ভূরাজনীতির আন্তর্জাতিক দাবাখেলায় প্রতিটি চালের পেছনে থাকে নানা হিসাব-নিকাশ। কূটনৈতিক বিবৃতির আড়ালে কখনো লুকিয়ে থাকে জটিল ও সূক্ষ্ম ভূকৌশলগত স্বার্থ, যার প্রভাব অনেক সময় সাধারণ মানুষের জীবনেও সরাসরি পড়ে। কোনো দেশের কৌশলগত সিদ্ধান্ত যখন আরেকটি দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি, জ্বালানি নিরাপত্তা ও জাতীয় উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করে, তখন সেটি আর নিছক কূটনৈতিক বিষয় থাকে না; হয়ে ওঠে কোটি মানুষের জীবন ও জীবিকার সঙ্গে জড়িত এক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
বাংলাদেশ যখন নিজস্ব সক্ষমতা বাড়িয়ে জ্বালানি নিরাপত্তার ভিত শক্ত করার পথে এগিয়ে যাচ্ছে, ঠিক তখনই রাশিয়ার রোসাটমের সহায়তায় নির্মিত রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য ইউরেনিয়াম বহনকারী বিশেষ বিমানকে পাকিস্তানের আকাশসীমা ব্যবহারের অনুমতি না দেওয়ার ঘটনা নতুন উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। দেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ মেগা প্রকল্পের জ্বালানি পরিবহনে এমন বাধা বাংলাদেশের জন্য নিঃসন্দেহে অনাকাঙ্ক্ষিত। এই ঘটনা শুধু একটি বিমানের যাত্রা ব্যাহত হওয়ার বিষয় নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে দেশের জ্বালানি পরিকল্পনা, অর্থনৈতিক স্বার্থ এবং ভবিষ্যৎ উন্নয়নের প্রশ্ন।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, রূপপুরের জ্বালানি বহনকারী বিশেষ বিমানটির গত ২৪ সেপ্টেম্বর ঢাকায় পৌঁছানোর কথা ছিল। কিন্তু শেষ মুহূর্তে পাকিস্তানের বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে আকাশসীমা ব্যবহারের অনুমতি বা ‘ওভারফ্লাইট পারমিশন’ না মেলায় ইউরেনিয়াম সরবরাহের পুরো প্রক্রিয়াটি অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে। অথচ বাংলাদেশ সরকারের জাতীয় পরিকল্পনা এবং রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্র কর্তৃপক্ষের পূর্বঘোষিত সময়সূচি অনুযায়ী, ২০২৬ সালের আগস্টের শেষভাগ কিংবা সেপ্টেম্বরের শুরুতে কেন্দ্রটির প্রথম ইউনিট থেকে পরীক্ষামূলকভাবে প্রায় ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হওয়ার কথা ছিল।
আন্তর্জাতিক পারমাণবিক নিরাপত্তা ও পরিচালনাগত নিয়ম মেনে জ্বালানি লোডিং, চুল্লি পরীক্ষা এবং প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত ধাপ সম্পন্ন করেই জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহের পরিকল্পনা করা হয়েছিল। কিন্তু জ্বালানি পরিবহনে এই অনাকাঙ্ক্ষিত বাধা পুরো সময়সূচির ওপর নতুন করে চাপ সৃষ্টি করেছে। ফলে নির্ধারিত সময়ে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু করা নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। একটি দেশের গুরুত্বপূর্ণ বিদ্যুৎ প্রকল্পের জ্বালানি পরিবহনে এমন অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়া কোনোভাবেই কাম্য নয়।
পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু করা সাধারণ কোনো বিদ্যুৎকেন্দ্র চালুর মতো সহজ কাজ নয়। এর প্রতিটি ধাপ নির্দিষ্ট বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি, কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থা এবং সুপরিকল্পিত সময়সূচির ওপর নির্ভরশীল। চুল্লির কার্যকারিতা পরীক্ষা, বিভিন্ন সিস্টেমের কমিশনিং, সেফটি ভালভের কার্যকারিতা যাচাই এবং ক্রিটিক্যালিটি টেস্টসহ প্রতিটি পর্যায় অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে সম্পন্ন করতে হয়। এসব কাজে সামান্য ত্রুটি বা অনাকাঙ্ক্ষিত বিলম্বও পরবর্তী ধাপের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
জ্বালানি সময়মতো না পৌঁছালে পুরো প্রক্রিয়ায় বাড়তি চাপ তৈরি হওয়াই স্বাভাবিক। এর ফলে জাতীয় গ্রিডে পারমাণবিক বিদ্যুৎ যুক্ত করার পরিকল্পিত সময়সূচি পিছিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দেয়। আপাতদৃষ্টিতে বিষয়টি একটি বিমানের যাত্রা বিলম্বিত হওয়ার ঘটনা মনে হতে পারে। কিন্তু এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা জাতীয় স্বার্থ, অর্থনৈতিক ব্যয় এবং জ্বালানি নিরাপত্তার বিষয়গুলো বিবেচনায় নিলে এর প্রভাব যে অনেক গভীর, তা সহজেই উপলব্ধি করা যায়।
রূপপুর প্রকল্পের বিলম্বের প্রভাব শেষ পর্যন্ত বহন করতে হয় দেশের সাধারণ মানুষ ও উৎপাদন খাতকে। তৈরি পোশাকশিল্প থেকে শুরু করে ভারী ও মাঝারি শিল্প—দেশের উৎপাদনমুখী প্রায় সব খাতই নিরবচ্ছিন্ন ও সাশ্রয়ী বিদ্যুতের ওপর নির্ভরশীল। অথচ দীর্ঘদিন ধরেই বিদ্যুৎ সরবরাহের অনিশ্চয়তা এবং উৎপাদন ব্যয়ের চাপ এসব খাতের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে।
রূপপুরের বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হলে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সামগ্রিক ব্যয় কমানোর সুযোগ তৈরি হতো। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ সরবরাহের ওপর চাপ কমিয়ে লোডশেডিং পরিস্থিতির উন্নতিতেও ভূমিকা রাখার প্রত্যাশা ছিল। কিন্তু সরবরাহের সময় পিছিয়ে গেলে বিদ্যুতের চাহিদা পূরণে সরকারকে তুলনামূলক বেশি ব্যয়বহুল তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) ও ফার্নেস অয়েলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ওপর বাড়তি নির্ভরতা বজায় রাখতে হতে পারে।
এর অর্থ হলো, বিদ্যুৎ উৎপাদনে অতিরিক্ত ব্যয়, বৈদেশিক মুদ্রার ওপর বাড়তি চাপ এবং বিদ্যুৎ খাতের আর্থিক ব্যবস্থাপনায় নতুন চ্যালেঞ্জ। শেষ পর্যন্ত এই ব্যয়ের বোঝা কোনো না কোনোভাবে দেশের অর্থনীতি ও সাধারণ মানুষের ওপর এসে পড়তে পারে। উৎপাদন ব্যয় বেড়ে গেলে রপ্তানিমুখী শিল্পের প্রতিযোগিতার সক্ষমতাও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। আন্তর্জাতিক বাজারে টিকে থাকতে যেখানে প্রতিনিয়ত ব্যয় কমানো ও উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর চেষ্টা চলছে, সেখানে বিদ্যুৎ সরবরাহে অনিশ্চয়তা বাংলাদেশের শিল্প খাতের জন্য বাড়তি দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে উঠতে পারে।
ঘটনার পর পাকিস্তানের বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ এবং ঢাকায় অবস্থিত পাকিস্তান হাইকমিশনের পক্ষ থেকে ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে। তাদের দাবি, আকাশসীমা ব্যবহারের অনুমতি না দেওয়ার বিষয়টি কোনো রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নয়; বরং উড্ডয়নপথ, বিমান চলাচলের নিয়ম এবং সংশ্লিষ্ট প্রক্রিয়াগত জটিলতার কারণে এমনটি ঘটেছে। দুই দেশের মধ্যে বিকাশমান বাণিজ্যিক ও কূটনৈতিক সম্পর্কের প্রসঙ্গ তুলে তারা ঘটনাটিকে অতিরিক্ত গুরুত্ব না দিয়ে আন্তর্জাতিক বিমান চলাচলের একটি সাধারণ প্রক্রিয়াগত বিষয় হিসেবে দেখার আহ্বান জানিয়েছে।
কিন্তু পাকিস্তানের এই ব্যাখ্যা নিয়ে প্রশ্ন তোলার যথেষ্ট অবকাশ রয়েছে। একজন সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক হিসেবে বিষয়টিকে কেবল একটি কারিগরি জটিলতা বলে মেনে নেওয়ার আগে ঘটনার প্রতিটি দিক খতিয়ে দেখা জরুরি। বিশেষ করে, যখন একটি দেশের গুরুত্বপূর্ণ পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের জন্য সংবেদনশীল জ্বালানি পরিবহনের প্রশ্ন জড়িত, তখন এ ধরনের বিমান চলাচলের অনুমতি ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের বিষয়টি যে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে বিবেচনা করা হয়, তা বলাই বাহুল্য।
আন্তর্জাতিক রুট, জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার ব্যবস্থা এবং আকাশসীমা ব্যবহারের অনুমতি—এসব বিষয় সাধারণত বিমান উড্ডয়নের আগেই নির্ধারণ ও সমন্বয় করা হয়। তাই শেষ মুহূর্তে অনুমতি না পাওয়ার ঘটনা স্বাভাবিকভাবেই নানা প্রশ্নের জন্ম দেয়। যদি সত্যিই কারিগরি বা প্রক্রিয়াগত জটিলতা থেকে থাকে, তবে সেটি আগে শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি কেন? বিমান প্রস্তুত হওয়ার পর কিংবা যাত্রার একেবারে কাছাকাছি সময়ে কেন এই বাধা সামনে এল?
এখানে দুটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর প্রয়োজন। রোসাটম বা তাদের নিয়োজিত আন্তর্জাতিক পরিবহন সংস্থা কি প্রয়োজনীয় নিয়মকানুন ও প্রক্রিয়া যথাযথভাবে অনুসরণ করেনি? নাকি সব শর্ত পূরণ করা সত্ত্বেও পাকিস্তানের বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তে আকাশসীমা ব্যবহারের অনুমতি আটকে গেছে? ঘটনার প্রকৃত কারণ নির্ধারণে এসব প্রশ্নের নিরপেক্ষ ও তথ্যভিত্তিক উত্তর খুঁজে বের করা জরুরি।
এ ঘটনার সঙ্গে আরও একটি স্পর্শকাতর ভূরাজনৈতিক প্রশ্নও সামনে এসেছে। পুরো পরিস্থিতির নেপথ্যে কি যুক্তরাষ্ট্রের কোনো পরোক্ষ প্রভাব কিংবা ভূরাজনৈতিক চাপ কাজ করেছে? রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে দীর্ঘদিনের বৈরিতা এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে তাদের স্বার্থের সংঘাত সুপরিচিত। রাশিয়ার অর্থনৈতিক ও কৌশলগত প্রভাব সীমিত করার লক্ষ্যে ওয়াশিংটন বিভিন্ন সময়ে নানা ধরনের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক পদক্ষেপ নিয়েছে। অন্যদিকে, পাকিস্তানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের সামরিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে।
এ ছাড়া, সম্প্রতি বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের একটি বেসামরিক পারমাণবিক সহযোগিতা চুক্তিও স্বাক্ষরিত হয়েছে। এই বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন উঠতেই পারে—রূপপুরের জ্বালানি পরিবহনে সৃষ্ট জটিলতার সঙ্গে বৃহত্তর কোনো আন্তর্জাতিক সমীকরণের সম্পর্ক রয়েছে কি না। রাশিয়ার পারমাণবিক প্রযুক্তি ও জ্বালানি খাতের প্রভাব সীমিত করার কোনো কৌশলের অংশ হিসেবে এই ঘটনা ঘটেছে কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
তবে কোনো প্রমাণ ছাড়া কোনো দেশ বা শক্তিকে এ ঘটনার জন্য দায়ী করা সমীচীন হবে না। একইভাবে, পাকিস্তানের ব্যাখ্যাকেও যাচাই-বাছাই ছাড়াই চূড়ান্ত সত্য বলে ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই। প্রকৃত সত্য জানতে হলে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের বক্তব্য, অনুমতিপত্র, যোগাযোগের নথি এবং পরিবহন-সংক্রান্ত তথ্য পর্যালোচনা করতে হবে। পাকিস্তান কি কোনো পরাশক্তির কূটনৈতিক ইঙ্গিতে বাংলাদেশের মতো একটি দেশের গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় প্রকল্পের জ্বালানি বহনকারী বিমানের আকাশপথ আটকে দিয়েছে, নাকি এর পেছনে অন্য কোনো বাস্তব কারণ রয়েছে—তা নির্ধারণে প্রয়োজন নিরপেক্ষ অনুসন্ধান। অনুমান নয়, তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতেই এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে।
দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক রাজনীতির দিকে তাকালে দেখা যায়, প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে বন্ধুত্বের ঘোষণা ও বাস্তব স্বার্থের মধ্যে কখনো কখনো ব্যবধান তৈরি হয়েছে। ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের সম্পর্কের ক্ষেত্রেও তিস্তা নদীর পানিবণ্টনের ন্যায্য হিস্যা কিংবা রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে বাংলাদেশের প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। এসব ক্ষেত্রে ভারতের নিজস্ব কৌশলগত ও বাণিজ্যিক স্বার্থ যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে, তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই।
অন্যদিকে, সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর পাকিস্তান বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনে আগ্রহ দেখিয়েছে। দুই দেশের নেতাদের বক্তব্য ও কূটনৈতিক যোগাযোগে বন্ধুত্বের বার্তাও এসেছে। কিন্তু বন্ধুত্বের প্রকৃত পরীক্ষা হয় বাস্তব সহযোগিতার ক্ষেত্রে। মুখে ভ্রাতৃত্বের কথা বলার পাশাপাশি যখন একটি গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় প্রকল্পের জ্বালানি পরিবহনে বাধা তৈরি হয়, তখন সেই বন্ধুত্বের আন্তরিকতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।
অবশ্য একটি ঘটনার ভিত্তিতে দুই দেশের সামগ্রিক সম্পর্কের চূড়ান্ত মূল্যায়ন করা ঠিক হবে না। তবে ঘটনাটির প্রকৃত কারণ স্পষ্ট করা এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের পরিস্থিতি এড়ানোর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। কারণ, কূটনৈতিক সম্পর্কের সৌজন্য যতই গুরুত্বপূর্ণ হোক, জাতীয় স্বার্থ ও জ্বালানি নিরাপত্তার প্রশ্নে বাস্তব সহযোগিতাই শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব বহন করে। প্রকৃত বন্ধুত্বের পরিচয় শুধু কথায় নয়, সংকটের সময়ে দায়িত্বশীল আচরণ ও সহযোগিতার মধ্য দিয়েই প্রকাশ পায়।
বাংলাদেশ আজ একটি উদীয়মান ও সার্বভৌম রাষ্ট্র। দেশের উন্নয়ন, জ্বালানি নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক অগ্রগতির প্রশ্নে কোনো একক দেশের সিদ্ধান্তের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল থাকা দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকিপূর্ণ। কোনো দেশের আকাশসীমা ব্যবহারের অনুমতি কিংবা প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের কারণে বাংলাদেশের মতো একটি দেশের গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় প্রকল্প অনিশ্চয়তার মুখে পড়ুক—এটি কাম্য হতে পারে না।
রাশিয়া সরকার ও রোসাটমের পক্ষ থেকে আশ্বাস দেওয়া হয়েছে, অক্টোবর থেকে বিকল্প পথে ইউরেনিয়াম সরবরাহের ব্যবস্থা করে বছরের শেষ নাগাদ নির্ধারিত সরবরাহের লক্ষ্যমাত্রা পূরণের চেষ্টা করা হবে। এই আশ্বাস বাস্তবে কতটা কার্যকর হয়, তা সময়ই বলে দেবে। তবে বিকল্প পথের ব্যবস্থা করা সম্ভব হলেও ইতিমধ্যে যে অনিশ্চয়তা ও বিলম্ব তৈরি হয়েছে, তা উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। এর ফলে প্রকল্পের সময়সূচি, ব্যয় এবং বিদ্যুৎ সরবরাহের পরিকল্পনায় কী ধরনের প্রভাব পড়েছে, তা নিরূপণ করা প্রয়োজন।
এই পরিস্থিতিতে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উচিত দ্রুত একটি নিরপেক্ষ ও উচ্চপর্যায়ের তদন্তের ব্যবস্থা করা। রোসাটম বা পরিবহন সংস্থার কোনো যোগাযোগগত কিংবা প্রক্রিয়াগত ত্রুটি ছিল কি না, পাকিস্তানের বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তের পেছনে কী কারণ ছিল, অথবা বৃহত্তর কোনো আন্তর্জাতিক প্রভাব কাজ করেছে কি না—সব দিকই গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখতে হবে। তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটন করে তা জনগণের সামনে তুলে ধরা জরুরি।
একই সঙ্গে ভবিষ্যতে এ ধরনের কৌশলগত ও সংবেদনশীল পণ্য পরিবহনে যেন কোনো একটি দেশের আকাশসীমার ওপর অতিরিক্ত নির্ভর করতে না হয়, সে জন্য বিকল্প আন্তর্জাতিক আকাশ ও নৌপথের ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। সংশ্লিষ্ট দেশ ও পরিবহন সংস্থাগুলোর সঙ্গে আগাম সমন্বয়, প্রয়োজনীয় অনুমতিপত্র নিশ্চিত করা এবং জরুরি পরিস্থিতিতে বিকল্প রুট ব্যবহারের কার্যকর প্রটোকল তৈরি করা প্রয়োজন। শুধু তাৎক্ষণিক সংকট মোকাবিলা করলেই হবে না; ভবিষ্যতে একই ধরনের সংকট যাতে আর তৈরি না হয়, সে ব্যবস্থাও নিতে হবে।
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক অগ্রগতির একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প। এর বাস্তবায়নে যেকোনো অনাকাঙ্ক্ষিত বিলম্বের প্রভাব পড়ে জাতীয় অর্থনীতি, শিল্প উৎপাদন এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ওপর। তাই এই প্রকল্পের জ্বালানি পরিবহন নিয়ে সৃষ্ট জটিলতাকে ছোট করে দেখার সুযোগ নেই। একই সঙ্গে, প্রকৃত কারণ অনুসন্ধানের আগেই কোনো দেশ বা শক্তিকে দায়ী করাও দায়িত্বশীলতার পরিচয় নয়।
বাংলাদেশের আঠারো কোটি মানুষের ভবিষ্যৎ ও অর্থনৈতিক অগ্রগতি কোনো আন্তর্জাতিক দাবাখেলার চাল হতে পারে না। দেশের জাতীয় স্বার্থ রক্ষা, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন প্রকল্পের গতি অক্ষুণ্ণ রাখা সরকারের দায়িত্ব। পাকিস্তানের আকাশসীমা ব্যবহারের অনুমতি না দেওয়ার ঘটনায় কী ঘটেছিল, কেন ঘটেছিল এবং এর ফলে বাংলাদেশের কী ক্ষতি হয়েছে—এসব প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর জাতির সামনে তুলে ধরতে হবে। পাশাপাশি, ভবিষ্যতে এমন পরিস্থিতি মোকাবিলায় কার্যকর কূটনৈতিক ও পরিবহনব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
পরিশেষে বলতে চাই,বন্ধুত্বের সম্পর্ক অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সেই সম্পর্কের ভিত্তি হতে হবে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, আস্থা ও বাস্তব সহযোগিতা। বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে কোনো অস্পষ্টতা, অনিশ্চয়তা কিংবা অন্যের সদিচ্ছার ওপর অযৌক্তিক নির্ভরতা থাকা উচিত নয়। রূপপুরের জ্বালানি পরিবহন ঘিরে সৃষ্ট এই ঘটনা বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা—জ্বালানি নিরাপত্তা ও কৌশলগত স্বার্থ রক্ষায় আত্মনির্ভরতার পাশাপাশি বিকল্প ব্যবস্থা ও দূরদর্শী কূটনীতির কোনো বিকল্প নেই।
লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সম্পাদক,আমার দিন।
ই-মেইল:[email protected]
