গাজায় গণহত্যায় ক্ষুব্ধ কাতার। সরাসরি ইসরাইলের নাম উল্লেখ না করে কাতারের প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ বিন আবদুল রহমান বিন জসিম আল থানি বলেন, অবরুদ্ধ ফিলিস্তিনি এই ভূখণ্ডে যে বা যারা ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছে, তারা যুদ্ধাপরাধী। এ সময় তিনি ২০২৩ সালের ৭ই অক্টোবর ইসরাইলে হামাসের চালানো হামলারও নিন্দা জানান। তিনি বলেন, গাজায় গণহত্যা চালানোর পক্ষে ইসরাইল যা বলছে তার কোনো যৌক্তিকতা নেই। মঙ্গলবার ‘পিয়ার্স মরগান আনসেন্সরড’ অনুষ্ঠানে গাজা উপত্যকায় ইসরাইল কী ধরনের কর্মকাণ্ড চালাচ্ছে? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি এ মন্তব্য করেন। এ খবর দিয়েছে অনলাইন আল জাজিরা।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের নেতৃত্বে ইসরাইলে চালানো হামলাকে তিনি ‘একটি গণহত্যা’ হিসেবে বর্ণনা করেন। বলেন, ওই হামলার নিন্দা জানানো উচিত। হামলার জন্য দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনার আহ্বান জানালেও তিনি বলেন, এর জবাবে ইসরাইল যে কর্মকাণ্ড চালিয়েছে, তার কোনো যৌক্তিকতা নেই। তিনি বলেন, হাসপাতালে হামলা করা হয়েছে, স্কুলে হামলা করা হয়েছে। যে যুক্তি বা কারণই দেখানো হোক না কেন, কোনো কিছুই এর যৌক্তিকতা প্রমাণ করে না।
২০২৫ সালের অক্টোবরে কার্যকর হওয়া যুদ্ধবিরতি ইসরাইল প্রায় দিনই লঙ্ঘন করছে বলেও অভিযোগ করেন শেখ মোহাম্মদ। তিনি বলেন, যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের পর থেকে গাজা উপত্যকায় ১৪০০-এর বেশি ফিলিস্তিনিকে হত্যা করা হয়েছে। তিনি বলেন, ফিলিস্তিনের আরও ভূখণ্ড দখল করা হয়েছে। গাজা উপত্যকার প্রায় ৭০ শতাংশ এখন দখল করে রেখেছে ইসরাইল। ইসরাইলি বাহিনী সেখানে ফিলিস্তিনিদের প্রবেশ করতে দিচ্ছে না। তারা এই চুক্তিতে দেয়া প্রতিশ্রুতিগুলো পালন করছে না। এটি শুধু দেখাচ্ছে যে তাদের ভিন্ন উদ্দেশ্য রয়েছে। শেখ মোহাম্মদ বলেন, যুদ্ধ শুরুর প্রথম দিন থেকেই যুদ্ধবিরতি প্রতিষ্ঠায় কাতারের প্রচেষ্টাকে ইসরাইল বারবার ব্যর্থ করে দিয়েছে।
২০২৫ সালে কাতারের রাজধানী দোহায় ইসরাইলের হামলারও নিন্দা জানান তিনি। ওই হামলায় আলোচনার জন্য জড়ো হওয়া হামাসের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের টার্গেট করা হয়। হামলায় ভয়াবহ বিস্ফোরণ ঘটে এবং এটি কাতারের সার্বভৌমত্বে নজিরবিহীন লঙ্ঘন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের প্রসঙ্গ টেনে শেখ মোহাম্মদ বলেন, আমরা যখন মধ্যস্থতা করছিলাম এবং দোহায় ট্রাম্পের সেই সময়কার প্রস্তাব বাস্তবায়নের জন্য চেষ্টা করছিলাম, তখন ইসরাইল আমাদের ওপর হামলা চালায়। এটি ছিল অগ্রহণযোগ্য এবং নিন্দনীয়। মধ্যস্থতাকারীর ওপর হামলা চালানোর যে নজির এটি তৈরি করেছে, যুদ্ধের ইতিহাসে এমন ঘটনা আগে কখনো ঘটেনি।
ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ‘সীমা অতিক্রম করেছেন’ বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তার ভাষায়, এর আগেও তিনি যেসব সীমা অতিক্রম করেছেন, এবারও তিনি সেই সীমা অতিক্রম করেছেন। শেখ মোহাম্মদ বলেন, মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করা সহজ ছিল না। তবে তিনি বিশ্বাস করেন, অপ্রকাশ্য বা নীরব কূটনীতিই অগ্রগতি অর্জনের সবচেয়ে কার্যকর উপায়। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যেও কাতার মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করছে। ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল যুদ্ধ শুরুর পর পাকিস্তানের সঙ্গে যৌথভাবে এই মধ্যস্থতার কাজ করছে দোহা। শেখ মোহাম্মদ বলেন, আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি। কীভাবে একটি সমাধানে পৌঁছানো যায়, সে বিষয়ে মার্কিন সরকারকে সর্বোত্তম পরামর্শ দেয়ার চেষ্টা করছি। একইভাবে ইরানিদেরও পরামর্শ দিচ্ছি।
যুদ্ধের অবসান ঘটাতে তিনটি বিষয় সমাধান করা প্রয়োজন বলে মনে করেন কাতারের প্রধানমন্ত্রী। এর প্রথমটি হলো, তেহরানের শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক শক্তি ব্যবহারের অধিকার নিয়ে একটি চুক্তি এবং ইরানের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার। দ্বিতীয়টি হলো আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী হরমুজ প্রণালিতে নৌ চলাচলের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার বিষয়ে একটি সমঝোতা। তৃতীয়টি হলো আঞ্চলিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার সংস্কার। এর মধ্যে উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদ বা জিসিসির সদস্য দেশগুলো এবং ইরানকে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
শেষের বিষয়টি নিয়ে তিনি বলেন, ইরান ও জিসিসির মধ্যে সংলাপ এবং ভালো প্রতিবেশীসুলভ সম্পর্ক কেমন হওয়া উচিত, সে বিষয়ে নীতিমালা নির্ধারণ ছাড়া এটি সম্ভব হবে না। এর মধ্যে পরস্পরের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করা এবং একে অপরের বিরুদ্ধে আগ্রাসন না চালানো থাকতে হবে বলেও জানান তিনি। শেখ মোহাম্মদ আরও বলেন, যদি এ অঞ্চল পারস্পরিক স্বার্থের এমন একটি ক্ষেত্র তৈরি করতে পারে, যেখানে জ্বালানি, অর্থনীতি, বাণিজ্য ও ব্যবসার মতো ক্ষেত্রে আমরা একসঙ্গে কাজ করব, তাহলে তা এই অঞ্চলের সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর সুযোগ তৈরি করবে।
