২০২৪ সালে বাংলাদেশে ছাত্র-নেতৃত্বাধীন আন্দোলনের অন্যতম প্রধান দাবি ছিল মেধার ভিত্তিতে সরকারি চাকরিতে নিয়োগ। কাঙ্ক্ষিত সরকারি চাকরিতে কোটা নয়, মেধাকে প্রাধান্য দেয়ার দাবিতে গড়ে ওঠা সেই আন্দোলনে শেষ পর্যন্ত সরকার পতন হয় এবং সরকারি চাকরির কোটা ব্যবস্থা ব্যাপকভাবে সংস্কার করা হয়। তবে এই সংস্কারের অনিচ্ছাকৃত প্রভাবও দেখা যাচ্ছে।
১৭ কোটি মানুষের বাংলাদেশে সরকারি চাকরিতে নারীদের অংশ ক্রমেই কমছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ২৫ বছর বয়সী স্নাতক তথাপি আজাদও কোটা বাতিলের দাবিকে সমর্থন করেছিলেন। তবে এখন তার মনে হচ্ছে, নারীদের জন্য কোটা বহাল রাখার পক্ষে তার অবস্থান নেয়া উচিত ছিল।
তিনি এএফপিকে বলেন, পরিবারের সমর্থন থাকায় আমার জন্য কোটা হয়তো অপরিহার্য ছিল না কিন্তু একজন সাধারণ নারীর জন্য তা অপরিহার্য।
তার ভাষায়, একটি চাকরি নারীর ক্ষমতায়নের হাতিয়ার। গ্রামীণ নারীদের জন্য এটি শুধু তা-ই নয় বরং টিকে থাকার কৌশল এবং পারিবারিক সহিংসতার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ার একটি ঢাল।
তথ্য-উপাত্ত বলছে, কোটা কমানোর পর সরকারি চাকরিতে নিয়োগ পাওয়া নারীদের হারও কমেছে। এর ফলে সরকারি প্রশাসনের এমনিতেই সীমিতসংখ্যক নারী কর্মকর্তার সংখ্যা আরও সংকুচিত হচ্ছে।
‘অস্বস্তিকর’ পরিস্থিতি
২০১৮ সাল পর্যন্ত প্রথম শ্রেণির সরকারি চাকরির ৫৬ শতাংশ কোটা ব্যবস্থার আওতায় ছিল। প্রথম শ্রেণির এসব পদই ছিল দেশের প্রশাসন ও সরকারি খাতের শীর্ষস্থানীয় চাকরি।
এর মধ্যে নারীদের জন্য ১০ শতাংশ এবং ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে অংশ নেয়া মুক্তিযোদ্ধাদের সন্তান ও বংশধরদের জন্য ৩০ শতাংশ কোটা ছিল। এ ছাড়া অনগ্রসর অঞ্চল ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য আরও ১৬ শতাংশ পদ সংরক্ষিত ছিল। ২০১৮ সালে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের পর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কোটা ব্যবস্থা বাতিল করেন।
এরপর ২০২৪ সালে কোটা পুনর্বহালের প্রস্তাব দেয়া হলে শিক্ষার্থীরা আবারও আন্দোলনে নামে। একপর্যায়ে সেই আন্দোলন গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয় এবং শেখ হাসিনা সরকারের পতন ঘটে।
বর্তমানে ৯৩ শতাংশ পদ মেধার ভিত্তিতে পূরণ করা হয়। মুক্তিযোদ্ধাদের উত্তরাধিকারীসহ কয়েকটি ছোট গোষ্ঠীর জন্য ৭ শতাংশ কোটা রাখা হয়েছে। তবে নারীদের জন্য কোনো কোটা নেই।
সরকারি চাকরির নিয়োগ পরীক্ষা পরিচালনাকারী বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনে (বিপিএসসি) প্রতি বছর প্রায় ৩ লাখ আবেদন জমা পড়ে। এসব আবেদন আসে প্রথম শ্রেণির মাত্র ২ হাজার ৫০০ থেকে ৩ হাজার পদের বিপরীতে।
২০১৮ সালে কোটা বাতিলের আগে মেধা ও কোটা -দুই ধরনের নিয়োগ মিলিয়ে সরকারি চাকরিতে নিয়োগ পাওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে নারীদের অংশ ছিল সর্বোচ্চ ৩৫ শতাংশ। সর্বশেষ নিয়োগ পরীক্ষার হিসাবে সেই হার নেমে এসেছে ১৯ শতাংশে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিপিএসসির এক কর্মকর্তা বলেন, এই ফলাফল নিয়ে প্রতিষ্ঠানটি “অস্বস্তিতে” রয়েছে। তবে তার ভাষায়, বিপিএসসির দায়িত্ব “শুধু পরীক্ষা পরিচালনা করা”।
সাবেক এক আমলা একেএম আবদুল আওয়াল মজুমদার জানান তিনি মেধার ভিত্তিতে নিয়োগের পক্ষে। তবে তার মতে, নারীদের প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে সহায়তার জন্য কোচিংয়ের ব্যবস্থা করা যেতে পারে।
তিনি বলেন, আমার নারী সহকর্মীরা ছিলেন অসাধারণ। ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচিত সরকারও মেধার ভিত্তিতে নিয়োগের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে।
জনপ্রশাসন মন্ত্রী মো. আবদুল বারী সংসদে এটিকে “যৌক্তিক সংস্কার” হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তবে কিছু কর্মকর্তা আশঙ্কা করছেন, সরকারি চাকরিতে নারীদের সংখ্যা কমে যাওয়ার বিষয়টি ভবিষ্যতে আরও স্পষ্ট হয়ে উঠবে।
২০ বছরের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন এক নারী আমলা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, এই মুহূর্তে অন্তত ২১টি জেলার নেতৃত্বে ২১ জন নারী রয়েছেন। তিনি বলেন, ১০ বছর পর সরকারি চাকরিতে এত নারী আর থাকবে না।
‘তাদের ছাড়া চলবে না’
এর প্রভাব শুধু প্রশাসনেই সীমাবদ্ধ নয়। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর কনস্টেবল পদে যোগ্যতা অর্জন করা ২ হাজার ৬৫১ জন প্রার্থীর মধ্যে নারী মাত্র ২৬৭ জন।
পুলিশের উপপরিদর্শক পদে যোগ্যতা অর্জন করা ১৮৪ জনের মধ্যে নারী মাত্র ছয়জন। সার্জেন্ট পদে কোনো নারীই যোগ্যতা অর্জন করতে পারেননি। বিপরীতে যোগ্যতা অর্জন করেছেন ৯৬ জন পুরুষ।
এক পুলিশ কর্মকর্তা এএফপিকে বলেন, তাদের ছাড়া আমরা চলতে পারি না। তিনি জানান, প্রতিটি থানায় নারী ও শিশুদের জন্য আলাদা ডেস্ক রয়েছে।
বাংলাদেশে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগেও একসময় নারীদের জন্য ৬০ শতাংশ কোটা ছিল। সেই ব্যবস্থাও এখন আর নেই।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক আসিফ শাহীনের মতে, সরকারি চাকরিতে নারীর সংখ্যা কমে গেলে এর প্রভাব নীতিনির্ধারণেও পড়বে। তিনি এএফপিকে বলেন, তাদের বিষয়গুলো নীতিনির্ধারণে প্রতিফলিত হয়।
কোটা নিয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যেও বিভক্তি
কোটা নিয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যেও মতভেদ তৈরি হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদের ক্যারিয়ারবিষয়ক উপদেষ্টা এবং ইসলামপন্থী দল জামায়াতে ইসলামীর সমর্থক মো. মাজহারুল ইসলাম মেধাভিত্তিক নিয়োগ ব্যবস্থার পক্ষে।
তিনি বলেন, আগে সমাজ অনেক বেশি রক্ষণশীল ছিল। মেয়েদের উচ্চশিক্ষা গ্রহণের সুযোগ দেয়া হতো না। তার ভাষায়, সেই পরিস্থিতি এখন বদলে গেছে।
তবে দর্শনের শিক্ষার্থী আদিত্য ইসলাম নারীদের কোটা বাতিলের সিদ্ধান্তকে ভুল বলে মনে করেন। বামপন্থী রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত এই শিক্ষার্থী বলেন, আমরা সমাজের সব ক্ষেত্রের নারীদের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নারী শিক্ষার্থীদের মানদণ্ডে বিচার করেছি।
তার মতে, নারীদের কোটা কমিয়ে দিলে শেষ পর্যন্ত সামগ্রিক প্রশাসন ব্যবস্থায় এর প্রভাব পড়বে। কিছু জেলায় আমরা এরই মধ্যে তার প্রমাণ দেখেছি। ফলে দেশের আরও অনেক এলাকার নারী চাকরিপ্রত্যাশীরা আশা হারাতে পারেন।
