ডাকনাম এবং ভালো নাম

রম্য

ডাকনাম এবং ভালো নাম

ফন্ট সাইজ:

পরিবারে বাবা-মা-দাদা-দাদি অনেককে আদর করে বিভিন্ন নামে ডাকেন, যেমন খোকা, বাবু, সোনা, মণি ইত্যাদি। এগুলি নাম মিষ্টি শোনায়। যাদেরকে এসব নামে ডাকা হয়, তারা এর জন্য দুঃখ করে না। কিন্তু অনেকগুলি ফর্সা বাচ্চাকাচ্চার মধ্যে একজনের গায়ের রঙ একটু চাপা হলে তাকে বাবা-মা ‘কালু’ বলে ডাকলে, সে মনে মনে রাগ করে থাকে। বয়সটা ছোট থাকায় আর মুরব্বিদের স্নেহ ফর্সা-কালোর ইতরবিশেষ না করায় ‘কালু’ ছেলেটা ভিন্ন কিছু চিন্তা করে না। নামটা পরিবারে চালু হয়ে যায়।
কিন্তু পরিবারের সবাই ডাকলেও পারিবারিক আদর-নাম ‘ডাকনাম’ হিসেবে কল্কে পায় না। ডাকনাম হতে গেলে পরিবারের চৌহদ্দি ডিঙ্গিয়ে বাইরের জগতে পরিচিত হতে হবে। ‘কালু বা খোকা’ নামে যদি বন্ধুরা ডাকে, মহল্লার খেলার সাথীরা ডাকে, ক্লাসমেটরা ডাকে, তবেই সেটা ডাকনাম হিসেবে পর্যবসিত হবে। ডাকনামটা আসল নামের শেষে অনেকে লেখেন, অনেকে লেখেন না। যারা লেখেন না, তাদেরকে মহল্লার মানুষ, আত্মীয়-স্বজন ডাক নামে চিনলেও ক্লাসমেট বা চাকরির ব্যাসমেটরা চেনেন না। তাই বলা যায়, ডাক নামের পরিচিতি ক্ষেত্র ব্যাপকতা পায় যদি নামটা মূল নামের সাথে দশমিকের ঘরের সংখ্যার মত বা ভগনাংশের মত থাকে।
আমরা লিখিত বা অলিখিত ব্যাপক পরিচিত খুচরো নামটাকে ‘ডাকনাম’ বলছি । এর বিপরীতে স্কুল কলেজে, চাকরি স্থলে, নির্বাচনে ভোটারদের কাছে যে একটা দাপ্তরিক নাম থাকে, পরীক্ষায় পাশ করলে সার্টিফিকেটে ওঠে এবং ভোটে পাশ করলে গেজেটে ছাপা হয় সেই বৈঠকি নামকে আমরা ‘ভালো নাম’ বলি। প্রশ্ন ওঠে, তাহলে ডাকনামটা কি খারাপ? এই ‘ভালো নামও’ যেমন উৎকৃষ্ট নাম নয়, ডাকনামও খারাপ নাম নয়। দুটোই আমের মতো ফল। ওর গ্রহণযোগ্যতে স্বাদে। মিষ্টি হলে আদর, আর টক হলে নিন্দার কাঁটা। ব্যাপকপরিচিত সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ, জালিয়াত, নীতি-বিবর্জিত মানুষের নাম ‘সিদ্দিক’ থাকলেও তাকে কেউ আস্থায় আনে না। অন্যদিকে সিনেমার ‘ফাটা কেষ্ট’ নামের লোকটাকে সবাই ভালোবাসে।
নিজের ফাস্ট নেইম বা গিভেন নেইমকে ছোট করে বন্ধু মহল বা অফিসে সহকর্মীরা অনেকসময় সম্বোধন করে থাকেন। মিজানুরকে বলেন ‘মিজান' , শামছুলকে বলে শামসু, রবিউলকে বা রবীন্দ্রকে বলেন রবি। অনেকে মূল নামের সাথে এগুলি জুড়ে একটু সমসাময়িক গ্লামার আনার চেষ্টা করেন। এটা যার যার ব্যক্তিগত ব্যাপার। এসব সংক্ষিপ্তভাবে ডাকা নামকে ডাকনাম বলার সুযোগ নেই।
লেখকেরা নিজের নাম লুকিয়ে রেখে যে নামে লেখেন, তাকে ছদ্মনাম বলা হয়। ভিক্টোরিয়ান যুগের ঔপনাসিক জর্জ এলিয়টের নাম শুনলে মনে হবে পুরুষ লেখক। তার আসল নাম মেরি এন ইভানস। চিলির কবি এবং রাজনীতিক পাবলো নেরুদা চেকস্লোভাকিয়ার কবি জেন নেরুদার ভক্ত ছিলেন। তিনি ‘নেরুদ’ অংশটি ধার করে ‘পাবলো নেরুদা’ নামে কিশোর বয়সে কবিতা লিখতেন। বাবাকে ফাঁকি দিতে এই ছদ্মনাম গ্রহণ, কারণ বাবা কবিতা লেখা পছন্দ করতেন না। পরে এই নামটাকে কবি দাপ্তরিকভাবে গ্রহণ করেন। ছদ্মনাম আসল নামকে লুকিয়ে রাখে, ডাক নামের সেরকম কোনো পরস্বহরণ মানসিকতা নেই। সে উইন-উইন সিচুয়েশন পছন্দ করে।

বৃহত্তর পরিবারে বা বন্ধুমহলে লেখকদের ছদ্মনামের মতো একটা নাম থাকতে পারে। নামটা ব্যবহার করা হয় চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য দেখে। হয়তো যাকে নিয়ে নামটা বানানো হয়, তিনি জানেনই না এটা তার নাম। বিশেষ করে, নামের মধ্যে যখন তুচ্ছতাচ্ছিল্য বা নিন্দনীয় বৈশিষ্ট্যের ইঙ্গিত থাকে, তখন নামটা গোপন রাখা হয়। এসব হেয় করা নাম স্ল্যাং শব্দের মতো গ্রুপের লোকেরা জানে এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ছাড়া অন্য সবাই এতে আমোদ পায় ।
মানুষ যত বড় হয়, তার নাম ক্ষেত্রবিশেষ তত বড় হতে থাকে। বিবাহের পর সামনে যোগ হতে পারে মিস্টার বা মিসেস , ডিগ্রি হাসিলের পর পেছনে যোগ হতে পারে এম এ, পি এইচ ডি, ইত্যাদি। জনপ্রিয় ধর্মীয় বক্তাদের নামের শেষে উদ্যোক্তারাই তার অনুমতি নিয়ে ফরিপুরি, জামালপুরি, এভাবে এলাকার পরিচিতি জুড়ে দিতে পারেন। তবে ডাকনামের সাথে এসব যুক্ত করার সুযোগ নেই। কবিতার জগতে শোনা যায়, বড় নাম চলে না। অনেকে তাই আসল নামটাকে ছোট করে ফেলেন। এগুলি অনু-পরমাণু নাম। যত ছোট হবে তত মাহাত্ম্য, ঠিক ডাকনামের মতো ।
( প্রবন্ধকার ও রম্য লেখক )