৭ বছরে ৭৯ জনের মৃত্যু

বিশ্বে বজ্রপাতপ্রবণ শীর্ষ অঞ্চল নেত্রকোণা

৭ বছরে ৭৯ জনের মৃত্যু

ফন্ট সাইজ:

নেত্রকোণা জেলায় বজ্রপাতের কারণে হাওরবাসীর কাছে বর্ষা এখন আতঙ্কের নাম। জেলায় গত ৭ বছরে বৃষ্টির সময় বজ্রপাতে ৭৯ জনের মৃত্যু হলেও তা প্রতিরোধে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেই। দেশের প্রাকৃতিক দুর্যোগের ইতিহাসে বন্যা বা ঘূর্ণিঝড়ের কথা যতটা গুরুত্বের সঙ্গে বলা হয়, ‘বজ্রপাত’ ঠিক ততটাই আড়ালে থেকে গেছে।

অথচ পরিসংখ্যান বলছে, বর্তমানে দেশের অন্যতম দ্রুত বর্ধনশীল জলবায়ু-পরিবর্তন বিষয়ক প্রাকৃতিক দুর্যোগের নাম বজ্রপাত। বন্যা বা ঘূর্ণিঝড়ের চেয়েও প্রতি বছর এই ‘নীরব ঘাতকে’র আঘাতে একের পর এক মানুষের প্রাণহানি ঘটছে। বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ বজ্রপাতপ্রবণ অঞ্চল হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে নেত্রকোণার হাওরাঞ্চল। নাসা ও মেরিল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণায় এ তথ্য উঠে এসেছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বজ্রপাতের তীব্রতা বাড়লেও হাওরে মানুষ ও এখানকার কৃষকদের সুরক্ষায় নেয়া পদক্ষেপগুলো এখনো কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ। ৭ বছরে ৭৯ জনের মৃত্যুতেও যেন টনক নড়ছে না সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের। অকার্যকর লাইটনিং অ্যারেস্টার আর অস্তিত্বহীন তালগাছ প্রকল্পের আড়ালে অরক্ষিতই থেকে গেছে এ অঞ্চলের জনপদ। ফলে প্রায় প্রতিদিনই কোনো না কোনো হাওর বা বিলে বজ্রপাতের ঘটনা ঘটছে। বিস্তীর্ণ হাওরাঞ্চলে কিংবা বিলে কৃষি চাষাবাদ, মাছ ধরা, গরু চড়ানো, হাঁস লালনপালন করতে বজ্রপাতে প্রাণহানির ঘটনা ঘটছে। যদিও জেলায় হাওর পাড়ের মানুষদের সুরক্ষায় সরকার বজ্রনিরোধক প্রকল্প হাতে নেয়। এসব বজ্রনিরোধক দণ্ড অপরিকল্পিত স্থাপন ও নিম্নমানের যন্ত্রাংশের কারণে তা অল্পদিনেই বিকল হয়ে গেছে। মুখ থুবড়ে পড়েছে প্রকল্পটি।

প্রশাসন ও স্থানীয়দের তথ্যমতে, নেত্রকোণায় বজ্রপাতে ২০২০ সালে ৮ জন, ২০২১ সালে ১৫ জন, ২০২২ সালে ৩ জন, ২০২৩ সালে ১২জন, ২০২৪ সালে ৮ জন ও ২০২৫ সালে ১৬ জন প্রাণ হারিয়েছেন। আর চলতি বছরের ২২শে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মারা গেছেন আরও ১৭ জন। তবে সরকারি হিসাবের চেয়ে প্রকৃত সংখ্যা অনেক বেশি বলে দাবি স্থানীয়দের। এসব এলাকায় ধান কাটার মৌসুমে এপ্রিল ও মে মাসেই বজ্রপাতে প্রাণহানির ঘটনা সবচেয়ে বেশি ঘটে। নেত্রকোণা জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, হাওরে বজ্রপাতজনিত মৃত্যু কমাতে ২০২২ সালে নেত্রকোণা জেলার বিভিন্ন স্থানে ৩২টি ‘লাইটনিং অ্যারেস্টার’ (বজ্রনিরোধক দণ্ড) স্থাপন করা হয়। প্রতিটি দণ্ড স্থাপনে ব্যয় ধরা হয়েছিল ছয় থেকে আট লাখ টাকা। নিয়ম অনুযায়ী দণ্ডগুলো হাওরে বা খোলা প্রান্তরে স্থাপন করার কথা। এ ছাড়া বজ্রপাত প্রতিরোধে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা হিসেবে সরকার দেশ জুড়ে তালগাছ রোপণের প্রকল্প গ্রহণ করে।

এ প্রকল্পের আওতায় নেত্রকোণায়ও তালগাছ রোপণ করা হয়। নেত্রকোণার খালিয়াজুরী উপজেলার মেন্দিপুর গ্রামের কৃষক আরিফ চৌধুরী, মদনের 
গোবিন্দশ্রী গ্রামের আবুল হাসেম, মোহনগঞ্জ উপজেলার আদর্শ নগর গ্রামের সবুজ মিয়াসহ অনেকের সঙ্গে কথা হলে তারা বলেন, খালিয়াজুরীর প্রবেশমুখ উচিতপুরে একটি বজ্রনিরোধক দণ্ড স্থাপন করা হয়েছে। এ ছাড়া বজ্রনিরোধক দণ্ড স্থাপন করার কথা হাওরের ফাঁকা জায়গায়। কিন্তু অধিকাংশ বজ্রনিরোধক দণ্ড বসানো হয়েছে বাজার, ইউনিয়ন পরিষদ ভবন কিংবা জনবসতিপূর্ণ এলাকায়। তালগাছ রোপণ প্রকল্পের বিষয়ে তারা আরও বলেন, রোপণকৃত চারাগুলোর বেশির ভাগই পরিচর্যার অভাবে মারা গেছে। ফলে কয়েক কোটি টাকার এ উদ্যোগও মুখ থুবড়ে পড়েছে। এ ব্যাপারে সরকারের কঠোর নজরদারি প্রয়োজন। কৃষিবিদ ড. শওকত আকবর বলেন, তালগাছের উচ্চতা ও গঠনগত দিক বজ্রপাত থেকে রক্ষায় সহায়ক বলে মনে করা হয়। তালগাছে কার্বনের স্তর বেশি থাকায় তা বজ্রপাত নিরোধে সহায়তা করে। তালগাছের বাকলে পুরু কার্বনের স্তর থাকে। এ কারণে বজ্রপাত থেকে রক্ষায় তালগাছ রোপণে উৎসাহিত করা হয়ে থাকে। ২০১৮ সালে সারা দেশের সঙ্গে নেত্রকোণায়ও সরকারিভাবে তালগাছ রোপণের প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছিল। কিন্তু এখন এসব তালগাছের কোনো অস্তিত্ব নেই। জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মো. রুহুল আমিন জানান, বজ্রপাতে প্রাণহানি রোধে হাওরাঞ্চল খালিয়াজুরী, মদন, মোহনগঞ্জ, কলমাকান্দা, কেন্দুয়া ও নেত্রকোণা সদর উপজেলার বিস্তীর্ণ ফসলী জমি কিংবা বিলের ও ফাঁকা জায়গায় ৩৪টি লাইটনিং অ্যারেস্টার (বজ্রনিরোধক দণ্ড) স্থাপন করা হয়েছিল। বজ্রনিরোধক দণ্ডে এক ধরনের বিশেষ ম্যাগনেট থাকে যার মাধ্যমে ৩০০ ফুট এরিয়া কভার করে। এই প্রকল্প মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে। এগুলো অনেক ব্যয়সাপেক্ষ তাই বর্তমান সরকার হাওরে বৃষ্টিপাত চলাকালে বজ্রপাতের হাত থেকে কৃষকরা যাতে সহজে বাঁচতে পারে তার জন্য সেটার বা আশ্রয়কেন্দ্র চালুর কথা চিন্তা করছে। জেলা প্রশাসক খন্দকার মুশফিকুর রহমান বলেন, বজ্রপাতে নিহতের সংখ্যা ক্রমশ বেড়েই চলেছে যা এ অঞ্চলের জনজীবনের জন্যে উদ্বেগজনক। প্রয়োজনীয় বরাদ্দ পেলে হাওরাঞ্চলে বজ্রনিরোধক পর্যাপ্ত আশ্রয়কেন্দ্র গড়ে তোলা হবে।