ঢাকা-কলকাতা রুটের জনপ্রিয় আন্তঃদেশীয় ট্রেন ‘মৈত্রী এক্সপ্রেস’ পদ্মা সেতু হয়ে বেনাপোল রুটে চালু করা হলে যাত্রার সময় প্রায় ৩ ঘণ্টা কমে যেতে পারে। এতে ঢাকা থেকে কলকাতা যেতে সময় লাগতে পারে মাত্র ৬ ঘণ্টা। একই সঙ্গে প্রতি টিকিটে প্রায় ১ হাজার টাকা পর্যন্ত ভাড়া কমতে পারে।
বাংলাদেশ ও ভারতের অভিন্ন ঐতিহ্য, সাংস্কৃতিক ও সামাজিক বন্ধনের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে দুই দেশের সরকার যৌথভাবে ‘মৈত্রী এক্সপ্রেস’ চালুর সিদ্ধান্ত নেয়। ২০০৮ সালের এপ্রিল মাসে বাংলা নববর্ষের শুভ দিনে ঢাকা স্টেশন থেকে কলকাতা পর্যন্ত এই ট্রেনের যাত্রা শুরু হয়েছিল।
সাশ্রয়ী যাতায়াতের মাধ্যম
দুই দেশের মধ্যে সাশ্রয়ী ও পরিবেশবান্ধব রেল যোগাযোগের সুযোগ দেয়ার পাশাপাশি ‘মৈত্রী এক্সপ্রেস’ সীমান্তের দুই পাশে বসবাসকারী মানুষের মধ্যে যোগাযোগ বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। একই সঙ্গে বাণিজ্য ও ব্যবসা সম্প্রসারণ, পর্যটন বৃদ্ধি এবং বয়স্ক মানুষ ও চিকিৎসার জন্য যাতায়াতকারীদের নির্বিঘ্ন ভ্রমণে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছিল।
৯৫ শতাংশ যাত্রীই বাংলাদেশের
রেলওয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২-২৩ অর্থবছর থেকে ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই পর্যন্ত মোট ২ লাখ ৮৮ হাজার ৩৬০ জন যাত্রী ‘মৈত্রী এক্সপ্রেসে’ ভ্রমণ করেছেন। তাদের প্রায় ৯৫ শতাংশই বাংলাদেশের নাগরিক।
এই সময়ে ট্রেনটির আসন পূর্ণ হওয়ার হার ছিল ৮০ থেকে ৮৫ শতাংশের মধ্যে। তবে ঈদ ও দুর্গাপূজার ছুটিতে যাত্রীসংখ্যা বেড়ে আসন পূর্ণ হওয়ার হার ৯৫ শতাংশেরও বেশি ছিল।
তবে নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগের কারণে ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই ট্রেনটির চলাচল বন্ধ হয়। এরপর থেকেই দুই দেশের মানুষ এর পুনরায় চালুর অপেক্ষায় রয়েছেন।
মৈত্রী এক্সপ্রেসের আয় থেকে ৭৫ শতাংশ পায় বাংলাদেশ রেলওয়ে
ভারতের অংশে অর্থাৎ কলকাতা থেকে ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট স্টেশন পর্যন্ত মৈত্রী এক্সপ্রেসের ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছিল এসি সিটের জন্য ৩০ মার্কিন ডলার এবং এসি চেয়ার কারের জন্য ২০ মার্কিন ডলার। এর সঙ্গে কোনো অতিরিক্ত চার্জ নেয়া হতো না ।
দুই দেশের মধ্যে আন্তঃদেশীয় যাত্রীবাহী ট্রেন পরিচালনা সংক্রান্ত একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) অনুযায়ী, ‘মৈত্রী এক্সপ্রেসে’ যাত্রী পরিবহনের মাধ্যমে টিকিট বিক্রি থেকে অর্জিত মোট অর্থের বণ্টিত অংশের ৭৫ শতাংশ পায় বাংলাদেশ রেলওয়ে। বাকি ২৫ শতাংশ পায় ভারতীয় রেলওয়ে।
সপ্তাহে পাঁচ দিন চলত ট্রেন
অনুমোদিত সময়সূচি অনুযায়ী ‘মৈত্রী এক্সপ্রেস’ সপ্তাহে পাঁচ দিন চলাচল করত। ঢাকার স্টেশন থেকে সকাল ৮টা ১৫ মিনিটে ছেড়ে কলকাতায় পৌঁছানোর নির্ধারিত সময় ছিল বিকেল ৪টা। কলকাতার চিৎপুর টার্মিনাল স্টেশন থেকে ফিরতি ট্রেন সকাল ৭টা ১০ মিনিটে ছেড়ে ঢাকায় পৌঁছানোর নির্ধারিত সময় ছিল বিকেল ৩টা ৩৫ মিনিট।
অর্থাৎ তাত্ত্বিকভাবে ঢাকা থেকে কলকাতা যেতে সময় লাগত ৭ ঘণ্টা ৪৫ মিনিট এবং কলকাতা থেকে ঢাকায় ফিরতে সময় লাগত ৮ ঘণ্টা ২৫ মিনিট।
১০টি কোচে ৪৫৬ যাত্রী
‘মৈত্রী এক্সপ্রেস’ সম্পূর্ণ শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ট্রেন। এতে ১০টি যাত্রীবাহী কোচ ছিল। এর মধ্যে চারটি এসি ফার্স্ট ক্লাস কোচ, চারটি এসি চেয়ার কার কোচ এবং দুটি পাওয়ার কার।
সপ্তাহে পাঁচ দিন ট্রেনটি চালাতে মোট তিনটি রেক ব্যবহৃত হতো। এর মধ্যে দুটি রেক সরবরাহ করেছিল ভারতীয় রেলওয়ে এবং একটি বাংলাদেশ রেলওয়ে।
কোচগুলোতে অ্যান্টি-টেলিস্কোপিক কাঠামো, হালকা ওজনের বডি, উচ্চগতিতে চলাচলের সক্ষমতা, উন্নত সাসপেনশন ও অগ্নিনিরাপত্তার মতো আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে। ফলে যাত্রীদের জন্য উন্নত সুবিধার পাশাপাশি ভ্রমণে নিরাপত্তাও নিশ্চিত করা হয়। মৈত্রী এক্সপ্রেসে মোট ৪৫৬ জন যাত্রীর আসন রয়েছে। একজন যাত্রী বিনা অতিরিক্ত খরচে সর্বোচ্চ ৩৫ কেজি পর্যন্ত সঙ্গে থাকা মালামাল বহন করতে পারতেন।
বিমানের মতো ইমিগ্রেশন সুবিধা
ট্রেনে থাকা যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং যাত্রার সময় কমানোর লক্ষ্যে ‘মৈত্রী এক্সপ্রেসে’ শুরু থেকেই এন্ড-টু-এন্ড ইমিগ্রেশন ক্লিয়ারেন্সের ব্যবস্থা করা হয়।
এর ফলে পথে বিশেষ করে গেদে ও দর্শনায় ইমিগ্রেশনের জন্য ট্রেন থামিয়ে রাখার সময় কমেছে। একই সঙ্গে যাত্রীদের ভ্রমণও হয়েছে আরও সহজ ও স্বাচ্ছন্দ্যপূর্ণ।
পদ্মা সেতু হয়ে চললে সময় কমবে ৩ ঘণ্টা
সেবা বন্ধ হওয়ার আগে ‘মৈত্রী এক্সপ্রেস’ টাঙ্গাইল-যমুনা সেতু-ঈশ্বরদী-দর্শনা রেলপথ দিয়ে চলাচল করত। এই পথে ঢাকা থেকে কলকাতার দূরত্ব প্রায় ৩৯২ কিলোমিটার।
পথটি দীর্ঘ ও ঘুরপথের হলেও পদ্মা সেতু চালুর আগে বিকল্প ব্রডগেজ রেলপথ না থাকায় শুধু মৈত্রী এক্সপ্রেস নয়, দর্শনা, বেনাপোল, যশোর ও খুলনাগামী অন্যান্য যাত্রীবাহী ট্রেনও যমুনা সেতু হয়ে চলাচল করত। এই পথে কমলাপুর থেকে বেনাপোল যেতে ট্রেনের ৮ ঘণ্টারও বেশি সময় লাগত।
তবে ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে পদ্মা সেতু রেলপথ চালু হওয়ার পর কমলাপুর থেকে বেনাপোল পর্যন্ত রেলযাত্রার সময় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়।
বিকল্প হতে পারে আকাশপথের
বিষয়টি সম্পর্কে অবগত সূত্রের বরাত দিয়ে বলা হচ্ছে, বিদ্যমান ঢাকা স্টেশনের অবকাঠামো ব্যবহার করে মৈত্রী এক্সপ্রেসকে যদি যমুনা সেতু-দর্শনা রুটের পরিবর্তে পদ্মা সেতু-বনাপোল রুটে চালানো যায়, তাহলে একই ধরনের পরিবর্তন এই ট্রেনের ক্ষেত্রেও আসতে পারে।
এতে ঢাকা থেকে কলকাতা এবং কলকাতা থেকে ঢাকা—দুই দিকের যাত্রাতেই অন্তত ৩ ঘণ্টা সময় কমানো সম্ভব হতে পারে। ফলে ঢাকা থেকে কলকাতা পৌঁছানো যাবে প্রায় ৬ ঘণ্টায়। একই সঙ্গে যাত্রার সময় কমার পাশাপাশি প্রতি টিকিটে ভাড়া অন্তত ১ হাজার টাকা পর্যন্ত কমতে পারে।
এভাবে মৈত্রী এক্সপ্রেস পুনরায় চালু হয়ে পদ্মা সেতু-বনাপোল রুটে চলাচল শুরু করলে ঢাকা-কলকাতা যাতায়াতে এটি আকাশপথের একটি বিকল্প হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
