প্রবীণবান্ধব বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়

ফন্ট সাইজ:

নদী যেমন বয়ে চলে সাগরের পানে, মানুষের জীবনও তেমনি শৈশব, যৌবন ও প্রৌঢ়ত্ব পেরিয়ে উপনীত হয় বার্ধক্যে। বার্ধক্য কোনো ব্যাধি নয়, এটি জীবনের এক অনিবার্য স্বাভাবিক পরিণতি। আজ যারা তরুণ ও কর্মক্ষম, সময়ের পরিক্রমায় তারাও একদিন প্রবীণ হবেন। অথচ সমকালীন সমাজে এই প্রবীণ জনগোষ্ঠী প্রায়শই নানা বঞ্চনা, অবহেলা ও একাকিত্বের শিকার হচ্ছেন। প্রবীণদের অধিকার রক্ষা, সামাজিক মর্যাদা এবং তাদের জন্য একটি বৈষম্যহীন ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে প্রতিবছর বিশ্বব্যাপী প্রবীণ দিবস পালিত হয়। জাতিসংঘ নির্ধারিত মূল তারিখ ১লা অক্টোবর হলেও, বাংলাদেশে সরকারি ও উৎসবগত সমন্বয় সাধনে এ বছর ৭ই অক্টোবর ২০২৬ তারিখে আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবস-২০২৬ বিশেষভাবে উদ্যাপন করা হবে। এই বিশেষ দিনে প্রবীণদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন এবং তাদের সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করতে আমাদের পারিবারিক ও সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি করা অত্যন্ত জরুরি। সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের প্রচেষ্টা এবং সমাজের সম্মিলিত উদ্যোগে একদিন বাংলাদেশ সত্যিই প্রবীণবান্ধব সমাজে পরিণত হবে। যেখানে বয়স হবে গর্বের বিষয়, বোঝা নয়।

ঢাকার পুরান শহরের সরু গলির এক ছোট্ট ঘরে ৭২ বছরের আব্দুল করিম চাচা (ছদ্মনাম) চেয়ারে বসে চায়ের কাপ হাতে নিয়ে ভাবছেন। একসময় তিনি ছিলেন একজন দক্ষ সরকারি কর্মকর্তা। চাকরিরত অবস্থায় সংসার চালিয়েছেন, ছেলেমেয়েদের মানুষ করেছেন। কিন্তু অবসরের পর বার্ধক্যে এসে সবকিছু বদলে দিয়েছে। শরীর দুর্বল, চোখের দৃষ্টি কমে গেছে, আর সন্তানরা দূরে চাকরি করে। একা থাকার দিনগুলোতে একসময় মনে হতো জীবন যেন শেষ হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু গত কয়েক বছর ধরে মাসে মাসে যে অল্প টাকাটা আসে বয়স্ক ভাতা হিসেবে, তার মুখে হাসি ফুটিয়েছে। ‘সরকারের এই সহায়তা না থাকলে আমার হয়তো কারও দয়ার ওপর নির্ভর করতে হতো,’ বলেন- তিনি। প্রতি তিন মাস অন্তর যখন মোবাইলে টাকা আসে, তিনি হাসতে হাসতে বলেন, ‘সরকার আমাকে ভোলেনি।’ তার মতো হাজারো প্রবীণের জীবনে আজ সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি এক নতুন আশার আলো।

প্রতিবছর ১লা অক্টোবর সারা বিশ্বে পালিত হয় আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবস। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ১৯৯০ সালের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী এই দিনটি প্রবীণদের অবদান স্বীকৃতি দিতে, তাদের অধিকার রক্ষায় সচেতনতা তৈরি করতে এবং বার্ধক্যকে সমাজের স্বাভাবিক অংশ হিসেবে দেখতে উৎসাহিত করে। ২০২৬ সালের প্রতিপাদ্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ- “The Age of Longevity: Rethinking Systems for Longer Lives” বা ‘দীর্ঘজীবনের যুগ: দীর্ঘতর জীবনের জন্য ব্যবস্থাপনা নতুন করে সাজানো’। এই প্রতিপাদ্য আমাদের সামনে এক গভীর প্রশ্ন তুলে ধরে: মানুষ এখন আগের চেয়ে অনেক বেশিদিন বাঁচছে। কিন্তু এই অতিরিক্ত বছরগুলো কি স্বাস্থ্যকর, মর্যাদাপূর্ণ এবং অর্থপূর্ণ হচ্ছে? না কি শুধু সময় বাড়ছে, জীবনের মান নয়? বিশ্বজুড়ে জনসংখ্যার এই পরিবর্তনকে ‘লংজেভিটি বিপ্লব’ বলা হচ্ছে। ২০০২ সালে ৬০ বছর বা তার বেশি বয়সী মানুষের সংখ্যা ছিল প্রায় ৬৩ কোটি। ২০২৬ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১২৬ কোটির কাছাকাছি। ২০৫০ সাল নাগাদ এই সংখ্যা ২১১ কোটি ছাড়িয়ে যাবে বলে জাতিসংঘের হিসাব। বৈশ্বিক জনসংখ্যার অনুপাতেও প্রবীণদের অংশ বাড়ছে দ্রুত। দীর্ঘজীবন যদি সুস্থতা, উৎপাদনশীলতা এবং সামাজিক অংশগ্রহণের সঙ্গে যুক্ত হয়, তাহলে তা অর্থনীতি ও সমাজের জন্য ‘লংজেভিটি ডিভিডেন্ড’ বা দীর্ঘজীবনের লভ্যাংশ তৈরি করতে পারে। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। অনেক দেশেই স্বাস্থ্যব্যবস্থা, পেনশন, দীর্ঘমেয়াদি যত্ন এবং সামাজিক সুরক্ষা এই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে পারছে না। বয়সভিত্তিক বৈষম্য বা এজিজম, একাকিত্ব এবং স্বাস্থ্যসেবার অভাব অনেক প্রবীণকে পিছিয়ে রাখছে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট আরও জরুরি। ইউনিসেফসহ বিভিন্ন সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৯ সালের মধ্যে দেশটি প্রবীণপ্রবণ সমাজে প্রবেশ করবে এবং ২০৪৭ সাল নাগাদ প্রবীণ জনগোষ্ঠীর অনুপাত আরও বাড়বে। দেশে এখন প্রায় ১ কোটি ৬৫ লাখ থেকে ১ কোটি ৭০ লাখ মানুষ ৬০ বছর বা তার বেশি বয়সী, যা মোট জনসংখ্যার প্রায় ১০ শতাংশ। ২০৫০ সাল নাগাদ এই সংখ্যা দ্বিগুণেরও বেশি হয়ে প্রায় ৪ কোটি ছাড়িয়ে যাবে এবং অনুপাত দাঁড়াবে প্রায় ১৯ শতাংশে। অর্থাৎ প্রতি পাঁচজনে একজন প্রবীণ হবেন। এটি কেবল জনমিতিক পরিবর্তন নয়- এটি স্বাস্থ্য, অর্থনীতি, পরিবার এবং রাষ্ট্রের নীতির ওপর গভীর প্রভাব ফেলবে।

সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় ও এর অধীনস্থ সমাজসেবা অধিদপ্তর প্রবীণদের কল্যাণে নানা উদ্যোগ নিয়েছে যা আজ হাজারো পরিবারের ভরসা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সরকারের অন্যতম বড়ো অবদান হলো বয়স্ক ভাতা কর্মসূচি। বর্তমানে প্রায় ৬২ লাখ প্রবীণ এই ভাতার আওতায় এসেছেন। সাধারণ উপকারভোগীরা মাসে ৭০০ টাকা করে পাচ্ছেন, আর ৯০ বছরের বেশি বয়সীরা পাচ্ছেন ১০০০ টাকা। এই অল্প টাকা অনেক প্রবীণের জন্য ওষুধ কেনা, প্রতিদিনের খরচ মেটানো বা পরিবারের কাছে নিজেকে বোঝা মনে না করার সুযোগ তৈরি করেছে। সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে অনলাইন আবেদন ব্যবস্থা চালু করায় ভাতা পাওয়ার প্রক্রিয়াও আগের চেয়ে সহজ হয়েছে। শুধু ভাতাই নয়। সরকার প্রবীণদের জন্য জাতীয় প্রবীণ নীতিমালা-২০১৩ প্রণয়ন করেছে। এই নীতিতে প্রবীণদের অধিকার, স্বাস্থ্যসেবা, আবাসন ও সামাজিক অন্তর্ভুক্তির বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছে। অনেক প্রবীণ আজও সমাজে অবদান রাখতে সক্ষম- তাদের অভিজ্ঞতা কাজে লাগানো যেতে পারে স্কুল, কমিউনিটি সেন্টার বা স্থানীয় উন্নয়ন কাজে। সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের বর্তমান নেতৃত্বে প্রবীণবান্ধব সমাজ গঠনের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। কমিউনিটি ভিত্তিক সেবা, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের সম্পৃক্ততা এবং বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ বাড়াতে হবে। প্রবীণ দিবস শুধু একদিনের অনুষ্ঠান নয়। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, আজকের তরুণরাই আগামীকালের প্রবীণ। তাই এখনই প্রস্তুতি নিতে হবে। পরিবারে প্রবীণদের সম্মান করা, তাদের অভিজ্ঞতা শোনা এবং প্রয়োজনে সহায়তা করা- এগুলো আমাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অংশ। সরকার যদি নীতি ও অর্থ দিয়ে সহায়তা করে, তাহলে সমাজ যদি ভালোবাসা ও সম্মান দেয়, তবেই প্রবীণরা মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপন করতে পারবেন। আব্দুল করিম চাচার মতো হাজারো প্রবীণ আজ সরকারের সহায়তায় কিছুটা স্বস্তি পাচ্ছেন। তাদের হাসিমুখ দেখলেই বোঝা যায়, ছোট্ট একটা ভাতাও কতটা বড়ো পরিবর্তন আনতে পারে। প্রবীণ দিবসের এই উপলক্ষ্যে আমাদের অঙ্গীকার হোক-প্রবীণদের শুধু ভরণপোষণ নয়, সম্মান ও অংশগ্রহণের সুযোগ দেবো। যেখানে বয়স হবে গর্বের বিষয়, বোঝা নয়।

লেখক: সিনিয়র তথ্য অফিসার।

পিআইডি ফিচার