সৌদি আরবের ওপর যেকোনো ধরনের হুমকি এলে তাকে রক্ষায় পাকিস্তান তার হাতে থাকা ‘যেকোনো উপায়’ ব্যবহার করবে। ইয়েমেনের হুতিরা সৌদি আরবে হামলার প্রেক্ষিতে এমন কথা বলেছেন পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ।
বুধবার তিনি বলেন, সৌদি আরবের সঙ্গে পাকিস্তানের চুক্তির (মক্কা চুক্তি) আওতায় যেকোনো হুমকির বিরুদ্ধে দেশটির প্রতিরক্ষায় এগিয়ে আসতে পাকিস্তান বাধ্য। একই সঙ্গে ইসলামাবাদের হাতে থাকা সব ধরনের সক্ষমতাও রিয়াদের জন্য প্রয়োজনে ব্যবহার করা হবে। আঞ্চলিক উত্তেজনা অব্যাহত থাকার মধ্যেই খাজা আসিফের এই বক্তব্য এলো। এর মাধ্যমে দ্বিপক্ষীয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার আওতায় সৌদি আরবের নিরাপত্তার প্রতি ইসলামাবাদের ঘোষিত অঙ্গীকারও স্পষ্ট হলো। এ খবর দিয়েছে অনলাইন এক্সপ্রেস ট্রিবিউন।
আল জাজিরাকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে খাজা আসিফ বলেন, এই চুক্তির আওতায় সৌদি আরবকে রক্ষা করতে আমরা বাধ্য। এর অর্থ হলো, আমাদের হাতে যে ধরনের উপায় ও সক্ষমতা রয়েছে, সেগুলো সৌদি আরবের জন্যও ব্যবহারের সুযোগ থাকবে। হুতিদের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সৌদি আরবের বিরুদ্ধে গোষ্ঠীটির আগ্রাসনের বিষয়ে পাকিস্তানের অবস্থান নিয়ে একেবারেই কোনো সন্দেহ নেই। তিনি বলেন, সৌদি আরব যেকোনো সংঘাতে পড়লে আমরা তাদের সহায়তায় থাকব। সেটি হুতিদের কাছ থেকে আসুক, কোনো দেশ থেকে আসুক কিংবা সৌদি আরবের নিরাপত্তার জন্য হুমকি সৃষ্টি করে এমন অন্য কোনো গোষ্ঠীর কাছ থেকেই আসুক না কেন আমরা তাদের রক্ষায় পাশে থাকব।
সৌদি আরবের শত্রুদের পাকিস্তানও শত্রু হিসেবে বিবেচনা করে উল্লেখ করে প্রতিরক্ষামন্ত্রী বলেন, সৌদি আরবের যেকোনো শত্রু পাকিস্তানের শত্রু। তিনি জোর দিয়ে বলেন, এই অবস্থানটি খুবই পরিষ্কার হওয়া উচিত। ইরানের সঙ্গে হুতিদের সম্পর্কের বিষয়ে খাজা আসিফ বলেন, তেহরান হুতিদের নিজেদের প্রক্সি হিসেবে স্বীকার করে না। তার ব্যাখ্যা, কোনো কোনো প্রক্সি গোষ্ঠী একপর্যায়ে নিজেদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ বলেন, সময়ের সঙ্গে প্রক্সি গোষ্ঠীগুলো নিজেদের এজেন্ডা ও সক্ষমতা তৈরি করতে পারে। শুরুতে যারা তাদের সমর্থন করেছিল, পরবর্তী সময়ে তারা তাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার ঘটনা ঘটতে পারে। তিনি বলেন, ‘কোনো দেশ—এ, বি কিংবা সি, একটি প্রক্সি গোষ্ঠী তৈরি করে। এরপর সেই প্রক্সি নিজেদের মতো করে বিস্তার লাভ করতে থাকে এবং একপর্যায়ে এক ধরনের নিয়ন্ত্রণহীন গোষ্ঠীতে পরিণত হয়।
২০১৫ সালে ইয়েমেন যুদ্ধ তীব্র হওয়ার পর থেকে হুতিরা সৌদি আরবের বিরুদ্ধে বারবার ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে। এসব হামলার লক্ষ্য ছিল সৌদি সামরিক স্থাপনা, বিমানবন্দর, তেল স্থাপনা এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো। ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বরে হুতিরা সৌদি আরামকোর আবকাইক তেল প্রক্রিয়াজাতকরণ স্থাপনা ও খুরাইস তেলক্ষেত্রে ড্রোন হামলার দায় স্বীকার করে। এসব হামলার কারণে সাময়িকভাবে সৌদি আরবের অপরিশোধিত তেল উৎপাদনের অর্ধেকেরও বেশি ব্যাহত হয়। পরবর্তী বছরগুলোতেও হামলা অব্যাহত থাকে। ২০২২ সালের মার্চে সৌদি আরবের জ্বালানি অবকাঠামোতেও হামলা চালানো হয়। সাম্প্রতিক সময়েও হুতিদের হামলা সৌদি ভূখণ্ডকে টার্গেট করেছে। সেপ্টেম্বরে গোষ্ঠীটি একটি সৌদি সামরিক ঘাঁটি ও অন্যান্য লক্ষ্যবস্তুতে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার দাবি করে। সৌদি কর্তৃপক্ষও জানিয়েছে, এসব হামলায় দেশটির কয়েকটি শহর প্রভাবিত হয়েছে।
উল্লেখ্য, গত ২৫শে সেপ্টেম্বর পাকিস্তান, সৌদি আরব ও তুরস্কের শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তারা পবিত্র মক্কা নগরীকে লক্ষ্য করে চালানো হামলার তীব্র নিন্দা জানান। একই সঙ্গে মক্কা জয়েন্ট ডিফেন্স অ্যাগ্রিমেন্ট (এমজেডিএ)-এর আওতায় সৌদি আরবের সম্মিলিত প্রতিরক্ষার প্রতি নিজেদের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন তারা। এর একদিন পর সৌদি প্রতিরক্ষামন্ত্রী প্রিন্স খালিদ বিন সালমান মক্কা এবং সৌদি আরবের বেসামরিক ও অর্থনৈতিক স্থাপনায় হামলা মোকাবিলায় যৌথ প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখার বিষয়টি পুনর্ব্যক্ত করেন। পাকিস্তানের চিফ অব ডিফেন্স ফোর্সেস (সিডিএফ) ও সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরের সঙ্গে বৈঠকে তিনি এ কথা বলেন। এরপর ২৭শে সেপ্টেম্বর পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফও সৌদি আরবে হুতিদের হামলা বাড়তে থাকার প্রেক্ষাপটে মক্কা জয়েন্ট ডিফেন্স অ্যাগ্রিমেন্ট বাস্তবায়নের দৃঢ় অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, সৌদি আরবের বিরুদ্ধে কোনো আগ্রাসন হলে পাকিস্তান ও তুরস্ক বাস্তবিক ও কূটনৈতিক দুইভাবেই দেশটির পাশে থাকবে। খাজা আসিফ আরও বলেন, সৌদি আরবকে রক্ষা করা পাকিস্তানের জন্য একটি ধর্মীয় দায়িত্বেরও বিষয়। একটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলকে দেয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, কোনো চুক্তি না থাকলেও যদি সৌদি আরব আক্রান্ত হলে, বিশেষ করে মক্কা ও মদিনার পবিত্র নগরী আক্রান্ত হলে, তাহলে আমরা একটি চিরন্তন অঙ্গীকারের অধীনে আবদ্ধ। সেটি হলো আমরা আল্লাহর ঘর (কাবা) এবং মদিনাকে রক্ষা করব।
