘটনায় করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় গ্রেপ্তার সাংবাদিক মোজাম্মেল হক বাবুর স্বাস্থ্য পরীক্ষার প্রতিবেদন আদালতে দাখিলের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। বৃহস্পতিবার বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন দুই সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২। মোজাম্মেল বাবু একাত্তর টেলিভিশনের সাবেক প্রধান সম্পাদক।
শুনানি শেষে তার আইনজীবী এ বি এম হামিদুল মিসবাহ মানবজমিনকে বলেন, মোজাম্মেল বাবু ২০২৩ সাল থেকে স্টেজ-৩ প্রোস্টেট ক্যান্সারে আক্রান্ত এবং ওই বছরই তার অস্ত্রোপচার হয়েছিল। ক্যান্সারের বর্তমান অবস্থা জানতে তার নিয়মিত রক্ত (পিএসএ) পরীক্ষা প্রয়োজন। তিনি আরও বলেন, কারাগারে যাওয়ার পর তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হয়। কারা কর্তৃপক্ষের উদ্যোগে ২০২৫ সালের ২৬শে জুলাই তার পিএসএ পরীক্ষা করা হলেও ওই প্রতিবেদন পরিবার বা আইনজীবীদের দেয়া হয়নি। সে সময় ৭ দিনের মধ্যে কারা কর্তৃপক্ষকে ওই প্রতিবেদন আদালতে দাখিল করার নির্দেশ দিয়েছিলেন ট্রাইব্যুনাল। শুনানি শেষে আদালত আগের প্রতিবেদনটি দাখিলের নির্দেশ ও নতুন করে স্বাস্থ্য পরীক্ষার বিষয়ে ট্রাইব্যুনাল কোনো আদেশ দেয়নি বলে মন্তব্য করেছেন আইনজীবী মিসবাহ।
এদিন মোজাম্মেল বাবুর জামিনের আবেদন করা হয়নি বলে জানিয়েছেন তার আইনজীবী।
আবেদনে উল্লেখ করা হয়, আসামি মোজাম্মেল বাবুর তৃতীয় পর্যায়ের প্রোস্টেট ক্যান্সারে আক্রান্ত। বায়োপসি ও বিভিন্ন ধরনের পরীক্ষার মাধ্যমে তার প্রোস্টেট গ্রন্থিতে ৩+৪ গ্রেডের অ্যাডেনোকার্সিনোমা ক্যান্সার শনাক্ত হওয়ার পর ২০২৩ সালে তার সম্পূর্ণ প্রোস্টেট গ্রন্থি অপসারণের অস্ত্রোপচার করা হয়। পরীক্ষায় স্নায়ুপথের আশপাশে ক্যান্সার কোষের বিস্তারও পাওয়া যায়। বিভিন্ন পরীক্ষায় আরও দেখা যায়, ক্যান্সার কোষগুলো স্নায়ুপথের কাছাকাছি বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং অঙ্গটির বাইরের আবরণ অতিক্রম করে অথবা লসিকা গ্রন্থির দিকে ছড়িয়ে পড়ার লক্ষণ রয়েছে। এতে আরও উল্লেখ করা হয়, কারাগারে থাকা অবস্থায় আসামি-আবেদনকারীর শারীরিক অবস্থার অবনতি হওয়ায় কারা কর্তৃপক্ষের উদ্যোগে ২০২৫ সালের ২৬শে জুলাই তার রক্তে প্রোস্টেট-নির্দিষ্ট অ্যান্টিজেনের মাত্রা পরীক্ষা করা হয়। তবে ওই পরীক্ষার ফলাফল বা প্রতিবেদন আসামি-আবেদনকারীর পরিবারের সদস্য কিংবা আইনজীবীদের দেয়া হয়নি। ফলে আসামি-আবেদনকারীর বর্তমান রোগের অবস্থা বা শারীরিক পরিস্থিতি সম্পর্কে তার পরিবারের সদস্য ও আইনজীবীরা অবগত নন এবং এ বিষয়ে তাদের কাছে কোনো তথ্যও নেই। উল্লেখ্য, রক্তে প্রোস্টেট-নির্দিষ্ট অ্যান্টিজেনের মাত্রা বেশি পাওয়া গেলে এর কারণ নির্ণয়ের জন্য পুনরায় পরীক্ষা, শারীরিক পরীক্ষা, চৌম্বকীয় অনুরণন চিত্র বা এমআরআই এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা প্রয়োজন হতে পারে। এ ছাড়া আসামি যে প্রোস্টেট ক্যান্সারে আক্রান্ত, তার আক্রমণাত্মক বৈশিষ্ট্যের কারণে রোগটি পুনরায় দেখা দিয়েছে বা ফিরে এসেছে কি না, তা পর্যবেক্ষণের জন্য নিয়মিত রক্ত পরীক্ষা করা অত্যন্ত জরুরি।
বিশেষ করে, নিয়মিত রক্তে প্রোস্টেট-নির্দিষ্ট অ্যান্টিজেনের মাত্রা পরীক্ষা করা চিকিৎসাবিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে প্রয়োজনীয়। সম্পূর্ণ প্রোস্টেট গ্রন্থি অপসারণের অস্ত্রোপচারের পর—যার মাধ্যমে প্রোস্টেট গ্রন্থি ও এর আশপাশের প্রয়োজনীয় টিস্যু অপসারণ করে প্রোস্টেট ক্যান্সারের চিকিৎসা করা হয়—রোগটি পুনরায় দেখা দিয়েছে কিনা, তা নির্ণয়ের জন্য নিয়মিত রক্তে প্রোস্টেট-নির্দিষ্ট অ্যান্টিজেনের মাত্রা পর্যবেক্ষণ করা গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে, রোগটির পূর্ববর্তী পরীক্ষায় প্রতিকূল বৈশিষ্ট্য পাওয়া যাওয়ায় এ ধরনের নিয়মিত চিকিৎসা-পর্যবেক্ষণ আরও জরুরি বলে আবেদনে উল্লেখ করা হয়।
এসব বিবেচনায় নিয়ে কারা কর্তৃপক্ষকে আসামির বর্তমান শারীরিক ও চিকিৎসাগত অবস্থা নির্ণয়ের জন্য উপযুক্ত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক বা চিকিৎসা বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে রক্তে প্রোস্টেট-নির্দিষ্ট অ্যান্টিজেনের মাত্রা পরীক্ষা এবং প্রয়োজনীয় অন্যান্য রোগ নির্ণয়কারী পরীক্ষা-নিরীক্ষাসহ যথাযথ চিকিৎসা পরীক্ষা অবিলম্বে এবং সর্বোচ্চ সাত দিনের মধ্যে সম্পন্ন করার নির্দেশ প্রদান করার আবেদন করা হয়। কারা কর্তৃপক্ষকে আসামির বর্তমান শারীরিক অবস্থা, তার প্রয়োজনীয় চিকিৎসা, চিকিৎসাসেবা এবং বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শের প্রয়োজনীয়তা উল্লেখ করে একটি পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসা ও স্বাস্থ্য প্রতিবেদন প্রস্তুত করে মাননীয় ট্রাইব্যুনালের সামনে দাখিল করার নির্দেশ প্রদান করা হয়। কারা কর্তৃপক্ষের উদ্যোগে ২৬শে জুলাই সম্পন্ন করা চিকিৎসা পরীক্ষার ফলাফল বা প্রতিবেদনের একটি অনুলিপি মাননীয় ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে আসামি-আবেদনকারীর পরিবারের সদস্য অথবা আইনজীবীদের সরবরাহ করার নির্দেশ প্রদান করার আবেদন করা হয়।
