চাঁদাবাজের জন্য দানবাক্স—ব্যঙ্গের আড়ালে যে বড় প্রশ্ন?

চাঁদা নয়, ভিক্ষা দিন!

চাঁদাবাজের জন্য দানবাক্স—ব্যঙ্গের আড়ালে যে বড় প্রশ্ন?

ফন্ট সাইজ:

চাঁদাবাজি ঠেকাতে দানবাক্স! নামটিই প্রথমে হাস্যরস তৈরি করে। কিন্তু এই হাসির ভেতরেই লুকিয়ে আছে বাংলাদেশের রাজনীতি ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির একটি অস্বস্তিকর বাস্তবতা। জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতা ও সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ এবং দলের মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী রাজধানীর বাংলামোটর-হাতিরপুল এলাকায় ‘চাঁদাবাজ পুনর্বাসন দানবাক্স’ নিয়ে যে প্রতীকী কর্মসূচি করেছেন, সেটি নিছক রাজনৈতিক কৌতুক হিসেবে দেখলে এর তাৎপর্যের একটি অংশ বাদ পড়ে যায়। একই সঙ্গে এটিকে চাঁদাবাজি বন্ধের বাস্তব সমাধান ভাবলেও ভুল হবে।

২৮ সেপ্টেম্বরের ওই কর্মসূচিতে দুটি প্রতীকী দানবাক্স প্রদর্শন করা হয়। বাক্সে লেখা ছিল ‘চাঁদাবাজদের মবতন্ত্র!’ এবং ‘চান্দা ভাইকে চাঁদা নয়, ভিক্ষা দিন’। এনসিপির নেতারা মানুষের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন, দোকানপাট ও রাস্তার মোড়ে এ ধরনের বাক্স রাখতে, যাতে চাঁদাবাজেরা চাঁদার বদলে সেখান থেকে ‘ভিক্ষা’ নিয়ে চলে যায়। হাসনাত আবদুল্লাহর বক্তব্যের মূল সুর ছিল চাঁদাবাজদের টাকা দিতে হলে অন্তত বৈধ বা প্রকাশ্য কোনো পথে দেওয়া হোক, যাতে তারা বাড়িঘর, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বা অন্য স্থাপনায় হামলা-লুটপাট না করে।

রাজনীতির ভাষায় এটি নিঃসন্দেহে ব্যঙ্গ। কিন্তু ব্যঙ্গটি যে জায়গায় গিয়ে আঘাত করছে, সেই জায়গাটি বাস্তব। চাঁদাবাজি কেবল রাজনৈতিক বক্তৃতার বিষয় নয়; এটি ছোট ব্যবসায়ী, পরিবহন শ্রমিক, ফুটপাতের বিক্রেতা, শিল্পপ্রতিষ্ঠান এবং বিভিন্ন পেশাজীবীর অর্থনৈতিক নিরাপত্তার প্রশ্ন। গত জুলাইয়ে প্রকাশিত এক পুলিশ গোয়েন্দা প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে একটি জাতীয় পত্রিকা জানিয়েছিল, ঢাকার ৪৫টি থানার আওতাধীন এলাকায় প্রায় ১,২০০ চাঁদাবাজের তালিকা তৈরি হয়েছিল। প্রতিবেদনে ৩২৯ জনকে চাঁদাবাজদের ‘প্রটেকশন’ দেওয়ার সঙ্গে যুক্ত হিসেবে চিহ্নিত করার কথা বলা হয়। তালিকাভুক্তদের একটি অংশের রাজনৈতিক পরিচয়ও উল্লেখ করা হয়েছিল। তবে এসব তালিকা তদন্ত-সংশ্লিষ্ট তথ্য; কোনো ব্যক্তির অপরাধ প্রমাণের বিকল্প নয়।

আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, রাজনৈতিক পালাবদল চাঁদাবাজির কাঠামোকে পুরোপুরি ভেঙে দিতে পারেনি। এমন তথ্যও বিভিন্ন প্রতিবেদনে এসেছে। একটি জাতীয় দৈনিক-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পরও ঢাকার বহু ছোট ব্যবসায়ী নিয়মিত ‘টোল’ দেওয়ার অভিযোগ করেছেন। অর্থাৎ প্রশ্নটি কেবল ‘কারা ক্ষমতায়’ এত সরল নয়। প্রশ্নটি হলো, ক্ষমতার সঙ্গে অপরাধী নেটওয়ার্কের সম্পর্ক কীভাবে তৈরি হয় এবং কেন সেই সম্পর্ক রাজনৈতিক পরিবর্তনের পরও টিকে থাকে।

এখানেই ‘দানবাক্স’-এর আসল রাজনৈতিক তাৎপর্য। এটি রাষ্ট্রের বিকল্প কোনো ব্যবস্থা নয়; বরং রাষ্ট্রের দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার অভিযোগকে ব্যঙ্গ করে জনসমক্ষে তুলে ধরার একটি রাজনৈতিক কৌশল। কিন্তু ব্যঙ্গ যতই তীক্ষ্ণ হোক, চাঁদাবাজি দমন করতে দানবাক্স কোনো কার্যকর প্রশাসনিক ব্যবস্থা হতে পারে না। বরং ভুলভাবে প্রয়োগ হলে এটি উল্টো চাঁদাবাজির সামাজিক স্বীকৃতির মতোও দেখাতে পারে ‘টাকা তো দেবই, শুধু পদ্ধতিটা বদলাক।’ অথচ নাগরিকের অবস্থান হওয়া উচিত এর বিপরীত: চাঁদা দেওয়ার বাধ্যবাধকতাই থাকবে না।

চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় অস্ত্র হলো আইনের নিশ্চয়তা। যে ব্যবসায়ী চাঁদা দিতে অস্বীকার করলে হামলার আশঙ্কা করেন, তার জন্য দানবাক্সের চেয়ে জরুরি হলো পুলিশে অভিযোগ করলে দ্রুত সাড়া পাওয়া। আরও জরুরি হলো, অভিযোগের পর তার ব্যবসা, পরিবার ও সম্পদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। একইভাবে, যে ব্যক্তি চাঁদা দাবি করছে, তাকে গ্রেপ্তার করাই শেষ কথা নয়; তার সঙ্গে কারা আছে, অর্থ কোথায় যাচ্ছে, কে রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক আশ্রয় দিচ্ছে, সেই নেটওয়ার্ক শনাক্ত করাও প্রয়োজন।

রাষ্ট্র অবশ্য এ বিষয়ে অভিযান চালানোর কথা বলছে। চলতি বছরের মে মাসে ঢাকায় বিশেষ অভিযানে ৬৫৮ জন কথিত চাঁদাবাজকে গ্রেপ্তারের কথা জানিয়েছিল ঢাকা মহানগর পুলিশ। এর আগে ৪৮ ঘণ্টার এক অভিযানে ১৫২ জন চাঁদাবাজ ও তাদের সহযোগী গ্রেপ্তারের তথ্যও দিয়েছিল ডিএমপি।

কিন্তু গ্রেপ্তারের সংখ্যা দিয়ে সমস্যার সমাধান মাপা যায় না। কারণ চাঁদাবাজি যদি একটি সংগঠিত নেটওয়ার্ক হয়, তাহলে নিচের সারির কয়েকজনকে ধরে উপরের স্তর অক্ষত রাখলে সমস্যাটি সাময়িকভাবে চাপা পড়তে পারে, নির্মূল হয় না। জুলাইয়ের পুলিশ গোয়েন্দা প্রতিবেদনের বিষয়ে প্রকাশিত সম্পাদকীয়তে এমন প্রশ্নও তোলা হয়েছিল—যাদের চিহ্নিত করা হয়েছে, তাদের মধ্যে মূল হোতাদের কতজন আইনের আওতায় এসেছে?

আরেকটি বিষয়ও উপেক্ষা করা যায় না। চাঁদাবাজির সঙ্গে রাজনৈতিক পরিচয়ের সম্পর্ক নিয়ে প্রায় সব বড় দলই পরস্পরের বিরুদ্ধে অভিযোগ করে। এনসিপি বিএনপির নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলছে; বিএনপির নেতারাও অতীতে ও বর্তমানে এনসিপিসহ অন্য রাজনৈতিক শক্তির বিরুদ্ধে পাল্টা অভিযোগ করেছেন। চলতি বছর বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানও চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রয়োগের কথা বলেছেন এবং বিষয়টিকে পেশাদার অপরাধী ও বেকারত্ব দুই দিকের সঙ্গেই যুক্ত করেছেন।

তাই চাঁদাবাজির প্রশ্নটি দলীয় অভিযোগের খেলায় আটকে গেলে মূল ভুক্তভোগী আড়ালে পড়ে যান। সেই ভুক্তভোগী হলেন দোকানদার, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা, পরিবহনকর্মী, ফুটপাতের বিক্রেতা কিংবা কারখানার মালিক—যিনি ব্যবসা চালানোর খরচের বাইরে অঘোষিত ‘টোল’ দিতে বাধ্য হন। একটি প্রতিবেদনে কারও মাসিক ব্যবসায়িক ব্যয়ের তুলনায় চাঁদার পরিমাণও উল্লেখযোগ্য হওয়ার কথা উঠে এসেছে।

চাঁদাবাজি তাই কেবল আইনশৃঙ্খলার সমস্যা নয়; এটি অর্থনীতিরও সমস্যা। একজন দোকানদার চাঁদা দিলে সেই অর্থ শেষ পর্যন্ত পণ্যের দামে যোগ হয়। পরিবহনে চাঁদা হলে ভাড়া বাড়ে। শিল্পে চাঁদা হলে উৎপাদন ব্যয় বাড়ে। আর সর্বোপরি, ব্যবসার পরিবেশে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। অর্থাৎ চাঁদাবাজির টাকা যে শুধু একজন অপরাধীর পকেটে যায়, বিষয়টি এত সরল নয়; এর একটি অংশ শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়েও প্রতিফলিত হতে পারে।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক জায়গাটি আরও গভীরে। যখন কোনো অপরাধী জানে যে তার পেছনে রাজনৈতিক ছাতা আছে, অথবা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কোনো অংশ তাকে সহায়তা করতে পারে, তখন চাঁদাবাজি একটি ‘ব্যবসায়িক মডেল’-এ পরিণত হয়। চলতি আগস্টে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, কোনো পুলিশ সদস্য চাঁদাবাজিতে জড়িত বা চাঁদাবাজকে সহায়তা করলে তাকেও আইনের আওতায় আনা হবে। সেপ্টেম্বরেও চট্টগ্রামে এক ব্যবসায়ীর কাছ থেকে অর্থ ও ক্রিপ্টোকারেন্সি আদায়ের অভিযোগে কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তাকে প্রত্যাহারের খবর প্রকাশিত হয়েছে। অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে, এমন কথা বলা যাবে না; তবে ঘটনাটি দেখায়, চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহিও গুরুত্বপূর্ণ।

তাহলে ‘চাঁদাবাজ পুনর্বাসন দানবাক্স’ কী করবে? সম্ভবত সবচেয়ে বড় কাজটি করবে। একটি কঠিন বিষয়কে মানুষের দৈনন্দিন কথাবার্তায় নিয়ে আসবে। রাজনৈতিক ব্যঙ্গ কখনো কখনো জনমতকে সচেতন করে। মানুষকে মনে করিয়ে দেবে, চাঁদা দেওয়া কোনো স্বাভাবিক নাগরিক কর্তব্য নয়। কিন্তু এরপরের কাজটি দানবাক্সের নয়, রাষ্ট্রের। অভিযোগ গ্রহণ, দ্রুত তদন্ত, সাক্ষীর নিরাপত্তা, সম্পদের হিসাব, অস্ত্র উদ্ধার, রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার প্রমাণ খোঁজা, বিচার এবং দোষী সাব্যস্ত হলে শাস্তি। এই পুরো শৃঙ্খল কার্যকর করাই সমাধানের পথ।

এখানে রাজনৈতিক দলগুলোরও একটি পরীক্ষার জায়গা আছে। যে দলেরই নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ উঠুক, দলীয় পরিচয় যেন তদন্তের ঢাল না হয়। অভিযোগ সত্য হলে সাংগঠনিক ব্যবস্থা এবং আইনি ব্যবস্থা দুটিই হতে হবে। আবার অভিযোগ উঠলেই কাউকে অপরাধী ধরে নেওয়াও চলবে না। কারণ আইনের শাসনের অর্থ হলো, অভিযোগের তদন্ত হবে, প্রমাণের ভিত্তিতে বিচার হবে এবং রাজনৈতিক পরিচয় সেখানে প্রভাব ফেলবে না।

হাসনাত-পাটওয়ারীর দানবাক্স তাই শেষ পর্যন্ত একটি প্রশ্নের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে: বাংলাদেশে একজন ব্যবসায়ীকে চাঁদা না দিয়ে নিরাপদে ব্যবসা করার নিশ্চয়তা কে দেবে?

উত্তরটি কোনো বাক্সে নেই। কোনো স্লোগানেও নেই। এমনকি কোনো দলের রাজনৈতিক বক্তব্যেও একা নেই।

উত্তরটি আছে এমন একটি রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায়, যেখানে চাঁদা দাবি করাটাই ঝুঁকিপূর্ণ হবে, চাঁদা না দেওয়াটা নয়। যেখানে ব্যবসায়ীকে অপরাধীর সঙ্গে দর-কষাকষি করতে হবে না। যেখানে রাজনৈতিক পরিচয় অপরাধের লাইসেন্স হবে না। এবং যেখানে ‘চাঁদাবাজ পুনর্বাসন দানবাক্স’ একদিন জাদুঘরের রাজনৈতিক স্মারক হয়ে থাকবে—কারণ তখন আর সেটির প্রয়োজনই থাকবে না।

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিস্ট

E-mail: [email protected]