লক্ষ্মীপুর উন্নয়নকাজের বিল ছাড়াতে ‘৫ শতাংশ’ কমিশন আদায়, অসম্পন্ন ভবনে ৩৩ কোটি টাকার শতভাগ বিল পরিশোধ এবং সহকর্মীদের সঙ্গে দুর্ব্যবহারসহ একাধিক গুরুতর অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। অথচ শাস্তিমূলক ব্যবস্থার বদলে অদৃশ্য ক্ষমতার জোরে মাত্র ২০ দিনের ব্যবধানে তিন উপজেলায় বদলি ও পুনরায় একই স্থানে বহাল হয়ে অলৌকিক ক্ষমতা দেখালেন লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলা প্রকৌশলী মো. ইকবাল হোসেন।
দাপ্তরিক নথিপত্র বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, দুর্নীতির অভিযোগের মধ্যেই গত ৩১শে আগস্ট এলজিইডি’র প্রধান প্রকৌশলী মো. বেলাল হোসেন স্বাক্ষরিত এক আদেশে (ইকবাল হোসেনকে ফেনীর পরশুরাম উপজেলায় বদলি করা হয়। এর মাত্র এক সপ্তাহের মাথায় তাকে পরশুরাম থেকে সরিয়ে চন্দ্রগঞ্জ উপজেলার সহকারী প্রকৌশলী করা হয়। তবে এর ১০ দিনের মাথায় ২১শে সেপ্টেম্বর প্রধান প্রকৌশলী বেলাল হোসেন নিজেই অপর এক অফিস আদেশে পূর্বের বদলি বাতিল করে ইকবাল হোসেনকে পুনরায় লক্ষ্মীপুর সদরে বহাল করেন। লক্ষ্মীপুর সরকারি প্রাথমিক শিক্ষক প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটের (পিটিআই) পাঁচতলা একাডেমিক ভবন ও মহিলা হোস্টেল নির্মাণকাজে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগে কয়েকদিন যাবত লক্ষ্মীপুর জেলায় তোলপাড় সৃষ্টি হয়। সরজমিন দেখা যায়, ভবনগুলোর আস্তর, রং, টাইলস, বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম ও আসবাবপত্রের কাজ এখনও অসম্পন্ন। অথচ মোট ৩৭ কোটি ৯৬ লাখ টাকার এই দু’টি প্রকল্পে ইতিমধ্যে প্রায় ৩৩ কোটি ১৯ লাখ টাকার বিল উত্তোলন করা হয়েছে। কাজ শেষ না হতেই শতভাগ বিল নেয়ার কথা স্বীকার করেছেন ঠিকাদার বেলাল হোসেন ও এলজিইডি’র জেলা নির্বাহী প্রকৌশলী উজ্জ্বল চৌধুরী। নির্মাণাধীন মসজিদ, পুকুর ঘাটলা, কালভার্ট ও গভীর নলকূপের বিল পাসের জন্য ৫ শতাংশ কমিশন আদায়ের অভিযোগে গত ১৫ই জুলাই এলজিইডি’র তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী এএসএম মহসীনকে নিয়ে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। অপর দিকে দক্ষিণ হামছাদী ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের আব্দুল লতিফ হাজীবাড়ী থেকে মীর শাহ্ আলম চেয়ারম্যানবাড়ী পর্যন্ত ১৫০০ মিটার (১.৫ কিলোমিটার) অংশে কোনো প্রকার খননকাজই করা হয়নি।
পরবর্তীতে চেয়ারম্যান বাড়ির উত্তর থেকে সুলতান ভূঁইয়াবাড়ী পর্যন্ত ১ কিলোমিটার অংশে খালের তলদেশ খনন না করে শুধুমাত্র ভাসমান ময়লা-আবর্জনা পরিষ্কার করেই খননকাজ সম্পন্ন হিসেবে দেখিয়েছেন ইকবাল। লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলায় খাল সংস্কারের কাজ নথিপত্রে শতভাগ শেষ দেখিয়ে সরকারি কোষাগার থেকে তুলে নেয়া হয়েছে ৩০ লাখ ৩ হাজার ৫৩৬ টাকার পুরো বিল। অথচ সরজমিন খালের বুকজুড়ে মিলেছে এক দশকের পলি-ময়লা; নেই খনন, পাড় বাঁধানো কিংবা প্রয়োজনীয় বেড ব্লক ও টিবিএম অবকাঠামো। এলজিইডি সূত্রে জানা গেছে, সারা দেশে পুকুর ও খাল উন্নয়ন (আইপিসিপি) প্রকল্পের ২০২৪-২৫ অর্থবছরের আওতায় লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার ‘পি টু ডি’ খাল এবং ‘পি টু ডি ১/১’ খালের সংস্কারসহ বেড ব্লক ও টিবিএম অবকাঠামো নির্মাণের সিদ্ধান্ত হয়। কাজটি পায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘আম্মার ট্রেডার্স’। লোক দেখানো সামান্য কিছু কাজ করে শুরুতে প্রথম চলতি বিল বাগিয়ে নেয় প্রতিষ্ঠানটি।
পরবর্তীতে বিতর্কিত প্রকৌশলী মো. ইকবাল হোসেন সদর উপজেলায় যোগ দেওয়ার পরপরই সরজমিন পরিদর্শন ছাড়াই অসম্পন্ন কাজের বিপরীতে চূড়ান্ত বিল পাস করে দেন তিনি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ঠিকাদার জানান, প্রধান প্রকৌশলীকে ম্যানেজ করে ২০ দিনের মধ্যে ফিরে আসায় তিনি এখন আরও বেপরোয়া। দ্রুত তার অপসারণ ও তদন্তের শাস্তি বাস্তবায়ন করা না হলে উপজেলার সমস্ত উন্নয়ন কাজ স্থবির হয়ে পড়বে।
এছাড়া সরকারি চাকরির বিধিমালা অনুযায়ী কোনো কর্মকর্তা নিজ জেলায় পদায়ন বা দায়িত্বে থাকতে পারেন না। কিন্তু ইকবালের নিজ বাড়ি লক্ষ্মীপুরের রায়পুর উপজেলার চরপাতা ইউনিয়নের চরপাতা গ্রামে হওয়া সত্ত্বেও তিনি নিজ জেলা লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলায় প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। বিধি লঙ্ঘন করে নিজ জেলায় বহাল থাকার কারণেই তিনি এলাকায় প্রভাব বিস্তার ও ঠিকাদারদের ওপর দাপট দেখানোর সুযোগ পাচ্ছেন। সমাজ সেবক ও ব্যবসায়ী মাসুদুর রহমান বলেন, কাজ অসম্পন্ন রেখে শতভাগ বিল পরিশোধ ও কমিশন বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত সবার বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ বিভাগীয় ও আইনি ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। প্রকৌশলী মো. ইকবালকে কার্যালয়ে পাওয়া যায়নি, তার ব্যবহৃত দু’টি ফোন বন্ধ রয়েছে। এর আগে তিনি জানান, যে আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছে সে অপরাধী।
