জেলা ও সিটি প্রশাসকের আশ্বাসের পরও আন্দোলন থেকে সরে দাঁড়ায়নি সিলেট ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের শিক্ষার্থীরা। মঙ্গলবারও তারা ক্লাস ও পরীক্ষা বর্জন করে প্রধান ফটকে তালা ঝুলিয়ে বিক্ষোভ করেছে। বিকালে সংবাদ সম্মেলন করে ঘোষণা দিয়েছে দাবি পূরণ না হওয়া না পর্যন্ত তাদের আন্দোলন কর্মসূচি চলমান থাকবে। শিক্ষক-কর্মকর্তারা জানিয়েছেন- টানা ৩৫ ঘণ্টা তারা প্রশাসনিক ভবনে বন্দি থাকার পর মুক্তি পেলেও ক্যাম্পাস থেকে বের হতে পারছেন না। মূল ফটকে তালা ঝুলিয়ে শিক্ষার্থীরা অবস্থান করায় তারা এখনো ক্যাম্পাসের ভেতরে অবরুদ্ধ অবস্থায় রয়েছেন।
সাবেক অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী এম সাইফুর রহমানের হাত ধরেই প্রায় ২০ বছর আগে এ প্রতিষ্ঠানটি যাত্রা শুরু করেছিল। শুরু থেকেই তারা কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরের অধীনে রয়েছে। শিক্ষার্থীদের ক্লাস নিতেন সিলেটের ডিপ্লোমা কলেজের শিক্ষকরা। এ নিয়ে অনেক ক্ষোভ ছিল শিক্ষার্থীদের। এখন তারা বঞ্চনার অবসান চায়। কলেজকে কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরের অধীনতা থেকে মুক্ত করে কার্যক্রম শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে নেয়ার দাবিতে গত রোববার থেকে ক্লাস পরীক্ষা বর্জন করে আন্দোলনে নেমেছে শিক্ষার্থীরা। ওইদিন প্রশাসনিক ভবনে তালা ঝুলিয়ে দেন তারা। এতে অবরুদ্ধ হয়ে পড়েন শিক্ষক-কর্মকর্তারা।
বাইরে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ, ভেতরে শিক্ষক, কর্মকর্তাদের অবরুদ্ধ পরিস্থিতিতে সংকট দেখা দেয়। এতে হস্তক্ষেপ করেন সিলেটের জেলা প্রশাসক আব্দুল্লাহ আল মামুন ও সিটি প্রশাসক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী। গত সোমবার বিকাল থেকে রাত পর্যন্ত তারা শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কয়েক দফা বৈঠক করেন। শেষ বৈঠকের পর রাতে প্রশাসনিক ভবনের তালা খুলে অবরুদ্ধ শিক্ষক-কর্মকর্তাদের মুক্ত করে দেন আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা। তবে মুক্ত হলেও তারা এখনো ক্যাম্পাসের বাইরে যেতে পারছেন না। প্রধান ফটকসহ বিভিন্ন স্থানে শিক্ষার্থীরা তালা ঝুলিয়ে রাখায় ক্যাম্পাসে আটকা পড়েছেন।
গতকাল সকাল থেকে ফের ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ শুরু করে শিক্ষার্থীরা। দুপুরে তারা এ নিয়ে সংবাদ সম্মেলন করেন। এতে শিক্ষার্থীদের পক্ষে বক্তব্য রাখেন ই ই ই বিভাগের তানভীর আহমদ এবং সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ফাহাদ ফয়সাল। তারা বলেন, শিক্ষার্থীরা দীর্ঘদিন ধরে ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজকে কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর থেকে মুক্ত করার দাবি জানিয়ে আসছেন। তাদের দাবির প্রেক্ষিতে ২০২৫ সালে শিক্ষা উপদেষ্টার নেতৃত্বে একটি কমিটি গঠন করা হয়। ওই কমিটির সুপারিশের প্রেক্ষিতে চলতি বছরের ২১শে জানুয়ারি ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজকে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ‘ইনস্টিটিউট অব ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি সাস্ট’ হিসেবে গঠনের সিদ্ধান্ত হয়। কিন্তু পরবর্তীতে তা বাস্তবায়ন হয়নি।
শিক্ষার্থীরা বলেন, এ কারণে শিক্ষার্থীরা আবার আন্দোলনে নেমেছেন। এবার দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাবে তারা। এই সময়ে ক্লাস পরীক্ষাসহ কলেজের সকল কার্যক্রম বন্ধ থাকবে। শিক্ষকরাও কলেজের বাইরে যেতে পারবেন না। সংবাদ সম্মেলনে ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজকে পৃথক বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তর করার দাবি জানিয়ে শিক্ষার্থী প্রতিনিধিরা বলেন- রূপান্তরের পূর্ব পর্যন্ত তাদেরকে শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে নেয়া হোক। আন্দোলন চলাকালীন মন্ত্রণালয়ের কোনো আদেশ বা রদবদল মেনে নেয়া হবে না বলেও জানান তারা। সংবাদ সম্মেলনকালে কলেজের প্রধান ফটকসহ বিভিন্ন একাডেমিক ভবনে তালা ঝুলতে দেখা গেছে।
শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের কারণে কলেজের স্বাভাবিক কার্যক্রমও বন্ধ রয়েছে। এদিকে- কলেজের অধ্যক্ষের দায়িত্বে থাকা মো. আসাদুজ্জামান জানিয়েছেন- শিক্ষার্থীরা ফটকসহ বিভিন্ন স্থানে তালা ঝুলিয়ে রাখায় কেউ ক্যাম্পাসের বাইরে যেতে পারছেন না। এ ছাড়া স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের বৈঠকেও কোনো সমাধান হয়নি। ফলে ক্যাম্পাসের অচলাবস্থা এখনো কাটেনি। এদিকে সোমবার রাতে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে শিক্ষার্থীদের ১০ সদস্যের প্রতিনিধিদলের সঙ্গে স্থানীয় প্রশাসনের বৈঠক হয়।
পরে সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী, জেলা প্রশাসক আব্দুল্লাহ আল মামুনসহ কর্মকর্তারা ক্যাম্পাসে গিয়ে সাধারণ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলেন। প্রশাসনের পক্ষ থেকে শিক্ষার্থীদের জানানো হয়, আগামী তিন মাসের মধ্যে কলেজকে বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরের প্রক্রিয়া শুরুর উদ্যোগ নেয়া হবে। একইসঙ্গে কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরের অধীনতা থেকে কলেজকে মুক্ত করার উদ্যোগ এবং বিজ্ঞানাগার ও খেলার মাঠের সমস্যা সমাধানের আশ্বাস দেয়া হয়। এ সময় শিক্ষার্থীরা কলেজের অধ্যক্ষের অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা মো. আসাদুজ্জামানের বদলির প্রজ্ঞাপন বাতিলের দাবিও জানান। এ বিষয়ে তাৎক্ষণিক কোনো সিদ্ধান্ত দিতে না পারার কথা জানান সিটি প্রশাসক।
পরে কোনো সিদ্ধান্ত ছাড়াই প্রশাসনের কর্মকর্তারা ক্যাম্পাস ছাড়েন। এরপর শিক্ষার্থীরা নিজেদের মধ্যে মতবিনিময় করে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। সিলেট সিটি প্রশাসক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী জানিয়েছেন- শিক্ষার্থীদের অন্যতম একটি দাবি তাদের প্রিন্সিপ্যালের বদলির অর্ডার বাতিল করা। এটা সরকারি সিদ্ধান্ত। তাদের অন্যান্য দাবি মেনে নেয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। তিনি বলেন- আমরা কয়েক দফা আলোচনা করেছি। তাদের বক্তব্য শুনেছি। সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা হচ্ছে। কলেজের শিক্ষার পরিবেশ দ্রুত ফিরিয়ে আনতে তারা কাজ করছেন বলে জানান।
