অপরাধী যেই হোক কোনো রাজনৈতিক ছাড় দেয়া হচ্ছে না বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র ও উপদেষ্টা মাহ্দী আমিন। বুধবার রাজধানীর তেজগাঁওয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি একথা বলেন। সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর প্রেস উইংয়ের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন। সাম্প্রতিক কয়েকটি দখল, হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা সম্পর্কে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে সরকারের অবস্থান তুলে ধরে মাহ্দী আমিন বলেন, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করছে এবং তাদের কাছে তথ্য রয়েছে। সরকার একটি সুষ্ঠু আইনি ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে চায়।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীও স্পষ্ট করেছেন, অপরাধী যেই হোক, কোনো রাজনৈতিক ছাড় দেয়া হচ্ছে না।
তিনি বলেন, চাঁদ উদ্যানে জমি দখলের চেষ্টার ঘটনায় ইতিমধ্যে ১৩ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আদাবরের শ্যামলী হাউজিংয়ে জমি দখলের চেষ্টার ঘটনায় গ্রেপ্তার করা হয়েছে ১১ জনকে। মিরপুরে রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে হামলা ও মালামাল ক্ষতির ঘটনায় ১৩ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এ ছাড়া ইসিবি চত্বরে কনটেন্ট ক্রিয়েটরের স্টুডিও ভাঙচুরের ঘটনায় ৭ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। সরকার নির্মোহভাবে কাজ করছে এবং যেখানে কোনো অপচেষ্টা বা অন্যায় হচ্ছে, সরকার সর্বোচ্চ আন্তরিকতার সঙ্গে আইনি ব্যবস্থা নিচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্থিতিশীল রাখা সরকারের মূল অগ্রাধিকার। যদি কোনো দুষ্কৃতকারী অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টির চেষ্টা করে, তাহলে কঠোর হাতে দমন করা হবে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের জাতিসংঘের সফর নিয়ে ব্রিফিংয়ে এক প্রশ্নের জবাবে মাহ্দী আমিন বলেন, আপনারা নিজেরাই তো বলছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি মহল উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে গুজব ও অপপ্রচার ছড়াচ্ছে। এ বিষয়টি অত্যন্ত স্পষ্ট করা দরকার। বাংলাদেশ সরকার কিংবা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে ব্যারিস্টার জাইমা রহমানকে কোনো চাকরি দেয়া হয়নি, এমনকি জাতিসংঘে বাংলাদেশ সরকারের স্থায়ী মিশনেও তার কোনো পদায়ন হয়নি। এই নিয়োগ প্রক্রিয়ার সঙ্গে বাংলাদেশ সরকারের দূরতম কোনো সম্পৃক্ততা নেই। তিনি চাকরি পেয়েছেন সরাসরি জাতিসংঘের সদর দপ্তরে, ইউনাইটেড নেশনস জেনারেল অ্যাসেম্বলির প্রেসিডেন্টের কার্যালয়ে।
তিনি আরও বলেন, জাতিসংঘের নিজস্ব নিয়মকানুন ও সুনির্দিষ্ট প্রক্রিয়ার অধীনে তাদের নির্বাহী কার্যালয়ের হিউম্যান রিসোর্সেস টিম সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে এই আন্তর্জাতিক নিয়োগটি সম্পন্ন করেছে। তার নিয়োগের যাবতীয় প্রক্রিয়া ও আর্থিক সুবিধাদী জাতিসংঘ সরাসরি বহন করে, যেখানে সরকারের কোনো প্রকার সংশ্লিষ্টতা থাকার সুযোগ নেই। যে কেউ চাইলে জাতিসংঘের অফিসিয়াল ওয়েবসাইট দেখলেই এই পদের যাবতীয় তথ্য ও নিয়োগের স্বচ্ছতা যাচাই করতে পারবেন।
প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা বলেন, জাতিসংঘের প্রফেশনাল কাঠামোতে পি-১ হলো নতুন স্নাতকদের জন্য, পি-২ এর জন্য ন্যূনতম দুই বছরের অভিজ্ঞতা লাগে এবং পি-৩ পদের জন্য প্রয়োজন হয় অন্তত পাঁচ বছরের মধ্যবর্তী পেশাগত অভিজ্ঞতা। এর উপরে পি-৪, পি-৫ বা ডিরেক্টর লেভেলের উচ্চপদ রয়েছে। ব্যারিস্টার জাইমা রহমান তার ব্যক্তিগত মেধা, শিক্ষাগত যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ প্রতিযোগিতার মধ্যদিয়ে এই পি-৩ পজিশনে নিযুক্ত হয়েছেন। তার যে পেশাগত প্রোফাইল রয়েছে, তার সঙ্গে এই পদটিই সামঞ্জস্যপূর্ণ।
তিনি বলেন, অতীতে আমরা যে ধরনের রাজনৈতিক বা পারিবারিক প্রভাব খাটিয়ে আন্তর্জাতিক মিশনে পদায়ন কিংবা প্রতিনিধিদলে অন্তর্ভুক্তির সংস্কৃতি দেখেছি, তিনি কিন্তু সেভাবে যাননি। তিনি বাংলাদেশ সরকারি প্রতিনিধিদলেরও কোথাও সম্পৃক্ত হননি। তিনি সম্পূর্ণ নিজস্ব পেশাগত সক্ষমতা ও যোগ্যতায় বিশ্বদরবারে জাতিসংঘের মতো সংস্থায় নিজের জায়গা করে নিয়েছেন। নিজের মেধার জোরে আন্তর্জাতিক পরিসরে এমন একটি অবস্থানে পৌঁছানোকে আমাদের বরং সাধুবাদ জানানো উচিত। এই ধরনের সফলতাকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে জড়িয়ে অপপ্রচার চালানো কোনোভাবেই কাম্য নয়।
প্রধানমন্ত্রী জাতিসংঘের এক ঐতিহাসিক সফর শেষে সম্প্রতি বাংলাদেশে ফিরে এসেছেন উল্লেখ করে মাহ্দী আমিন বলেন, প্রধানমন্ত্রী গতানুগতিক ধারা থেকে বেরিয়ে এসে অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত একটি বহরে তিনি নিয়মিত বাণিজ্যিক ফ্লাইটে সফর করেন। আমরা টার্কিশ এয়ারওয়েজে বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে যাই এবং ফেরার সময় এমিরেটস এয়ারলাইন্সে দেশে ফিরে আসি। আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিনিধিদলের সদস্য সংখ্যা ছিল মাত্র ৩৫ জন, যার মধ্যে মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, উপদেষ্টা ও বিশেষ পদমর্যাদাপ্রাপ্ত ব্যক্তিবর্গ অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। এর বাইরে সাধারণত যে ধরনের অত্যাবশ্যকীয় নিরাপত্তা কর্মী, মিডিয়া ও ব্যক্তিগত কর্মকর্তা থাকেন, কেবল তারাই উপস্থিত ছিলেন।
তিনি জানান, প্রধানমন্ত্রীর পাশাপাশি প্রতিনিধিদলের সদস্যরাও পুরো সফর জুড়ে এই চারদিনে প্রায় ৫০টির মতো পৃথক বৈঠকে অংশ নেন। ফলে সার্বিকভাবে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ৮০টিরও অধিক বিভিন্ন ধরনের দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে, যেখানে আমাদের কার্যকর প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত ছিল। প্রধানমন্ত্রী ব্যস্ততার কারণে প্রতিনিধিদলের বড় একটি অংশ নিয়ে দেশে ফিরে এলেও মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপদেষ্টাদের সমন্বয়ে একটি টিম ক্যালিফোর্নিয়ায় গেছেন। সেখানে টেকনোলজি, ইন্ডাস্ট্রি ও একাডেমিয়াসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অংশীদারিত্ব ও সহযোগিতা কীভাবে আরও বাড়ানো যায়, তা নিয়ে জাতিসংঘের বাইরে ক্যালিফোর্নিয়ায় তাদের ধারাবাহিক কার্যক্রম এখনো চলমান রয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা বলেন, প্রধানমন্ত্রীর সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমানও জাতিসংঘে অত্যন্ত ব্যস্ত ও কার্যকর সময় অতিবাহিত করেছেন। তিনি ৮টি কর্মসূচিতে অংশ নেন এবং ৩টিতে বক্তব্য রাখেন। জাতিসংঘ উইমেন লিডার্স প্ল্যাটফরমে অংশগ্রহণ করে তিনি বিশ্ব নারী নেতৃত্বের সামনে বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরেন। ওয়ার্ল্ড ফার্স্ট স্পাউসেস ডায়ালগে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ফার্স্ট লেডিদের উপস্থিতিতে মা ও শিশুর স্বাস্থ্য সুরক্ষায় বাংলাদেশের স্বাস্থ্য দর্শনের কথা উপস্থাপন করেন। এ ছাড়া মিডওয়াইফারি সাইড ইভেন্টে একজন চিকিৎসক হিসেবে তার মূল্যবান সমাপনী বক্তব্য আন্তর্জাতিক মহলে প্রশংসিত হয়েছে এবং মেলানিয়া ট্রাম্পের বিশেষ অনুষ্ঠানে বিশ্বের শীর্ষ ফার্স্ট লেডিদের সঙ্গে কুশলবিনিময় করেন।
তিনি বলেন, দীর্ঘ সময় পর জনগণের প্রত্যক্ষ রায়ে নির্বাচিত একটি সরকারের সরকারপ্রধান বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেছেন, যা গণতান্ত্রিক অভিযাত্রায় এক বিশাল ও বলিষ্ঠ পদচারণা ছিল।
প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রী নিশ্চিত করেছেন ‘সবার আগে বাংলাদেশ’। আন্তর্জাতিক পরিসরে জাতীয় স্বার্থকে তিনি অক্ষুণ্ন রেখেছেন, সবচেয়ে বেশি সুরক্ষা দিয়েছেন এবং বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রার মাধ্যমে বিশ্ব দরবারে দেশকে উজ্জ্বল করেছেন। তিনি স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছেন যে প্রতিটি দেশের সঙ্গে আমরা সুদৃঢ় অংশীদারিত্ব চাই, বিনিয়োগ চাই এবং বাণিজ্য সম্প্রসারণ চাই; যার মাধ্যমে আমরা দেশের স্বনির্ভরতা নিশ্চিত করতে পারবো, স্বাবলম্বিতা নিশ্চিত করতে পারবো এবং প্রতিটি মানুষের অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন নিশ্চিত করতে পারবো ইনশাআল্লাহ।
সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব সালেহ শিবলী বলেন, বিগত সময়ে দেশে ভয়াবহ ও ফ্যাসিবাদী শাসন ছিল। সেই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে মানবিক বাংলাদেশ গড়তে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রতিহিংসার রাজনীতি পরিহার করতে চান। আমরা যারা আলোর পথের যাত্রী হয়েছি, তাদের ধৈর্য ধরতে হবে। প্রধানমন্ত্রী মানবিক বাংলাদেশ গড়তে চান।
প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন বলেন, দেশে ভিন্ন ঘটনা ঘটিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নিউ ইয়র্ক সফরের সফলতা আড়ালের চেষ্টা করা হয়েছে।
