তিন তরুণীকে নেপালে যেতে বাধা, নেপথ্যে কী

তিন তরুণীকে নেপালে যেতে বাধা, নেপথ্যে কী

ফন্ট সাইজ:

বৈধ পাসপোর্ট, ভিসা বা এন্ট্রি পারমিশন এবং বিমান টিকিট থাকার পরও অবিবাহিত হওয়া ও অভিভাবক ছাড়া ভ্রমণের মতো বিষয়কে কেন্দ্র করে তিন তরুণীকে নেপাল যেতে বাধা দেয়ার অভিযোগে রুল জারি করেছেন হাইকোর্ট। একইসঙ্গে ওই তিন তরুণীর লিখিত অভিযোগের বিষয়ে ৭ দিনের মধ্যে ব্যবস্থা নিয়ে আদালতে কমপ্লায়েন্স প্রতিবেদন দাখিল করতে পুলিশের অতিরিক্ত আইজিপিকে (অ্যাডিশনাল আইজিপি) নির্দেশ দেয়া হয়েছে। পরবর্তী সময়ে আবেদনকারীদের বিদেশ-যাত্রায় যেন কোনো ধরনের বাধা সৃষ্টি না করা হয়, সে বিষয়েও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।
শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে নেপালযাত্রায় বাধা ও হেনস্তার শিকার তিন বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজপড়ুয়া তরুণীর রিট আবেদনের প্রেক্ষিতে এ রুল জারি করেন হাইকোর্ট। সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী এডভোকেট ইশরাত হাসান তিন তরুণীর পক্ষে এ রিট আবেদন করেন। গত ২৯শে সেপ্টেম্বর রিটের প্রাথমিক শুনানি শেষে বিচারপতি কে এম কামরুল কাদের ও বিচারপতি ফাতেমা আনোয়ারের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এসব আদেশ দেন।

এদিন রিটের পক্ষে শুনানি করেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ইশরাত হাসান। তাকে সহযোগিতা করেন আইনজীবী তানজিলা রহমান জুঁই। ভুক্তভোগী তিন শিক্ষার্থী হলেন—দিনাজপুরের মোছা. রিফা তামান্না (শিক্ষার্থী, ঠাকুরগাঁও সরকারি মহিলা কলেজ), ঠাকুরগাঁওয়ের সোহানী ইসলাম সমাপ্তি (শিক্ষার্থী, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি) এবং নওগাঁর নাজনীন (শিক্ষার্থী, দ্য পিপলস ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ)।

রুলে যা জানতে চেয়েছেন আদালত: রুলে হাইকোর্ট জানতে চেয়েছেন, বৈধ কাগজপত্র থাকা সত্ত্বেও আবেদনকারীদের বিদেশযাত্রায় বাধা দেয়ার কার্যক্রম কেন আইনগত কর্তৃত্ববহির্ভূত ঘোষণা করা হবে না। একইসঙ্গে প্রাপ্তবয়স্ক নারী নাগরিকদের বৈধ বিদেশযাত্রার ক্ষেত্রে শুধু অবিবাহিত হওয়া, অভিভাবক ছাড়া ভ্রমণ বা এ ধরনের লিঙ্গভিত্তিক বিবেচনায় বাধা না দিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেয়ার আদেশ কেন দেয়া হবে না, তাও জানতে চাওয়া হয়েছে। এ ছাড়া ইমিগ্রেশন কর্মকর্তারা বিদেশযাত্রার সময় কী ধরনের প্রশ্ন করতে পারবেন এবং কোনো ধরনের ব্যক্তিগত বা অপ্রাসঙ্গিক প্রশ্ন থেকে বিরত থাকা উচিত— সে বিষয়ে সুস্পষ্ট নির্দেশনা দেয়ার প্রয়োজন আছে কি না, রুলে তাও জানতে চাওয়া হয়েছে। রিটে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি), অতিরিক্ত আইজিপি, পুলিশ সদর দপ্তর এবং হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ইমিগ্রেশন পুলিশের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিবাদী করা হয়েছে।

কী অভিযোগ তিন তরুণীর: রিট ও সংশ্লিষ্ট নথিপত্র সূত্রে জানা যায়, গত ৮ই আগস্ট সকাল ৯টায় নেপালগামী একটি ফ্লাইটে (বিজি ৩৭১) যাওয়ার উদ্দেশ্যে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে উপস্থিত হন ওই তিন তরুণী। এয়ারলাইন্সের সকল আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে ইমিগ্রেশন কাউন্টারে পৌঁছালে ইমিগ্রেশন পুলিশের তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আব্দুল্লাহ কোনো লিখিত কারণ বা বৈধ আইনি নথি ছাড়াই তাদের যাত্রায় বাধা দেন। অভিযোগে উল্লেখ করা হয়, ইমিগ্রেশন পুলিশের ওই কর্মকর্তা আইনসঙ্গত কোনো নিষেধাজ্ঞা ছাড়াই তাদের দীর্ঘক্ষণ জিজ্ঞাসাবাদ করেন ও মানসিক হেনস্তা করেন। এমনকি ওই কর্মকর্তা তরুণীদের অভিভাবকদের মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করে ‘অপ্রাপ্তবয়স্ক বা তরুণী মেয়েদের কেন একা বিদেশে যেতে দেয়া হচ্ছে’— এমন প্রশ্ন তুলে ব্যক্তিগত ও পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে তাদের বিমানবন্দর থেকে বের করে দেন।

ফলে তারা নির্ধারিত ফ্লাইটে ভ্রমণ করতে পারেননি এবং চরম আর্থিক ও মানসিক ক্ষতির শিকার হন।
এ ঘটনার পর বিমানবন্দর ইমিগ্রেশন পুলিশের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক (অ্যাডিশনাল আইজিপি) বরাবর লিখিত অভিযোগ দায়ের করা হয়। পরে গত ৬ই সেপ্টেম্বর স্বরাষ্ট্র সচিব, পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি), ইমিগ্রেশন পুলিশের অতিরিক্ত আইজিপিসহ সংশ্লিষ্টদের প্রতি ক্ষতিপূরণ ও অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য আইনি নোটিশ (ডিমান্ড অব জাস্টিস) পাঠানো হয়। নোটিশের সন্তোষজনক জবাব না পাওয়ায় হাইকোর্টে রিট দায়ের করা হয়।

রিট আবেদনে সংবিধানের ২৭, ২৮, ৩১, ৩২ ও ৩৬ অনুচ্ছেদে দেয়া মৌলিক অধিকার লঙ্ঘনের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এতে বলা হয়, সংবিধান অনুযায়ী প্রাপ্তবয়স্ক নারী নাগরিকদের স্বাধীনভাবে চলাফেরা ও বিদেশ ভ্রমণের পূর্ণ অধিকার রয়েছে। শুধু অবিবাহিত বা নারী হওয়ার কারণে অভিভাবকের অনুমতি কিংবা ব্যক্তিগত ও পিতৃতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গির ভিত্তিতে কোনো নাগরিকের বিদেশযাত্রায় বাধা দেয়া বেআইনি ও অসাংবিধানিক। রিটে ওই দিনের ঘটনার স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত, ইমিগ্রেশন এলাকার সংশ্লিষ্ট সিসিটিভি ফুটেজ সংরক্ষণ, দায়ী কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ এবং আর্থিক ক্ষতিপূরণ প্রদানের নির্দেশনা চাওয়া হয়েছে। এ ছাড়া রুল বিচারাধীন থাকা অবস্থায় আগামী ১৩ই অক্টোবর থেকে ১৮ই অক্টোবর পর্যন্ত আবেদনকারীদের কাঠমান্ডু সফরের অনুমতি প্রদানে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা জারির আর্জিও জানানো হয়েছে।

এ বিষয়ে আইনজীবী ইশরাত হাসান মানবজমিনকে বলেন, ইমিগ্রেশনে আবেদনকারীদের বিবাহিত না অবিবাহিত, স্বামী সঙ্গে যাচ্ছেন কি না এবং ভ্রমণের অর্থের উৎস কোথায়—এ ধরনের বিভিন্ন ব্যক্তিগত প্রশ্ন করা হয়। ঘটনার পর তিন তরুণী লিখিতভাবে পুলিশের অতিরিক্ত আইজিপি’র কাছে অভিযোগ করেন। সেখানে বিমানবন্দরের সিসিটিভি ফুটেজ সংরক্ষণ এবং ঘটনার তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার আবেদন করা হয়। অভিযোগের পর এক মাস পার হলেও কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। পরে আইনি নোটিশ পাঠিয়েও জবাব না পাওয়ায় তারা হাইকোর্টে রিট করেন। আইনজীবী ইশরাত হাসান বলেন, এই রিটের উদ্দেশ্য শুধু তিন আবেদনকারীর ক্ষেত্রে প্রতিকার চাওয়া নয়; ভবিষ্যতে প্রাপ্তবয়স্ক কোনো নারী বৈধ কাগজপত্র নিয়ে বিদেশ ভ্রমণের সময় যেন বৈষম্য বা অপ্রাসঙ্গিক হয়রানির শিকার না হন, সে বিষয়ে প্রয়োজনীয় আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করাও এর অন্যতম লক্ষ্য।

ইশরাত হাসান বলেন, কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে আদালতের নিষেধাজ্ঞা বা নির্দিষ্ট আইনগত বাধা না থাকলে কেবল সন্দেহ, বৈবাহিক অবস্থা বা লিঙ্গভিত্তিক বিবেচনার কারণে বিদেশযাত্রায় বাধা দেয়ার কোনো আইনগত বৈধতা নাই।