ফ্লাইদুবাইয়ের সেই ভারতীয় পাইলটকে ঘিরে প্রশংসার ঝড়

ফ্লাইদুবাইয়ের সেই ভারতীয় পাইলটকে ঘিরে প্রশংসার ঝড়

ফন্ট সাইজ:

ইসরাইলগামী ফ্লাইদুবাইয়ের একটি বিমানকে ভয়াবহ দুর্ঘটনার হাত থেকে রক্ষা করে নায়ক হিসেবে প্রশংসিত হচ্ছেন ভারতীয় পাইলট স্মিত মাচ্ছার। তবে শৈশব থেকেই বিমান চালানো তার স্বপ্ন ছিল না। বরং পরিবারের টেক্সটাইল ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত হওয়ার পরিকল্পনাই ছিল তার।

১৯ বছর বয়সে হঠাৎ বিমান চালানোর প্রতি আগ্রহ তৈরি হয় মাচ্ছারের। তার এই পেশা বেছে নেয়ার সিদ্ধান্তে প্রথমে ভয় পেয়েছিলেন তার মা। তবে হাজার হাজার ঘণ্টা বিমান চালানোর অভিজ্ঞতা অর্জনের পরও পেশাটিকে তিনি ব্যক্তিগত জীবনের বাইরে রাখতে পছন্দ করেন। ককপিটের বাইরের মানুষের সঙ্গে বিমান চালানো নিয়ে কথা বলতেও খুব একটা আগ্রহী নন তিনি।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছেন, ‘ক্যাপ্টেন স্মিত মাচ্ছার একজন নায়ক।’ তিনি বলেন, ‘সবচেয়ে ভয়াবহ বিপদের মুখে এবং গুরুতর আহত অবস্থাতেও তিনি অন্যদের জীবন রক্ষায় অসীম সাহস ও অটল সংকল্প দেখিয়েছেন।’

এছাড়া ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুও তাকে ‘সত্যিকারের নায়ক’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। সেই সঙ্গে ভারতীয় তারকারা মাচ্ছারের প্রশংসা করছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমজুড়েও মাচ্ছারের তুমুল বন্দনা চলছে।
বর্তমানে সৌদি আরবের তাবুকের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন মাচ্ছার। বুধবার তার ফ্লাইটটি সেখানে জরুরি অবতরণ করে। ইসরাইলি কর্মকর্তাদের দাবি, ১৭৪ আরোহী নিয়ে ইসরাইলের উদ্দেশে যাত্রা করা বিমানটির কো-পাইলট মাঝ আকাশে মাচ্ছারকে ছুরিকাঘাত করে বিমানটি বিধ্বস্ত করার চেষ্টা করেছিলেন।

ইসরাইলি কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ককপিটের মেঝেতে রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে থেকেও ককপিটের দরজা খোলার ব্যবস্থা করেন মাচ্ছার। এর ফলে যাত্রী ও ক্রুরা কো-পাইলটকে কাবু করতে সক্ষম হন। এ সময় যাত্রী হিসেবে বিমানে থাকা ফ্লাইদুবাইয়ের আরও দুজন পাইলট এগিয়ে এসে বিমানটি অবতরণে সহায়তা করেন।

প্রায় ১৫ বছরের কর্মজীবনে বোয়িং ৭৩৭-এর এই অভিজ্ঞ ক্যাপ্টেন প্রায় ৯ হাজার ৭৫০ ঘণ্টা বিমান চালিয়েছেন। তবে তুলনামূলকভাবে দেরিতেই তিনি বিমান চালানোর পেশায় আসেন।
২০২৫ সালে জালাক মেহতা পরিচালিত একটি ইউটিউব চ্যানেলে দেয়া সাক্ষাৎকারে মাচ্ছার বলেছিলেন, ‘এখনকার অনেক বৈমানিকের মতো বিমান চালানো আমার শৈশবের স্বপ্ন ছিল না। জীবনের অনেক পরে এটি আমার জীবনে আসে।’

সাক্ষাৎকার ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত ছবিতে ছাঁটা দাড়িতে দেখা যাওয়া মাচ্ছার এক দশকেরও বেশি সময় ভারতের বাণিজ্যিক বিমান সংস্থা স্পাইসজেটে কাজ করেছেন। তার লিংকডইন প্রোফাইল অনুযায়ী, ২০২২ সালে তিনি ফ্লাইদুবাইয়ে যোগ দেন।

টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং থেকে পাইলট
স্কুলের পড়াশোনা শেষে পরিবারের ব্যবসায় যোগ দেয়ার লক্ষ্য নিয়ে মাচ্ছার টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ভর্তি হন। এরপর মুম্বাইয়ের ওয়েলিংকর ইনস্টিটিউট অব ম্যানেজমেন্টে ব্যবস্থাপনা বিষয়ে পড়াশোনা শুরু করেন।
সেখানেই একটি বিমান চলাচলবিষয়ক সেমিনারে অংশ নিয়ে প্রায় ১৯ বছর বয়সে প্রথম বিমান চালানোর প্রতি আকৃষ্ট হন তিনি। মাচ্ছার বলেন, ‘সেখানেই বিমান চলাচলের প্রতি আমার আগ্রহ সত্যিকার অর্থে তৈরি হয়।’
তবে বিমান চালানোকে পেশা হিসেবে বেছে নেয়ার সিদ্ধান্তে শুরুতে তার মা ভয় পেয়েছিলেন বলেও জানান তিনি।

পরবর্তী সময়ে নিউজিল্যান্ডে বিমান চালনার প্রশিক্ষণ নেন মাচ্ছার। এরপর যোগ দেন স্পাইসজেটে। সেখানে ধাপে ধাপে পদোন্নতি পেয়ে লাইন ট্রেনিং ক্যাপ্টেন হন তিনি। এই পদে থেকে নতুন পাইলটদের প্রশিক্ষণ ও দিকনির্দেশনা দেয়ার দায়িত্ব পালন করতেন।

স্পাইসজেটে ১১ বছর কাজ করার পর গত চার বছর ধরে ফ্লাইদুবাইয়ে কর্মরত ছিলেন মাচ্ছার। দীর্ঘ কর্মজীবনে চিকিৎসাজনিত জরুরি পরিস্থিতিতে একাধিকবার বিমান অন্যত্র অবতরণ করাতে হয়েছে তাকে। আবার সামান্য মনে হলেও কারিগরি ত্রুটির কারণে কখনো কখনো ফ্লাইট বিলম্ব করার সিদ্ধান্তও নিতে হয়েছে।
বিমানযাত্রায় নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়ার বিষয়ে তিনি বলেছিলেন, ‘বিলম্ব আমার সমস্যা নয়। যতক্ষণ আপনি বিমান থেকে হেঁটে বেরিয়ে আসতে পারছেন, সেটাই আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ।’

ককপিটের বাইরে পাইলট পরিচয় রাখতে চান না
বিমান চালানোর পেশাকে ব্যক্তিগত জীবন থেকে আলাদা রাখার কথাও বিভিন্ন সময়ে বলেছেন মাচ্ছার। তার ভাষায়, ‘আমি যখন ককপিট বা বিমান থেকে বেরিয়ে আসি, তখন অন্য ব্যক্তি জানুক যে আমি একজন পাইলট-এটা আমি চাই না। আমি বিমান চলাচল নিয়ে আলোচনা করতে চাই না।’

তিনি আরও বলেন, ‘যখন ইউনিফর্ম পরি, তখন কোনো বাড়তি কথা নয়-শুধু নিজের দায়িত্ব পালন করব, কাজ শেষ করব। ককপিট থেকে বেরিয়ে আসার পর সেটুকুই শেষ। এরপর এ নিয়ে আর ভাবতে চাই না।’
এর কারণ ব্যাখ্যা করে মাচ্ছার বলেন, ‘তখন অন্য কারও আপনাকে প্রয়োজন। বাচ্চারা আছে। তারা আপনার সঙ্গে খেলতে চায়।’