বিশ্লেষণ: একের পর এক হামলা–ভাঙচুর, দখলের ঘটনায় বিব্রত সরকার

সহযোগীদের খবর

বিশ্লেষণ: একের পর এক হামলা–ভাঙচুর, দখলের ঘটনায় বিব্রত সরকার

ফন্ট সাইজ:

প্রথম আলো

‘বিশ্লেষণ: একের পর এক হামলা–ভাঙচুর, দখলের ঘটনায় বিব্রত সরকার’—এটি দৈনিক প্রথম আলোর প্রথম পাতার খবর। প্রতিবেদনে বলা হয়, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে জনমনে আগে থেকেই অস্বস্তি রয়েছে। এর মধ্যে একের পর এক হামলা, ভাঙচুর, দখল ও ভবন গুঁড়িয়ে দেওয়ার ঘটনা উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে। এসব ঘটনার কয়েকটিতে ক্ষমতাসীন বিএনপির স্থানীয় নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে। নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্বের কথা উল্লেখ করে সরকারের পক্ষ থেকেও দুঃখ প্রকাশ ও বিব্রত হওয়ার কথা জানানো হয়েছে।

মিরপুরের রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতে হামলা-ভাঙচুর নিয়ে গতকাল মঙ্গলবার সচিবালয়ে সংবাদ সম্মেলনে প্রশ্নের জবাব দেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান।

একজন সাংবাদিক প্রশ্ন করেন, রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতে হামলা-ভাঙচুরের ঘটনায় বিএনপির নাম এসেছে। এতে দলটির দুর্নাম-বদনাম হয়েছে, এ নিয়ে সরকার বিব্রত কি না। একই সঙ্গে গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের ভাড়াটে হিসেবে পাঠানো হয়েছিল এবং তাঁদের পাঠানোর সঙ্গে বিএনপির সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের যোগসূত্র থাকার অভিযোগ উঠেছে—এ বিষয়ে প্রকৃত তদন্ত হবে কি না, জবাবে জাহেদ উর রহমান বলেন, কোনো নাগরিকের অধিকার ক্ষুণ্ন হলে, তাঁর স্থাপনা ভাঙা হলে বা তিনি হামলার শিকার হলে সরকার প্রতিটি ঘটনায় দুঃখিত ও বিব্রত। তিনি বলেন, ‘কারণ, এই নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব সরকারের ছিল, বিব্রত এই অর্থে।’

এসব ঘটনায় ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়ে উপদেষ্টা জানান, তদন্তে আরও কারও জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া গেলে তাঁকেও আইনের আওতায় আনা হবে। তাঁর ভাষ্য, মানুষের মধ্যে এসব ঘটনার প্রভাব খুবই ভয়ংকর।

সরকার ও বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো নিয়ে তাঁদের মধ্যেও উদ্বেগ রয়েছে। জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে অসন্তোষ ও বিরোধী দলগুলোর ধারাবাহিক কর্মসূচির মধ্যে আইনশৃঙ্খলার এসব ঘটনা সরকারের জন্য বাড়তি চিন্তার কারণ হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে নিজ দলের স্থানীয় নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠায় তাঁদের নিয়ন্ত্রণের বিষয়টিও সামনে এসেছে।

গত বৃহস্পতিবার রাতে জায়গা দখলের উদ্দেশ্যে রাজধানীর মিরপুরে রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারের স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেওয়া ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে। মা ও শিশুস্বাস্থ্যসেবা দেওয়া প্রতিষ্ঠানটিতে হামলার ঘটনায় স্থানীয় বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত কয়েকজনের সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া গেছে। এ নিয়ে তুমুল সমালোচনার মধ্যেই শনিবার মধ্যরাতে ইসিবি এলাকায় নিউগিনি প্রোপার্টিজ আবাসন প্রকল্পে হামলা এবং সেখানে সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতে ভাঙচুর করা হয়।

গত শনিবার ভোরে রাজধানীর আদাবরের শ্যামলী হাউজিংয়ে একটি বহুতল ভবন দখলের চেষ্টার অভিযোগ ওঠে। একই দিন মোহাম্মদপুরের চাঁদ উদ্যানে কয়েক শ লোক একটি প্লটে ঢুকে ভাঙচুর করে টাকা ও যন্ত্রপাতি লুট করে বলে অভিযোগ। দুটি ঘটনায় সরকারি দলের স্থানীয় কয়েকজন নেতা-কর্মীর সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ উঠেছে।

গত সোমবার রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্র পরিদর্শনে গিয়ে জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান হামলাকারীদের শনাক্ত করতে না পারা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তাঁর বক্তব্য, বিপুলসংখ্যক মানুষ দীর্ঘ সময় ধরে হামলা চালানোর পরও জড়িত ব্যক্তিদের খুঁজে না পাওয়া রহস্যজনক। দলীয় পরিচয় বিবেচনা না করে অপরাধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে জমি ও বাড়ি দখল, হামলা এবং ভাঙচুরের এসব ঘটনা সরকারের ভাবমূর্তিকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। একই সঙ্গে ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় নেতা-কর্মীদের আচরণ ও তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে।

মাঠপর্যায়ের নেতা-কর্মীদের অবশ্য আগে থেকেই সতর্ক করে আসছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। বিএনপির সংসদীয় দল ও দলের অভ্যন্তরীণ একাধিক সভায় অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের বিষয়ে তিনি নেতা-কর্মীদের সতর্ক করেছেন। একাধিকবার হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, ‘সতর্ক না হলে কারও মুখ দেখা হবে না।’ কিন্তু সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোয় সেই সতর্কবার্তার কার্যকারিতা নিয়ে এখন প্রশ্ন উঠেছে।

সর্বশেষ গত রোববার সচিবালয়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও সমসাময়িক বিষয়ে এক ব্রিফিংয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটানোর যেকোনো অপচেষ্টা কঠোর হাতে দমন করা হবে। অপরাধীদের বিরুদ্ধে দলমত-নির্বিশেষে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘অপরাধীর কোনো রাজনৈতিক পরিচয় নেই। অপরাধী সে অপরাধীই।’

সরকারের এসব আশ্বাসের বাস্তবায়নই এখন গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে ক্ষমতাসীন দলের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠায় বিষয়টি আইনশৃঙ্খলা রক্ষার পাশাপাশি দলীয় শৃঙ্খলার প্রশ্নও সামনে এনেছে। অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া এবং নেতা-কর্মীদের এমন কর্মকাণ্ড থেকে নিবৃত্ত করা—দুই ক্ষেত্রেই কার্যকর পদক্ষেপের প্রয়োজন রয়েছে।

সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো নিয়ে উদ্বেগ ও আক্ষেপের কথা বলেছেন জাতীয় অধ্যাপক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক মাহবুব উল্লাহ। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, দীর্ঘ প্রায় ১৭ বছরে বিএনপির শীর্ষ নেতা থেকে মাঠপর্যায়ের নেতা-কর্মীরা গুম, খুন, জেলসহ নানা নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। চরম বৈরী পরিস্থিতিতেও ঐক্যবদ্ধ থেকে তাঁরা একটি সুসময়ের জন্য লড়াই করেছেন। সেই প্রত্যাশিত সুসময় এসেছে, দল এখন রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে। ফলে তাঁদের দায়িত্বও বিশাল। সরকারপ্রধান সে চেষ্টা করছেনও।

মাহবুব উল্লাহ বলেন, দুঃখজনকভাবে নেতা-কর্মীদের মধ্যে একধরনের আইন মেনে না চলার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। এটি বড় সমস্যা তৈরি করছে। এসব নেতা-কর্মীকে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড থেকে দূরে রাখা ও নিবৃত্ত করা দলের দায়িত্ব।

যুগান্তর

দৈনিক যুগান্তরের প্রধান শিরোনাম ‘তথ্যযুদ্ধে পিছিয়ে সরকার’। প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশে কোনো ঘটনা ঘটার সঙ্গেই দ্রুত সক্রিয় হয়ে ওঠে অপতথ্য (ন্যারেটিভ) উৎপাদনকারী সংঘবদ্ধ চক্র। উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বয়ান তৈরি করে ছড়িয়ে দেয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। ইউটিউবসহ বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে শেয়ার করে রিলস-ভিডিও। প্রকৃত তথ্য জানার আগেই এসব অপতথ্য বুঝে কিংবা না বুঝে বিশ্বাস করে ফেলেন সাধারণ মানুষ। যাচাই-বাছাইয়ের আগেই এসব বয়ান জায়গা পায় মূলধারার আলোচনায়। সেখান থেকেই তৈরি হয় নেতিবাচক জনমত। প্রতিষ্ঠিত হয় একটি নির্দিষ্ট ন্যারেটিভ। সত্য না হলেও তা স্থান করে নেয় মানুষের মনোজগতে।

সম্প্রতি কুমিল্লায় কিশোর অপ্রতিম হত্যাকে সাম্প্রদায়িক রূপ দেওয়ার চেষ্টা, মধুর ক্যান্টিনকে ‘ইশারাত মঞ্জিল’ দাবি করা, কিংবা প্রধানমন্ত্রীর নিউইয়র্ক সফর নিয়ে ভিসা নিষেধাজ্ঞার অপপ্রচার সাম্প্রতিক তথ্যযুদ্ধের ভয়ংকর উদাহরণ।

অথচ এই পুরো প্রক্রিয়ায় সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো থাকছে দর্শকের ভূমিকায় । ‘দেখি কী হয়’ ধরনের অপেক্ষায়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অবস্থাও একই। অপতথ্য ছড়িয়ে পড়ার পর শুরু হয় প্রতিক্রিয়া। আর পরিস্থিতি নেতিবাচক পথে গড়ানোর পর টকশোতে আলোচনা হয়-কেন সরকার ব্যর্থ হলো, কেন শুরুতেই প্রতিরোধ করা গেল না। ঘটনা, অপতথ্য ছড়ানো, জনমত তৈরি এবং পরে সরকারের রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া-প্রতিটি ধাপেই দৃশ্যমান হয় এক ধরনের নিষ্ক্রিয়তা।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই তথ্যযুদ্ধে পিছিয়ে রয়েছে সরকার। শুরুতেই সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তর থেকে ঘটনার প্রকৃত চিত্র, যাচাই করা তথ্য ও প্রয়োজনীয় ব্যাখ্যা জনসমক্ষে তুলে ধরা হলে অপতথ্য তৈরির সুযোগ অনেকটাই কমে যায়। দ্রুত ও তথ্যভিত্তিক সরকারি যোগাযোগই পারে একটি ঘটনা ঘিরে বিভ্রান্তি ছড়িয়ে পড়ার আগেই তা ঠেকাতে। এসব অপতথ্যের জবাব পালটা স্লোগান বা রাজনৈতিক বক্তব্য দিয়ে নয়; বরং দ্রুত, নির্ভুল ও প্রমাণনির্ভর তথ্য প্রকাশের মাধ্যমেই দেওয়া উচিত। এজন্য সরকারের একটি ডেডিকেটেড ফ্যাক্ট-চেকিং প্ল্যাটফর্মও থাকতে হবে।

ডিজিটাল ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ তানভীর হাসান জোহা যুগান্তরকে বলেন, এ ধরনের পরিস্থিতিতে সরকারের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হচ্ছে দ্রুত ও সমন্বিত তথ্য সরবরাহের ঘাটতি। কোনো ঘটনার প্রাথমিক তথ্য পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সংস্থা যদি যাচাই করা তথ্য প্রকাশ না করে-তাহলে অনুমান, গুজব ও রাজনৈতিক ব্যাখ্যা সেই শূন্যস্থান পূরণ করে। তিনি বলেন, সরকারের উচিত একটি ডেডিকেটেড ফ্যাক্ট-চেকিং প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা। যেখানে প্রযুক্তি ও মেশিন লার্নিংয়ের সহায়তায় ছড়িয়ে পড়া তথ্য যাচাই করে সত্য-মিথ্যার ব্যাখ্যা দেওয়া হবে। পাশাপাশি দক্ষ ও সঠিক ব্যক্তিদের সমন্বয়ে একটি কার্যকর টিম গড়ে তুলে দ্রুত সঠিক তথ্য মানুষের সামনে তুলে ধরা জরুরি।

তথ্য প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরী এ প্রসঙ্গে বলেন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সবার রয়েছে, সরকার এতে হস্তক্ষেপ করতে চায় না। তবে ভুল তথ্য ও অপতথ্যের বিস্তার রোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সব পক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে এমন একটি ব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে, যাতে মিসইনফরমেশন ও ডিজইনফরমেশনের বিস্তার রোধ করা যায়।

সামাজিক মাধ্যমে বয়ান শুধু তথ্যের প্রচার নয়, জনমত তৈরিরও হাতিয়ার। অনুসন্ধানে দেখা যায়, এটি ছড়ানোর পেছনে একাধিক স্তর কাজ করে। প্রথম ধাপে থাকে উৎস বা বয়ান উৎপাদক (রাজনৈতিক কর্মী, মতাদর্শিক গোষ্ঠী বা অজ্ঞাত অ্যাকাউন্ট)। দ্বিতীয় স্তরে থাকে ‘অ্যামপ্লিফায়ার’ (বড় পেজ, ইউটিউবার ও ইনফ্লুয়েন্সার); যারা একই বক্তব্যকে বড় সংখ্যক দর্শকের কাছে পৌঁছে দেয়। তৃতীয় স্তরে রাজনৈতিক নেটওয়ার্ক এটিকে রাজনৈতিক রূপ দেয়। চতুর্থ স্তরে তৈরি হয় রিলস, মিম ও ফটোকার্ড। সবশেষে মূলধারার গণমাধ্যম বা টকশোতে যাচাই ছাড়া এসব বিষয় আলোচনায় এলে তা ‘প্রতিষ্ঠিত সত্য’র আবহ তৈরি করে।

সম্প্রতি কুমিল্লার অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের পর সামাজিক মাধ্যমে তাকে হিন্দু পরিচয় দিয়ে ঘটনাটিকে সাম্প্রদায়িক রং দেওয়ার চেষ্টা করে একটি গোষ্ঠী। পতিত আওয়ামী লীগ সমর্থকদের বেশ কয়েকটি আইডি থেকেও এমন পোস্ট করা হয়। অথচ পুলিশের তদন্তে দেখা যায়, আইফোন ছিনতাইয়ের উদ্দেশ্যেই তাকে হত্যা করা হয়।

একইভাবে, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে যোগ দিতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নিউইয়র্ক সফর ঘিরেও ভিন্ন বয়ান তৈরি হয়। কয়েকজন ইউটিউবার দাবি করেন, নিউইয়র্কে জাতিসংঘের নির্ধারিত এলাকার বাইরে প্রধানমন্ত্রীর যাওয়ার সুযোগ নেই এবং তার ওপর যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন নিষেধাজ্ঞা বহাল রয়েছে। তবে সরকারি নথি বা যুক্তরাষ্ট্রের ভিসাসংক্রান্ত নিষেধাজ্ঞার তালিকায় এর কোনো সত্যতা মেলেনি; বরং প্রধানমন্ত্রী জাতিসংঘের বিভিন্ন কর্মসূচি, মার্কিন প্রেসিডেন্টের নৈশভোজসহ নানা আয়োজনে অংশ নেন। সরকারের পক্ষ থেকে দ্রুত কাউন্টার ন্যারেটিভ না থাকায় এই গুজবটি সহজেই ছড়িয়ে পড়ে।

এদিকে, কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ঘোষিত ‘ঢাকা লকডাউন’ কর্মসূচি ঘিরেও ছড়ানো হয় বিভ্রান্তিকর ভিডিও। ফ্যাক্ট-চেকিং প্রতিষ্ঠান রিউমর স্ক্যানার জানায়, ২০ সেপ্টেম্বরের কর্মসূচি ঘিরে অন্তত ১১টি পুরোনো ও ভিন্ন ঘটনার ভিডিও ছড়ানো হয়, যার একটি ছিল ২০২১ সালে ফেনীতে যুবলীগের একটি পুরোনো মিছিলের দৃশ্য। আরেকটি বিভ্রান্তিকর প্রচারণায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহ্যবাহী ‘মধুর ক্যান্টিন’কে নবাব পরিবারের ‘ইশারাত মঞ্জিল’ হিসাবে দাবি করা হয়, যা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন।

কালের কণ্ঠ

মামলায় ‘ভারাক্রান্ত’ আদালত—এটি দৈনিক কালের কণ্ঠের প্রধান শিরোনাম। খবরে বলা হয়, সোনালী ব্যাংকের কর্মী হরেন্দ্রনাথ চন্দ্রর বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে ১৯৮৫ সালে মামলা করে ওই সময়কার দুর্নীতি দমন ব্যুরো। বিচারিক আদালতের রায়ে হরেন্দ্রনাথকে খালাস দেওয়া হয়।

কিন্তু সোনালী ব্যাংক কর্তৃপক্ষ ১৯৮৮ সালে হরেন্দ্রনাথসহ আরো কয়েকজনের বিরুদ্ধে অর্থঋণ আদালতে মামলা করে। সেই মামলায় হরেন্দ্রনাথসহ সবাইকে দোষী সাব্যস্ত করে ১৬ লাখ ১৬ হাজার ১০০ টাকা ফেরত দেওয়ার নির্দেশ দেন বিচারিক আদালত। ১৯৯২ সালের ১৯ আগস্ট ওই রায়ের বিরুদ্ধে হরেন্দ্রনাথের আপিল মঞ্জুর করে ঢাকার যুগ্ম জেলা জজ আদালত বিচারিক আদালতের রায় বাতিল করেন। এই রায়ের বিরুদ্ধে সোনালী ব্যাংক ২০১৯ সালে হাইকোর্টে আপিল করে।

২০২২ সালের ২৯ আগস্ট আপিল খারিজ করে দেন হাইকোর্ট। ২০২৩ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে লিভ টু আপিল করে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ। সেই আবেদন খারিজ করে এবং হাইকোর্টের রায় বহাল রেখে ২০২৪ সালের ৯ ডিসেম্বর রায় দেন আপিল বিভাগ। এরপর সোনালী ব্যাংক কর্তৃপক্ষ এই রায়ের পুনর্বিবেচনা (রিভিউ) চেয়ে আবেদন করলে গত বছর ২৪ জুলাই আবেদনটি খারিজ করে দিয়ে মামলার খরচ বাবদ হরেন্দ্রনাথকে ২০ লাখ টাকা দিতে সোনালী ব্যাংককে নির্দেশ দেন সর্বোচ্চ আদালত। হরেন্দ্রনাথকে চূড়ান্ত বিচার পেতে এভাবে টানা চার দশক আইনি লড়াই করতে হয়েছে, তখন তিনি ৭৮ বছরের বৃদ্ধ।

আরেকটি ঘটনা এমন: এক যুগ আগে শেরপুরের নালিতাবাড়ীতে আদিবাসী শিশুকে ধর্ষণ ও হত্যার দায়ে কান্তি মারাককে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিলেন বিচারিক আদালত। সাত বছর পর চলতি বছরের ১ জুলাই সেই মৃত্যুদণ্ড বহাল রেখে রায় দেন হাইকোর্ট। পরে জানা যায়, পাঁচ বছর আগে ২০২১ সালের ১৬ জানুয়ারি কাশিমপুর কারাগারে মারা গেছে দণ্ডিত কান্তি মারাক। তার মৃত্যুর আনুষ্ঠানিক প্রমাণ মৃত্যু সনদ পাওয়ার পর রাষ্ট্রপক্ষ হাইকোর্টের রায় প্রত্যাহার ও মামলাটির সমাপ্তি চেয়ে আবেদন করে।

সেই আবেদনে গত ১২ আগস্ট হাইকোর্ট কান্তি মারাকের মৃত্যুদণ্ড বহালের রায় প্রত্যাহার করে মামলার কার্যক্রম সমাপ্ত ঘোষণা করেন। অধুনা এই ঘটনায় ফের আলোচনায় আসে—‘জাস্টিস ডিলেইড ইজ জাস্টিস ডিনাইড’। কিন্তু এটিই দেশের বিচারপ্রার্থী মানুষের জীবনের নির্মম বাস্তবতা। সুপ্রিম কোর্টের সর্বশেষ (চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ মার্চ) প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের আদালতগুলোতে ৪৭ লাখ ৯১ হাজার ৯২১টি মামলা বিচারাধীন। সরকারের হিসাবে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা ৪৬ লাখ ৩৯ হাজার ৪৭৬। এর মধ্যে অধস্তন আদালতে বিচারাধীন ৪০ লাখ ৭৮ হাজার ৪৩২টি মামলা। যশোর-৪ আসনের সংসদ সদস্য গোলাম রছুলের এক প্রশ্নে গত ৭ জুলাই আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান জাতীয় সংসদে এই তথ্য তুলে ধরেন।

আইনমন্ত্রী সেদিন আরো জানিয়েছিলেন, অধস্তন আদালতে বিচারাধীন ৪০ লাখ ৭৮ হাজার ৪৩২টি মামলার মধ্যে দেওয়ানি মামলা রয়েছে ১৬ লাখ ৯০ হাজার ৪৪৩টি, আর ২৩ লাখ ৮৭ হাজার ৯৮৯টি রয়েছে ফৌজদারি মামলা। তবে সুপ্রিম কোর্টের ত্রৈমাসিক প্রতিবেদন বলছে, ৪৭ লাখ ৯১ হাজার ৯২১টি বিচারাধীন মামলার মধ্যে অধস্তন আদালতে বিচারাধীন মামলা ৪০ লাখ ৭৮ হাজার ৪৩২টি, আর সুপ্রিম কোর্টে বিচারাধীন সাত লাখ ১৩ হাজার ৪৮৯টি মামলা। এর মধ্যে হাইকোর্টে ছয় লাখ ৭৪ হাজার ৫১৬টি এবং আপিল বিভাগে ৩৮ হাজার ৯৭৩টি মামলা বিচারাধীন।

এসবের মধ্যেও স্বস্তির খবর হলো, দেশের সর্বোচ্চ আদালতে মামলা নিষ্পত্তির গতি বেড়েছে। ফলে কমতে শুরু করেছে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ ও হাইকোর্ট বিভাগে জমে থাকা মামলা। প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী বিশেষ পদক্ষেপ গ্রহণ করায় মামলা নিষ্পত্তির গতি বাড়ে।

আইনজ্ঞরা বলছেন, প্রধান বিচারপতির বিশেষ পদক্ষেপে সর্বোচ্চ আদালতের মামলাজট কিছুটা কমলেও অধস্তন আদালতে যে বিশাল মামলাজট তৈরি হয়েছে, তা প্রচলিত বিচারব্যবস্থা দিয়ে নিরসন করা অসম্ভব। তাঁরা বলছেন, মহাপরিকল্পনা নেওয়া ছাড়া বিচার বিভাগকে মামলাজটমুক্ত করা যাবে না।

সমকাল

দৈনিক সমকালের প্রধান শিরোনাম ‘অপরাধে জড়ালে দলীয় পরিচয় দেখা হবে না’। প্রতিবেদনে বলা হয়, সরকার দলের নেতাকর্মী বা দলীয় পরিচয়ে যারা চাঁদাবাজি, দখল ও অপরাধমূলক কাজে জড়াচ্ছে, তাদের গ্রেপ্তারে পুলিশের শীর্ষ কর্মকর্তাদের মতামত নিতে হবে না। অপরাধে সম্পৃক্ত হলেই গ্রেপ্তার করা হবে; দলীয় পদ বা পরিচয় দেখা হবে না।

গতকাল মঙ্গলবার পুলিশ সদরদপ্তরে অপরাধ পর্যালোচনা সভা থেকে মাঠ পর্যায়ে এ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সভায় ডিআইজি, পুলিশ কমিশনার, ৬৪ জেলার এসপি পদমর্যাদার কর্মকর্তারা সশরীরে ও ভার্চুয়ালি যুক্ত ছিলেন। পুলিশের মহাপরিদর্শক মো. আলী হোসেন ফকির সভায় বক্তৃতা করেন। এতে সভাপতিত্ব করেন অতিরিক্ত আইজিপি (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন্স) মো. সায়েদুর রহমান।

সভায় জানানো হয়, জমি নিয়ে বিরোধ থাকলে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ভূমি অপরাধ প্রতিরোধ আইনে মামলা নেবে পুলিশ। এমন নির্দেশনা দিয়ে সোমবার সারাদেশে চিঠি পাঠানো হয়েছে।

অপরাধ নিয়ন্ত্রণে পুলিশের কুইক রেসপন্স টিমের (কিউআরটি) পরিধি বাড়ানো হয়েছে বলেও সভায় জানানো হয়। গতকাল সভায় উপস্থিত একাধিক সূত্র সমকালকে এসব তথ্য জানিয়েছে।

ঢাকার মিরপুরে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলা, লুটপাট এবং দেশের বিভিন্ন এলাকায় জমি-বাড়ি দখলচেষ্টা, কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা ও চলমান আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে পুলিশ সদরদপ্তরে অনুষ্ঠিত এ অপরাধ পর্যালোচনা সভা বিশেষ গুরুত্ব পায়।

অপরাধ করলেই গ্রেপ্তার

সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, সভা থেকে কর্মকর্তাদের অপরাধমূলক কাজে জড়িত ব্যক্তিদের তাৎক্ষণিক গ্রেপ্তার করতে বলা হয়েছে। এসব ক্ষেত্রে পুলিশের শীর্ষ কর্মকর্তাদের মতামত নিতে হবে না– এমন বার্তা দেওয়া হয়। তবে কোনো বিশেষ ঘটনায় যদি মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তারা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করার প্রয়োজন মনে করেন, তা দ্রুত করতে বলা হয়েছে।

সম্প্রতি রাজধানীর মিরপুরে রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টার গুঁড়িয়ে দেওয়ার ঘটনায় শাহ আলী থানার ওসি জানার পরও ব্যবস্থা নেননি। পুলিশের সামনে লুটের মালপত্র সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া ঢাকার আদাবর এলাকায় আটতলা একটি বাড়ি দখলের চেষ্টার সময় হামলা-ভাঙচুরের ঘটনায় জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ জানানোর প্রায় ৩ ঘণ্টা পর পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। সাম্প্রতিক এসব ঘটনা বিবেচনা করে এই নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

পুলিশ সদরদপ্তর জানায়, গতকালের বৈঠকে পুলিশ মহাপরিদর্শক আলী হোসেন ফকির বলেছেন, অপরাধীর একমাত্র পরিচয় অপরাধী। মাদক ব্যবসায়ী, সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজদের কঠোরভাবে আইনের আওতায় আনতে হবে। এ ক্ষেত্রে দলীয় পরিচয় বিবেচনার কোনো সুযোগ নেই। কিশোর অপরাধীদের বিরুদ্ধেও যথাযথ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

মাদকের বিরুদ্ধে পুলিশের শূন্য সহনশীলতার অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করে পুলিশপ্রধান বলেন, এ ক্ষেত্রে কমিউনিটি পুলিশিংয়ের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। তিনি আসন্ন দুর্গাপূজা শান্তিপূর্ণ, নিরাপদ ও নির্বিঘ্নে উদযাপনের লক্ষ্যে সার্বিক নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত করার জন্য মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেন।

সভায় অতিরিক্ত আইজিপি (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন্স) সায়েদুর রহমান বলেন, কিশোর গ্যাং সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করতে হবে। এদের পেছনে কোনো প্রভাবশালী রয়েছে কিনা, তা উদ্ঘাটন করে ব্যবস্থা নিতে হবে। তিনি দায়িত্ব পালনকালে পুলিশ সদস্যদের যথাযথভাবে বডি ওর্ন ক্যামেরা ব্যবহারের নির্দেশ দেন। মাঠ প্রশাসনের উদ্দেশে দায়িত্ব পালনে পেশাদারিত্ব বজায় রাখার জন্য পুলিশ সদস্যদের প্রতি আহ্বান জানান সায়েদুর রহমান।

জমির মামলা নেবে পুলিশ

জমি নিয়ে দখল-পাল্টা দখলের ঘটনায় সংঘাত, সহিসংতা ঘটছে। জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে প্রচলিত ফৌজদারি অপরাধের মামলা হয়। সংঘাত নিয়ন্ত্রণে এখন থেকে জমি-সংক্রান্ত অভিযোগ পেলে আগেভাগে ভূমি অপরাধ প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন প্রয়োগ করে ব্যবস্থা নিতে পুলিশের সব ইউনিটকে চিঠি দিয়েছে পুলিশ সদরদপ্তর।

২০২৩ সালে ভূমি অপরাধ প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইনটি পাস হয়। এর মূল উদ্দেশ্য নাগরিক, সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের ভূমির দখল ও অধিকার নিশ্চিত করা এবং ভূমি-সংক্রান্ত জালিয়াতি ও অবৈধ দখল রোধ করা। এই আইনের কিছু ধারার মধ্যে আছে অন্যের ভূমি নিজের বলে প্রচার করা, মালিকানার তথ্য গোপন করে সম্পত্তি হস্তান্তর করা, কিংবা মিথ্যা দলিল তৈরি করা। বৈধ খতিয়ান, রেজিস্ট্রিকৃত দলিল বা আদালতের আদেশ ছাড়া কোনো ভূমি জোরপূর্বক দখলে রাখা বা বৈধ দখলদারকে উচ্ছেদ করার চেষ্টা।

এই আইনের অধীনে সংঘটিত অপরাধগুলো আমলযোগ্য হওয়ায় সরাসরি থানায় মামলা বা এজাহার দায়ের করা যাবে। তবে আইনটি খুব একটা প্রয়োগ করে না পুলিশ। সম্প্রতি জমি, বাড়ি দখল ঘিরে বেশ কিছু সহিংস ঘটনার পর প্রয়োজন হলে এই আইনে মামলা নিতে বলা হয়েছে।

ইত্তেফাক

‘দখল ভাঙচুরে বিব্রত সরকার, অভ্যন্তরীণ তদন্তে বিএনপি’—এটি দৈনিক ইত্তেফাকের প্রধান শিরোনাম। প্রতিবেদনে বলা হয়, রাজধানীর মিরপুরে মা ও শিশুস্বাস্থ্য কেন্দ্র রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টার গুঁড়িয়ে দেওয়া এবং ইসিবি চত্বর এলাকায় জনপ্রিয় কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিও-কার্যালয়ে অতর্কিত হামলা ও ভাঙচুরসহ গত কয়েকদিনে দেশের বিভিন্ন স্থানে হামলা-ভাঙচুর-অবৈধ দখলের ঘটনায় বিব্রত সরকার। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যখন প্রতলিত রাজনীতি ও সরকার পরিচালনায় ইতিবাচক পরিবর্তন আনার চেষ্টা করছেন, তখন এসব ঘটনায় নিজ দলের নেতা-কর্মীদের জড়িত থাকার ঘটনায় সরকারের পাশাপাশি বিএনপিও বড় ধরনের অস্বস্তিতে পড়েছে।

বিভিন্ন স্থানে রাজনৈতিক ও পেশিশক্তির প্রভাব খাটিয়ে ভূমি ও বাড়ি দখল, খাসজমি দখল, হামলা ও চাঁদাবাজির এসব ঘটনায় দেশের বিশিষ্ট নাগরিক সমাজ গভীর উদ্বেগ ও ক্ষোভ জানিয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও ব্যাপক সমালোচনা চলছে। সাধারণ মানুষের মধ্যেও উদ্বেগ-ভীতি ছড়িয়েছে এসব ঘটনা। প্রতিটি ঘটনায় সংশ্লিষ্ট থানায় মামলা হয়েছে। অনেককে গ্রেপ্তারও করা হয়েছে। অভিযুক্ত অন্যদেরও ধরতে পুলিশ তত্পর।

বিএনপির দায়িত্বশীল একাধিক নেতা ইত্তেফাককে জানান, দলের শীর্ষ নেতৃত্বের নির্দেশে প্রতিটি ঘটনায় দলের কারা কারা জড়িত, কাদের ইন্ধন রয়েছে- এসব খতিয়ে দেখতে বিএনপি অভ্যন্তরীণভাবে তদন্ত করছে। তদন্তে যাদের সম্পৃক্ততা পাওয়া যাবে তাদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পাশাপাশি আইনি পদক্ষেপও নেওয়া হবে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে। এছাড়া, এসব কর্মকা্ল বন্ধে প্রয়োজনে দেশব্যাপী অভিযান পরিচালনার কথাও চিন্তা করা হচ্ছে।

প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার বিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান গতকাল মঙ্গলবার সচিবালয়ে সংবাদ ব্রিফিংয়ে সরকারের অবস্থান তুলে ধরে বলেছেন, দেশের সাম্প্রতিক বিভিন্ন স্থানে হামলা, ভাঙচুর ও অবৈধ দখলের ঘটনায় সরকার দুঃখিত এবং অবশ্যই বিব্রত। প্রতিটি ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের ভিত্তিতে জড়িতদের কঠোর আইনি প্রক্রিয়ার আওতায় আনা হবে এবং কোনো ছাড় দেওয়া হবে না।

বিশেষ করে, ‘রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টার’ নামের প্রাচীন স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে মধ্যরাতে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা সরকারকে বেশি বিব্রতকর পরিস্থিতিতে ফেলেছে। এই ঘটনার সঙ্গে বিএনপির স্থানীয় প্রভাবশালী মহলের জড়িত থাকার অভিযোগ তদন্ত করছে পুলিশ। স্বাস্থ্যমন্ত্রী ও শ্রমমন্ত্রীসহ বিএনপির স্থানীয় শীর্ষ নেতারা ইতোমধ্যে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের আশ্বাস দিয়েছেন তারা। প্রশাসনের সহযোগিতায় সেখানে টিকা কার্যক্রম অব্যাহত রাখা হয়েছে। এছাড়া, স্থাপনা মেরামতের কাজও ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে।

ঢাকার ইসিবি চত্বরে কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের ‘ব্রাউনফিশ স্টুডিও’-তে হামলা, লুটপাট ও ভাঙচুরের ঘটনাটিকেও গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছে সরকার। সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের নির্দেশে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে শুরু করেছে। মোহাম্মদপুরের চাঁদ উদ্যান এলাকা এবং আদাবরের শেখেরটেকে জমি ও বাড়ি দখলকে কেন্দ্র করে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ ও ভাঙচুরের ঘটনায়ও ইতোমধ্যে বেশ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টার গুঁড়িয়ে দেওয়ার ঘটনায় হামলাকারীদের জড়ো করা, দেশীয় অস্ত্র ও সরঞ্জাম সরবরাহ এবং এক্সক্যাভেটর আনার সঙ্গে যুক্ত বিএনপির স্থানীয় কয়েকজনের ব্যাপারে ইতোমধ্যে তথ্য পাওয়া গেছে। স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি গুঁড়িয়ে দেওয়ার পর সেখানে ‘সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতি লিমিটেড’ নামের সাইনবোর্ড ও ব্যানার টাঙিয়ে দেয় হামলাকারীরা। এই সমিতির কার্যক্রমের সঙ্গেও স্থানীয় বিএনপির কয়েকজন নেতার সম্পৃক্ততার তথ্য উঠে এসেছে। তারা বিএনপির সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টির ঘনিষ্ঠ হিসেবে এলাকায় পরিচিত। যদিও শুরু থেকেই ফেরদৌসী আহমেদ এই হামলার ঘটনায় জড়িত নন বলে দাবি করেছেন।

চারদিন ধরে দেশব্যাপী আলোচিত এই ঘটনায় এখন পর্যন্ত ১০ জনের বেশি ব্যক্তিতে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। এই ঘটনায় নিষ্ক্রিয়তা ও দায়িত্বে অবহেলার প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়ায় রবিবার শাহ আলী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জাহাঙ্গীর আলমকে প্রত্যাহার করা হয়েছে।

অভিযোগ উঠেছে, বৃহস্পতিবার মধ্যরাতে এই স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলার আগে জড়িতদের অনেকে শাহ আলী থানা ছাত্রদলের সাবেক আহ্বায়ক আবুল কালাম আজাদ ওরফে লেলিন এবং এজাহারভুক্ত আসামি বিএনপি নেতা হানিফ মিয়ার কার্যালয়ের সামনে জড়ো হন। পরে তারা সেখান থেকে রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলা করতে যান। হামলা ও ভাঙচুরের সময় হানিফ মিয়া, আবুল কালাম এবং ঢাকা মহানগর যুবদলের সাবেক সদস্যসচিব মোস্তফা জগলুল পাশা ওরফে পাপেলসহ আরো কয়েকজন একটি সাদা মাইক্রোবাসে ঘটনাস্থলের আশপাশে ঘুরে নির্দেশনা দেন বলেও প্রাথমিক তথ্যে জানা গেছে। জানা গেছে, ঘটনাস্থলে ভাঙচুর ও লুটপাটের নেতৃত্ব দেন শাহ আলী থানা ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আওলাদ হোসেন ওরফে নাডা আওলাদ এবং ৯৩ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক মো. ইলিয়াস। ভাঙচুরে ব্যবহূত এক্সক্যাভেটর জোগাড় করেন শাহ আলী থানা ছাত্রদলের সাবেক যুগ্ম সম্পাদক মারুফ। হানিফ মিয়া, আবুল কালাম ও মোস্তফা জগলুল পাশা তিনজনই সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টির ঘনিষ্ঠ হিসেবে এলাকায় পরিচিত।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, দেশের বিভিন্ন স্থানে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা ও দখলবাজি শাসক দল ও সরকারের ভাবমূর্তিকে সংকটে ফেলছে। বিএনপি সূত্রে জানা গেছে, অপরাধীদের রাজনৈতিক পরিচয় যাই হোক না কেন, সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে স্বাধীনভাবে তদন্ত করে আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

নয়া দিগন্ত

দৈনিক নয়া দিগন্তের প্রধান শিরোনাম ‘রাতের ঢাকা ভয়ঙ্কর’। প্রতিবেদনে বলা হয়, গত রোববার রাত সাড়ে ১০টা। রাজধানীর দোলাইরপাড় চৌরাস্তা থেকে পোস্তগোলা সেতু পর্যন্ত দীর্ঘ যানজট। এক্সপ্রেসওয়ের মুখে থেমে আছে শত শত যানবাহন। ট্রাক, বাস, মিনিবাস, কাভার্ডভ্যান, প্রাইভেট কার ও মাইক্রোবাসের দীর্ঘ সারি। যানজটে আটকে থাকা গাড়িগুলোর ওপর তখন রাতের অন্ধকার। রোড লাইটের আবছা আলোয় হঠাৎ দেখা গেল, একদল কিশোর-তরুণ এক্সপ্রেসওয়ের রোড ডিভাইডার টপকে দ্রুত নেমে আসছে। কারও হাতে ছোট রড, কারও হাতে ছুরি বা চাকুসদৃশ অস্ত্র। কিছু বুঝে ওঠার আগেই তারা ছুটে যাচ্ছে একেকটি গাড়ির দিকে। প্রাইভেটকারের দরজা টানছে, বনেটে হাত দিয়ে থাবা দিচ্ছে। ট্রাক ও কাভার্ডভ্যানের পেছনের ত্রিপল ও রশি কাটার চেষ্টা করছে কেউ কেউ। আবার কয়েকজন কোনো একটি গাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে নিজেরাই ঝগড়া বাঁধানোর ভান করছে। মুহূর্তেই আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে গাড়িগুলোর ভেতরে থাকা যাত্রীদের মধ্যে।

প্রাইভেটকার ও মাইক্রোবাসের চালকরা দ্রুত দরজা-জানালা লক করে দিচ্ছেন। কেউ কেউ গাড়ির আলো পর্যন্ত নিভিয়ে দিচ্ছেন। প্রচণ্ড গরমের মধ্যেও ট্রাকচালকরা গ্লাস তুলে দিয়ে দরজা বন্ধ করে বসে থাকেন। যেসব বাস ও ট্রাকে যাত্রী বেশি, সেসব গাড়ির পুরুষ যাত্রীরা মোটা বেতের লাঠি হাতে গাড়ির সামনে অবস্থান নিচ্ছেন। আর নারী ও শিশুসহ কমসংখ্যক যাত্রী থাকা গাড়িগুলোতে আতঙ্ক আরো বেশি। অনেকেই দরজা-জানালা বন্ধ করে দোয়া পড়তে শুরু করেন। প্রশ্ন একটাই-‘জ্যাম ছাড়ছে না কেন?’

শুধু দোলাইরপাড় নয়, রাত নামলেই রাজধানীর বিভিন্ন সড়ক ও আবাসিক এলাকায় নিরাপত্তাহীনতার এমন চিত্র নিয়ে অভিযোগ বাড়ছে। ছিনতাই, চাঁদাবাজি, কিশোর গ্যাং, টানাপার্টি ও থাবাপার্টির তৎপরতার পাশাপাশি হামলা, ভাঙচুর ও দখলের অভিযোগও সামনে আসছে। মোহাম্মদপুর-আদাবর থেকে ধানমন্ডি, গুলশান, বনানী, মিরপুর ও যাত্রাবাড়ী- বিভিন্ন এলাকায় রাতের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

সাম্প্রতিক সময়ে ইসিবি চত্বরের নিউ গিনি প্রোপার্টিজে হামলা-ভাঙচুর ও দখলচেষ্টার অভিযোগ, মিরপুরের রাড্ডা ক্লিনিকে হামলা, মোহাম্মদপুরের চাঁদ উদ্যান এবং আদাবরের শ্যামলী হাউজিং এলাকায় সংঘর্ষ ও দখলচেষ্টার অভিযোগ- এসব ঘটনায় রাজধানীর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। গত সোমবার রাতেও আদাবরে পুলিশের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে। পুলিশ গুলি চালালে রাজিব হাওলাদার (৩০) ও সাগর (২৪) নামে দু’জন আহত হন।

যানজটকে ‘সুযোগ’ হিসেবে নিচ্ছে অপরাধীরা

রোববারের ঘটনার রাতে দোলাইরপাড় এলাকায় ঘুরে দেখা যায়, দক্ষিণাঞ্চল থেকে আসা দূরপাল্লার যানবাহনের বড় অংশ পদ্মা সেতু হয়ে এক্সপ্রেসওয়ে দিয়ে দ্রুত ঢাকায় প্রবেশ করলেও ধোলাইরপাড় চৌরাস্তায় এসে দীর্ঘ সময় আটকে পড়ছে। সন্ধ্যার পর থেকে শুরু হওয়া এ যানজট অনেক সময় পোস্তগোলা সেতু পর্যন্ত পৌঁছে যায়। দীর্ঘ সময় একই স্থানে দাঁড়িয়ে থাকা শত শত গাড়িই তখন দুর্বৃত্তদের টার্গেটে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি করে।

গাড়ির সারির মধ্যে কয়েকজনকে ট্রাকের সামনে ও পেছনে মোটা বেতের লাঠি হাতে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। খুলনার তেরোখাদা থেকে সবজি নিয়ে যাত্রাবাড়ী যাচ্ছিলেন আল আমিন। তিনি বলেন, প্রায় প্রতিদিনই সন্ধ্যার পর ধোলাইরপাড়ে যানজটের মধ্যে তাদের এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়।
তার ভাষায়, ‘এক্সপ্রেসওয়ের ডিভাইডার টপকে ২০ থেকে ৫০ জন পর্যন্ত কিশোর-তরুণ নেমে আসে। তাদের হাতে রড, চাকুসহ বিভিন্ন ধরনের অস্ত্র থাকে। তারা নানা ধরনের সুযোগ খুঁজতে থাকে। গাড়ির দরজা ভেতর থেকে বন্ধ না থাকলে টেনে খুলে টাকা, মোবাইলসহ মূল্যবান জিনিস নিয়ে যায়। ট্রাকের রশি ও ত্রিপল কেটে পেছন থেকে মালামাল নেয়ার চেষ্টা করে।’ আল আমিন বলেন, ‘কিছু বলতে গেলে সংঘবদ্ধভাবে হামলা চালায়। গাড়ির গ্লাস ভেঙে ফেলে। সবজি নষ্ট করে দিতে পারে- এ আশঙ্কায় কয়েকজন পুরুষ লাঠি হাতে গাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে থাকি। আমরা কয়েকজন একসাথে থাকলে তারা হয়তো এগিয়ে আসে না। কিন্তু সংঘবদ্ধভাবে হামলা করলে আমাদের রক্ষা করার কেউ থাকবে কি না, সেটাই বড় প্রশ্ন।’

গ্রেফতার হচ্ছে, ফিরছে আবার

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য, রাজধানীতে বিভিন্ন অপরাধের ঘটনায় নিয়মিত অভিযান চালিয়ে সন্দেহভাজন ও অভিযুক্তদের গ্রেফতার করা হচ্ছে। কিন্তু গ্রেফতার হওয়া অনেকেই আইনি প্রক্রিয়ায় জামিনে বেরিয়ে আবার অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
ফলে শুধু মাঠপর্যায়ের ছিনতাইকারী, চাঁদাবাজ বা কিশোর গ্যাং সদস্যদের গ্রেফতার করে পরিস্থিতির স্থায়ী উন্নতি সম্ভব হচ্ছে না বলে মনে করছেন অপরাধ বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, অপরাধের পেছনে থাকা অর্থদাতা, আশ্রয়দাতা, সংগঠক ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা না গেলে একই চক্রের নতুন সদস্যরা আবার মাঠে নামবে।

অপারেশন ডেভিল হান্ট ফেজ-২ চলমান থাকার মধ্যেও রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় সংঘটিত এসব ঘটনায় নাগরিকদের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতার অনুভূতি বাড়ছে। কখন কার জমি, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, ক্লিনিক বা বাড়িতে অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে হামলা হয়- এমন আশঙ্কা তৈরি হয়েছে অনেকের মধ্যে। এ পরিস্থিতিতে চাঁদাবাজ, মাদক কারবারি ও কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে নতুন করে কঠোর অভিযান চালানোর বিষয়টি সরকারের বিবেচনায় রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। তবে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্তের বিস্তারিত এখনো প্রকাশ্যে আসেনি।
‘অপরাধের মূল জায়গায় পৌঁছাতে হবে’

মানবাধিকার সংগঠন অধিকারের পরিচালক এ এস এম নাসির উদ্দিন এলান নয়া দিগন্তকে বলেন, অপরাধের মূল উৎপাটন করতে না পারার কারণেই আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসছে না। তিনি বলেন, ‘পুলিশ মাঠপর্যায়ের অনেক অপরাধীকে গ্রেফতার করছে। কিন্তু অপরাধের মূল জায়গায় পৌঁছাতে পারছে না। ফলে যারা নেপথ্যে থাকে, তারা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে।’

রাড্ডা ক্লিনিকে হামলার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ওই ঘটনায় একজন সংসদ সদস্যের নাম আলোচনায় এলেও তাকে গ্রেফতার করা হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। পুলিশ মূলত ভাড়ায় আনা লোকজনকে গ্রেফতার করছে- এমন অভিযোগও রয়েছে। জামিন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘জামিন একজন মানুষের অধিকার। তবে এ ধরনের অপরাধ কমাতে হলে ফৌজদারি বিচারব্যবস্থায় অপরাধের ধরন অনুযায়ী আইনি কাঠামো আরো কার্যকর করা প্রয়োজন। যাতে গুরুতর অপরাধের ক্ষেত্রে আইনের ফাঁকফোকর ব্যবহার করে অপরাধীরা দ্রুত ফিরে এসে একই কাজে যুক্ত হতে না পারে।’

পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন

মানবাধিকারকর্মী নুর খান নয়া দিগন্তকে বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে পুলিশের সামনে সংঘটিত কয়েকটি ঘটনা দেখে সাধারণ মানুষের মধ্যে পুলিশের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। তার অভিযোগ, ‘পুলিশকে অনেক সময় স্বাধীনভাবে কাজ করতে দেয়া হচ্ছে না। প্রভাবশালী মহলের মদদে সংঘটিত অপরাধের ক্ষেত্রে পুলিশের ভূমিকা দুর্বল হয়ে পড়ে। অতীতেও এ ধরনের প্রবণতা দেখা গেছে।’ তিনি বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে হলে অপরাধী যে পরিচয়েরই হোক না কেন, তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।

‘অপরাধীরা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দুর্বলতা খোঁজে’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান মো: রেজাউল করিম সোহাগ বলেন, অপরাধ সংঘটনের ক্ষেত্রে ‘টাইম’ ও ‘প্লেস’ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অপরাধীরা সবসময় সম্ভাব্য টার্গেট খুঁজতে থাকে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতি বা তৎপরতা তুলনামূলক কম দেখলেই তারা সেখানে সক্রিয় হয়ে ওঠে।
তিনি নয়া দিগন্তকে বলেন, ‘বর্তমান সময়ে রাতে অপরাধের প্রবণতা বেশি দৃশ্যমান হচ্ছে। তবে শুধু রাতেই নয়, বিভিন্ন লোকেশনে অপরাধের ধরন ও বিস্তৃতি বেড়েছে।’

তার মতে, অপরাধ দমনে পুলিশকে প্রতিক্রিয়াশীল (রিঅ্যাকটিভ) ব্যবস্থার পাশাপাশি আরো সক্রিয় (প্রো-অ্যাকটিভ) ভূমিকা নিতে হবে। ‘পুলিশ যে পরিমাণ রিঅ্যাকটিভ ও প্রো-অ্যাকটিভভাবে কাজ করার কথা ছিল, সেখানে ঘাটতি রয়েছে। ফলে অপরাধীরা আরো আক্রমণাত্মক হয়ে উঠছে।’ সমাধানের পথ হিসেবে তিনি বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, বিচারব্যবস্থা ও কারা ব্যবস্থাকে সমন্বিত কাঠামোর মধ্যে আনতে হবে। অপরাধী গ্রেফতার, তদন্ত, বিচার এবং সাজা কার্যকর- প্রতিটি ধাপের মধ্যে সমন্বয় না থাকলে অপরাধ দমনের স্থায়ী ফল পাওয়া কঠিন।

বণিক বার্তা

‘সরকারের নানা উদ্যোগ সত্ত্বেও বিদেশে কর্মী যাওয়া কমেছে প্রায় ৩৩ শতাংশ’—এটি দৈনিক বণিক বার্তার প্রধান শিরোনাম। খবরে বলা হয়, বাংলাদেশ থেকে আগামী ছয় মাসে দুই লাখ কর্মী নেবে মালয়েশিয়া—এমন একটি খবরকে বাংলাদেশ সরকারের আনুষ্ঠানিক অবস্থান নয় বলে চলতি মাসের শুরুর দিকে জানিয়েছেন মালয়েশিয়া সরকারের মুখপাত্র ও যোগাযোগমন্ত্রী ফাহমি ফাদজিল।

দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকা মালয়েশিয়া ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের শ্রমবাজার উন্মুক্ত করতে সরকার একের পর এক উদ্যোগ নিয়েছে। কিন্তু এখনো কার্যকর অগ্রগতি হয়নি। মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধ বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শ্রমবাজারগুলোয় অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। সৌদি আরব, কাতার ও কুয়েতে কমেছে কর্মী গমন। সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে বলা হয়েছিল জাপানে যাবে লাখো কর্মী। সে রকম কিছু বাস্তবায়নের লক্ষণও দেখা যাচ্ছে না। চলতি বছরের প্রথম নয় মাসে (জানুয়ারি থেকে ২৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত) বিদেশে কর্মী গমন আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৩৩ শতাংশ কমেছে।

আগামী পাঁচ বছরে এক কোটি কর্মী বিদেশে পাঠানোর লক্ষ্য রয়েছে বর্তমান সরকারের। জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্য বলছে, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রায় নয় মাসে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ৮ লাখ ৩৮ হাজার ৮৯৪ জন কর্মী কর্মসংস্থানের উদ্দেশ্যে গিয়েছিলেন। কিন্তু চলতি বছরের একই সময়ে সংখ্যাটি ৫ লাখ ৬৩ হাজার ৬৯৩-এ নেমে এসেছে। সে হিসাবে গত বছরের তুলনায় চলতি বছরের নয় মাসে বিদেশে ২ লাখ ৭৫ হাজার ২০১ জন কর্মী কম গিয়েছেন।

২০১৩ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে মালয়েশিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরাত, লিবিয়া, বাহরাইন, ওমানসহ গুরুত্বপূর্ণ ছয়টি বাজার বন্ধ হয়ে যায়। মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে বিদেশী কর্মীর উৎস দেশ হিসেবে বর্তমানে শীর্ষে রয়েছে বাংলাদেশ। দেশটির মোট বিদেশী শ্রমশক্তির প্রায় ৩৭ শতাংশই বাংলাদেশী। এ গুরুত্বপূর্ণ শ্রমবাজার ২০২৪ সালের ৩১ মে বন্ধ হয়ে যায়। এরপর অন্তর্বর্তী সরকার চেষ্টা করেও এ বাজার উন্মুক্ত করতে পারেনি। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় এসে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার উন্মুক্ত করতে বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে। গত ২৮ আগস্ট প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, ‘শিগগিরই মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশীদের কর্মসংস্থানের দুয়ার খুলে যাচ্ছে।’ কিন্তু মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার চালুর বিষয়ে এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো ঘোষণা দেয়নি মন্ত্রণালয়। বাজারটি কবে কার্যকরভাবে খুলবে সে বিষয়ে এখনো স্পষ্ট কোনো রূপরেখা পাওয়া যায়নি।

বাংলাদেশ থেকে আগামী ছয় মাসে দুই লাখ কর্মী নেবে মালয়েশিয়া—এমন একটি খবরকে বাংলাদেশ সরকারের আনুষ্ঠানিক অবস্থান নয় বলে চলতি মাসের শুরুর দিকে জানিয়েছেন মালয়েশিয়া সরকারের মুখপাত্র ও যোগাযোগমন্ত্রী ফাহমি ফাদজিল। মালয়েশিয়ার পুত্রজায়ায় মন্ত্রিসভার বৈঠকের পর এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ কথা বলেন।

অন্যদিকে আগামী পাঁচ বছরের জাতীয় উন্নয়ন পরিকল্পনা ‘থার্টিন্থ মালয়েশিয়া প্ল্যান ২০২৬-৩০’ অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে বিদেশী শ্রমিকের অংশগ্রহণ ১০ শতাংশে এবং ২০৩৫ সালে ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে দেশটি। তাই স্বাভাবিকভাবেই দেশটির শ্রমবাজার চালু হলেও কী পরিমাণ কর্মী যাওয়ার সুযোগ হবে তা নিয়ে সংশয় রয়েছে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস গত বছর ২৫ মে জাপান সফরে গিয়ে ঘোষণায় বলেছিলেন, আগামী পাঁচ বছরে বাংলাদেশ থেকে অন্তত এক লাখ শ্রমিক নেবে জাপানি কর্তৃপক্ষ ও ব্যবসায়ীরা। যদিও ২০২৫ সালে দেশটিতে মোট কর্মী গেছেন ১ হাজার ৫৬৪ জন। আর চলতি বছর প্রথম নয় মাসে ১ হাজার ৬০৮ জন।

ফেব্রুয়ারিতে মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকেই সৌদি আরব, কুয়েত ও কাতারের মতো উপসাগরীয় দেশগুলোতে কর্মীর চাহিদা বিপুলভাবে কমে গেছে। এ চাহিদা ৫ শতাংশ থেকে নেমে প্রায় শূন্যের কোঠায় পৌঁছেছে বলে জানা যায়। এ পরিস্থিতির বড় প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশী কর্মী গমনেও।

বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শ্রমবাজার সৌদি আরবে কর্মী গমনের হার উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাওয়াতে বিদেশে কর্মী গমনে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। ২০২৫ সালের প্রথম নয় মাসে সৌদি আরবে ৫ লাখ ৬৮ হাজার ৮৩ জন কর্মী গেলেও চলতি বছর তা কমে দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ৭ হাজার ৮৮৭ জনে। দেশের প্রধান এ শ্রমবাজারে গত বছরের তুলনায় কর্মী গমন ৪৫ দশমিক ৮০ শতাংশ কমেছে।

একসময় বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম শ্রমবাজার ছিল সংযুক্ত আরব আমিরাত। তবে ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানের সময় প্রবাসী বাংলাদেশীদের বিক্ষোভের পর বাংলাদেশীদের ভিজিট ও কর্মী ভিসা বন্ধ হয়ে যায়। সম্প্রতি কোনো পূর্ব ঘোষণা ছাড়াই ছুটিতে দেশে আসা কয়েক হাজার প্রবাসী বাংলাদেশীর ভিসা বাতিল করেছে সংযুক্ত আরব আমিরাত। প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ভিসা বাতিল হওয়া এ বাংলাদেশীর সংখ্যা ৪ হাজার ৮০০।

বর্তমানে চার লাখেরও বেশি বাংলাদেশী কর্মী কাতারে কাজ করছেন। ২০২০ সালে বাংলাদেশের শ্রমিকরা দক্ষ নয় এমন অভিযোগে কর্মী নেয়া একেবারেই বন্ধ করে দেয় কাতার। বন্ধ হওয়ার কয়েক মাস পর চালু হলেও শেষ পাঁচ বছরের মধ্যে গত বছর প্রথম নয় মাসে ৮০ হাজার ৫৭০ জন কর্মী দেশটিতে যান। তবে চলতি বছরে সে সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে ৪৯ হাজার ৭৭৯ জনে। একসময় দেশটিতে বছরে লাখের বেশি কর্মী যাওয়ার রেকর্ডও ছিল।

চলতি বছর মে মাসে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরীর সঙ্গে বৈঠকে কাতারের শ্রমমন্ত্রী ড. আলী বিন সাঈদ বিন সামিখ আল মাররি বাংলাদেশ থেকে কয়েকটি খাতে কর্মী নিতে বিশেষ আগ্রহ প্রকাশ করেন। তবে বৈঠকের পর গত চার মাসে দেশটিতে কর্মী প্রেরণের হারে উল্লেখযোগ্য কোনো পরিবর্তন আসেনি।
​
আজকের পত্রিকা


দৈনিক আজকের পত্রিকার প্রধান শিরোনাম ‘বিনা মূল্যের পাঠ্যবই: বইয়ের মানে এবারও শঙ্কা’। প্রতিবেদনে বলা হয়, আগামী বছরের বিনা মূল্যের পাঠ্যবইয়ের মান নিয়ে শঙ্কা এবারও পুরোপুরি কাটছে না। দরপত্রের শর্তের চেয়ে পাঠ্যবইয়ে কম মানের জিএসএমের কাগজ ও নিম্নমানের কালি ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। কোথাও কোথাও বাঁধাইয়েও ত্রুটি ধরা পড়েছে। পাঠ্যপুস্তক ছাপানো ও বিতরণের দায়িত্বে থাকা জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) সূত্রেই এসব তথ্য জানা গেছে।

এনসিটিবি সূত্র বলেছে, নিম্নমানের জন্য ইতিমধ্যে কিছু ব্যবস্থাও নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে নিম্নমানের কাগজ ও ছাপার কারণে এখন পর্যন্ত প্রায় ৭ লাখ ফর্মা বাতিল করা হয়েছে। এসব অনিয়মের অভিযোগে অন্তত ১৪টি মুদ্রণ প্রতিষ্ঠানকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে বইয়ের মান যাচাইয়ের দায়িত্বে থাকা ইনডিপেনডেন্ট ইন্সপেকশন সার্ভিসেস বিডিকেও কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে।

বই ছাপার মান ও সার্বিক অবস্থা জানতে গত সোমবার দিবাগত রাত ১২টার দিকে শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন রাজধানীর ছয়টি ছাপাখানা পরিদর্শন করেন। এ সময় তিনি বইয়ের গুণগত মান ও ছাপার কাজের অগ্রগতি যাচাই করেন।

সূত্র বলেছে, প্রাথমিক স্তরের পাঠ্যবইয়ে ৮০ জিএসএম এবং মাধ্যমিক স্তরের পাঠ্যবইয়ে ৭০ জিএসএম কাগজ ব্যবহারের শর্ত রয়েছে দরপত্রে। কিন্তু কিছু ছাপাখানায় এর চেয়ে কম জিএসএমের কাগজে বই ছাপার অভিযোগ উঠেছে। ব্যবহৃত কালি ও বাঁধাই নিয়ে উঠেছে অভিযোগ। বিনা মূল্যের পাঠ্যবই ছাপা নিয়ে প্রতিবছরই বিভিন্ন অভিযোগ ওঠে।

এনসিটিবির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, পাঠ্যবইয়ের মান বজায় রাখার বিষয়ে এবার সরকার কঠোর অবস্থানে রয়েছে। এ কারণে পরিদর্শনে অনিয়ম ধরা পড়লে সংশ্লিষ্ট মুদ্রণ প্রতিষ্ঠানের কাগজের ফর্মা বাতিল করা হচ্ছে। একই সঙ্গে ছাপাখানা কর্তৃপক্ষের কাছে ব্যাখ্যাও চাওয়া হচ্ছে।

জানতে চাইলে এনসিটিবির চেয়ারম্যান অধ্যাপক মোহাম্মদ ফখরুল মাওলা বলেন, ‘রোডম্যাপ অনুযায়ী বই ছাপার কাজ এগিয়ে চলছে। এতে কোনো রকম ব্যত্যয় পেলেই আমরা ব্যবস্থা নিচ্ছি। ইতিমধ্যে অনেক প্রতিষ্ঠানকে শোকজ করা হয়েছে। ফর্মার মান খারাপ পেলে সঙ্গে সঙ্গেই কেটে দেওয়া হচ্ছে।’

আগামী শিক্ষাবর্ষের জন্য প্রাক্-প্রাথমিক থেকে নবম শ্রেণি পর্যন্ত প্রায় ৩১ কোটি বই ছাপা হবে। এর মধ্যে মাধ্যমিক স্তরে ২২ কোটির বেশি এবং প্রাথমিক স্তরে প্রায় ৮ কোটি ২০ লাখ বই। বিনা মূল্যের এসব পাঠ্যবই ছাপায় সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ১ হাজার ৮৭৯ কোটি টাকা। এবার প্রাথমিক ও মাধ্যমিকের বই ছাপা চলছে ১৩৩টি ছাপাখানায়। এসব ছাপাখানার সিংহভাগ রাজধানী ঢাকার মাতুয়াইলে। এ ছাড়া নারায়ণগঞ্জ, নোয়াখালী ও বগুড়াতেও পাঠ্যবই ছাপার কাজ চলছে।

এনসিটিবির হিসাবে, ২৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রাক্-প্রাথমিকের ৮৫ শতাংশ বই ছাপা শেষ হয়েছে। এর মধ্যে প্রাক্-সরবরাহ পরিদর্শন (পিডিআই) হয়েছে ৬২ শতাংশের। প্রাথমিকের বই ছাপা শেষ হয়েছে ৫২ শতাংশ, পিডিআই হয়েছে ২৪ শতাংশের। মাধ্যমিকের বই ছাপা শেষ হয়েছে ১৪ শতাংশ এবং পিডিআই হয়েছে মাত্র ৪ শতাংশের।

এনসিটিবির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, অননুমোদিত ও নিম্নমানের কাগজে বই ছাপার কারণেই বেশি শোকজ করা হচ্ছে। এর বাইরে ছাপা ও বাঁধাইয়ে ত্রুটি এবং নির্ধারিত সময়ে কাজ শুরু না করার অভিযোগও রয়েছে।

কর্মকর্তাদের ভাষ্য, এবার অনিয়মের বড় জায়গা কাগজ ও কালির মান। পাঠ্যবইয়ের জন্য দরপত্রে নির্দিষ্ট জিএসএমের কাগজের কথা বলা হলেও তা মানছে না অধিকাংশ মুদ্রণ প্রতিষ্ঠান। অনেক মুদ্রণ প্রতিষ্ঠানের ব্যবহার করা কাগজের উজ্জ্বলতা ও স্থায়িত্বেও ঘাটতি রয়েছে। দরপত্রে নির্ধারিত ব্র্যান্ডের কালি ব্যবহারের পরিবর্তে নিম্নমানের কালি ব্যবহার করা হচ্ছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ব্যবহৃত কালির নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষা করা হলে তা নকল বলে শনাক্ত হয়েছে। বইয়ের বাঁধাইয়েও ত্রুটি পাওয়া যাচ্ছে।

এনসিটিবি সূত্র বলছে, পিডিআইয়ের ছাড়পত্র পাওয়া কিছু মুদ্রণ প্রতিষ্ঠানের কাগজ পরে পরীক্ষা করে নির্ধারিত মান পাওয়া যায়নি। যদিও তা সংশ্লিষ্ট মান যাচাইকারী প্রতিষ্ঠানের ছাড়পত্র পেয়েছিল।

এনসিটিবির তথ্যমতে, পাঠ্যবই ছাপায় অনিয়মের জন্য আনন্দ প্রেস, রেদওয়ানী প্রেস, মেঘদূত প্রেসকে শোকজ করা হয়েছে। এ ছাড়া লিখন আর্ট প্রেস, সাগরিকা, ন্যাশনাল প্রেস, সরকার, আনোয়ারা প্রেসকেও শোকজ করা হয়েছে। এর বাইরে বাংলাদেশ ডিজিটাল, আনোয়ার, আমিন, মুত্তাহিদা, দশদিশা প্রেসকেও অনিয়মের অভিযোগে শোকজ করা হয়েছে।

এবার পাঠ্যবইয়ের মান যাচাইয়ে প্রাথমিক ও মাধ্যমিকের জন্য আলাদা পিডিআই প্রতিষ্ঠান নিয়োগ দিয়েছে এনসিটিবি। প্রাথমিকের বইয়ের মান যাচাইয়ের দায়িত্ব পেয়েছে ইনফিনিটি সার্ভে অ্যান্ড ইন্সপেকশন বিডি। মাধ্যমিক ও ইবতেদায়ির বইয়ের দায়িত্ব পেয়েছে ইনডিপেনডেন্ট ইন্সপেকশন সার্ভিসেস বিডি।

সূত্র বলেছে, ইনডিপেনডেন্ট ইন্সপেকশন সার্ভিসেস বিডিকেও শোকজ করেছে এনসিটিবি। প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে কয়েকটি ছাপাখানার সঙ্গে যোগসাজশ করে নিম্নমানের কাগজে ছাপা বইকে ছাড়পত্র দেওয়ার অভিযোগ উঠেছিল।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এনসিটিবির এক কর্মকর্তা বলেন, ‘শর্ষের মধ্যে ভূত থাকলে আমরা কী করব। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উচিত তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া।’

অবশ্য অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ইনডিপেনডেন্ট ইন্সপেকশন সার্ভিসেস বিডির স্বত্বাধিকারী শেখ বেলাল হোসেন। তিনি বলেন, যেসব অভিযোগ আসছে, তা সঠিক নয়।

বাংলাদেশ প্রতিদিন

‘অবৈধ অস্ত্রে বাড়ছে অপরাধ’—এটি দৈনিক বাংলাদেশ প্রতিদিনের প্রধান শিরোনাম। খবরে বলা হয়, বিশেষ অভিযান, নিয়মিত তল্লাশি ও গোয়েন্দা নজরদারি বৃদ্ধির পরও কমছে না অবৈধ অস্ত্রধারীদের দাপট। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে হামলা, চাঁদাবাজি, ছিনতাই ও আধিপত্য বিস্তারের ঘটনা ঘটছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানে অস্ত্র উদ্ধার হলেও নেপথ্যের সরবরাহকারী, শুটার ও কেনাবেচা চক্রের সদস্যরা থেকে যাচ্ছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। ফলে অবৈধ অস্ত্রের উৎস ও সরবরাহের নেটওয়ার্ক নিয়ে শঙ্কা তৈরি হচ্ছে। একই সঙ্গে অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহারে বাড়ছে সব ধরনের অপরাধ।

গোয়েন্দা সূত্র বলছে, শুধু রাজধানীতেই ৪ শতাধিক অস্ত্রধারী রয়েছে। তাদের কেউ কেউ মাঝেমধ্যে গ্রেপ্তার হলেও অধরাই রয়ে গেছে দুর্ধর্ষ শুটাররা। শীর্ষ সন্ত্রাসীরা টার্গেট কিলিং, চাঁদাবাজি বা আধিপত্যের লড়াইয়ে অবৈধ অস্ত্র ব্যবহার করছে।

এদিকে গণ অভ্যুত্থানের সময় পুলিশের লুটের অস্ত্র উদ্ধারে পুরস্কার ঘোষণার পরেও তেমন সাড়া মেলেনি। এখনো লুটের ২২ শতাংশ (১৩০৩টি) অস্ত্র উদ্ধার হয়নি। এর মধ্যে রয়েছে চায়না রাইফেল, এসএমজি, এলএমজি, ৭.৬২ চায়না পিস্তল, ৯ এমএম পিস্তল ও ১২ বোর শটগানের মতো অত্যাধুনিক অস্ত্র।

অপরাধ বিশ্লেষকরা বলছেন, সন্ত্রাসীদের হাতে হাতে থাকা অবৈধ অস্ত্র মাঠে রেখে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব নয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংশ্লিষ্টরা বলছেন, লুটের অস্ত্রসহ অবৈধ অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তারে সর্বোচ্চ অভিযান জোরদার রয়েছে। প্রয়োজনে আরও জোরদার করা হবে।

পুলিশ সদর দপ্তরের পরিসংখ্যান বলছে, গত ৩ মাসে (জুন-আগস্ট) সারা দেশে অস্ত্র আইনে ৪২৪টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে আগস্ট মাসে হয়েছে সর্বাধিক ১৫৯টি। ডিএমপি সদর দপ্তরের তথ্য বলছে, ওই ৩ মাসে রাজধানীর বিভিন্ন থানায় অস্ত্র আইনে ৪০টি মামলা হয়েছে। এ সময়ে গ্রেপ্তার হয়েছে ৭৮ জন। উদ্ধার করা হয়েছে ৯০টি আগ্নেয়াস্ত্র। এর মধ্যে অত্যাধুনিক বিদেশি রিভলভার ও পিস্তল, দেশি রিভলভার, বন্দুক, শুটারগান, পাইপগানসহ বিভিন্ন অস্ত্র রয়েছে। পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, জুন মাস থেকে ক্রমান্বয়ে বেড়েছে মামলা, গ্রেপ্তার ও অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধারের সংখ্যা। অর্থাৎ গত ৩ মাসে ক্রমান্বয়ে অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার বেড়েছে। একটি সূত্র জানিয়েছে, গত আগস্ট মাসে সারা দেশে ৫১টি অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করেছে পুলিশ।

এদিকে সম্প্রতি কার্যক্রম নিষিদ্ধ সংগঠন আওয়ামী লীগের নাশকতা ঠেকাতে রাজধানীতে কঠোর নিরাপত্তাবলয় গড়ে তোলে ডিএমপি। ৩ শতাধিক চেকপোস্ট বসিয়ে তল্লাশি চালানো শুরু হয়; বাড়ানো হয় প্যাট্রলিং। এরপরও অবৈধ অস্ত্রধারীদের দাপট থেমে থাকেনি। গত সোমবার রাতে দক্ষিণ বাড্ডা আলাতুন্নেছা স্কুলের পিছনের রাস্তায় দুই পক্ষের গোলাগুলির মাঝে পড়ে গুলিবিদ্ধ হন আলআমিন নামে এক পথচারী। একই রাতে মেরুল বাড্ডা বাজার গলিতে দুর্বৃত্তের গুলিতে আহত হন সাইফুল নামে এক ব্যক্তি। গত ২৬ সেপ্টেম্বর পশ্চিম মাটিকাটায় নিউগিনি প্রোপার্টিজ লিমিটেডের প্রকল্প এলাকায় কন্টেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওসহ বিভিন্ন স্থাপনায় হামলা চালায় সন্ত্রাসীরা। এ সময় তারা কমপক্ষে ৫০ রাউন্ড এলোপাতাড়ি গুলি ছোড়ে। অস্ত্রধারীদের মধ্যে মিরপুরের ফোর স্টার গ্রুপের সদস্যরা ছিল বলে জানিয়েছে পুলিশের একটি সূত্র। শুধু এই ঘটনাগুলোই নয়-মাদক কারবার দ্বন্দ্ব, চাঁদাবাজি ও আধিপত্যে নিয়মিতই রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার আতঙ্ক ছড়াচ্ছে।

যেভাবে আসছে অবৈধ অস্ত্র: সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, বাংলাদেশ-ভারত ও বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তের অন্তত ২০টি রুট দিয়ে দেশে ঢুকছে অবৈধ অস্ত্র। চোরাচালানকারীরা নির্দিষ্ট কমিশনের বিনিময়ে এসব অস্ত্র সীমান্ত পার করে দেশীয় কারবারিদের হাতে তুলে দিচ্ছে। রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীরাও মিয়ানমার থেকে রাতের অন্ধকারে দেশে অস্ত্র নিয়ে আসছে। পরে এই অস্ত্র অর্ডার করা ক্রেতাদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। জানা গেছে, সীমান্ত এলাকায় মাঝেমধ্যে কিছু অস্ত্রের চালান ধরা পড়লেও অধিকাংশ আগ্নেয়াস্ত্র আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে দেশে ঢোকে। এর মধ্যে সাব মেশিনগান (এসএমজি), রিভলভার, পিস্তল ও রাইফেলের মতো অত্যাধুনিক অস্ত্রও রয়েছে। পরে এসব অস্ত্রই সহিংসতা, খুনাখুনি থেকে শুরু করে আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজিতে ব্যবহার করা হয়। অনলাইন অর্ডারেও এখন অবৈধ অস্ত্র পাওয়া যাচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও অনলাইনে অর্ডার করে সম্প্রতি অস্ত্র বিক্রিতে জড়িত কয়েকজন কারবারিকে গ্রেপ্তার করে।

লুটের অস্ত্রও সন্ত্রাসীদের হাতে: পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য বলছে, জুলাই গণ অভ্যুত্থানের সময় ৫ হাজার ৭৬৩টি অস্ত্র লুট হয়েছিল। গত ২৫ আগস্ট পর্যন্ত ৪ হাজার ৪৬০টি অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে। ১ হাজার ৩০৩টি অস্ত্র এখনো উদ্ধার হয়নি। এর মধ্যে রয়েছে শতাধিক চায়না রাইফেল, ৩০টি এসএমজি, তিনটি এলএমজি, ২ শতাধিক ৭.৬২ চায়না পিস্তল, প্রায় সাড়ে ৪ শ ৯ এমএম পিস্তল, প্রায় ৪ শ ১২ বোর শটগানসহ বিপুল গোলাবারুদ। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জুলাই আন্দোলনের সময় লুট হওয়া এসব অস্ত্র সন্ত্রাসীরা ব্যবহার করছে। বিভিন্ন শীর্ষ সন্ত্রাসী গ্রুপের কাছ থেকে অনেক অস্ত্র উদ্ধারও হয়েছে। এখনো উদ্ধার না হওয়া অস্ত্রগুলো সন্ত্রাসীদের হাতেই রয়েছে।