পানিতে পড়ে শিশুর মৃত্যু, কল রেকর্ড বলছে হত্যা

পানিতে পড়ে শিশুর মৃত্যু, কল রেকর্ড বলছে হত্যা

ফন্ট সাইজ:

নেত্রকোণা সদর উপজেলার উলুয়াটি গ্রামের ছয় বছরের শিশু আবু সুফিয়ান রাফির মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছিল বাড়ির পাশের একটি জলাশয় থেকে। গত ২৬শে জুনের ওই ঘটনায় থানায় অপমৃত্যুর মামলা হয়েছিল। ময়নাতদন্ত শেষে শিশুটির মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছিল। পরে অনেকটা আড়ালেই চলে যায় রাফির মৃত্যুর ঘটনা। কিন্তু ঘটনার প্রায় তিন মাস পর ফাঁস হওয়া একটি কল রেকর্ডের পর নতুন করে রহস্যের সৃষ্টি হয়েছে।

সরজমিন অনুসন্ধানে গিয়ে জানা যায়, রাফির মৃত্যুর ঘটনায় প্রতিবেশী সন্দেহভাজন অভিযুক্ত রুপা আক্তারের সঙ্গে তার স্বামী আবু রায়হানের কথোপকথনের রেকর্ডে উঠে এসেছে শিশুটিকে গলা চেপে হত্যা এবং পরে মরদেহ জলাশয়ে ফেলে দেয়ার বর্ণনা। রেকর্ডটি ধারণ করেছেন রুপার স্বামী রায়হান। যিনি সম্প্রতি কাতার থেকে দেশে ফিরেছেন। তিনি নিজেও কথোপকথনে উঠে আসা ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। কল রেকর্ডের বক্তব্য অনুযায়ী, রাফি রুপা আক্তারের বাড়ির ছাদে তার চার বছর বয়সী মেয়ের সঙ্গে খেলছিল। একপর্যায়ে ওই শিশুর ধাক্কায় রাফি ছাদ থেকে নিচে পড়ে যায়। এরপর রুপা নিচে গিয়ে রাফির গলা চেপে ধরেন এবং মৃত্যু নিশ্চিত করে মরদেহ জলাশয়ে ফেলে আসেন। কল রেকর্ডের বিষয়টি পুলিশকে অবগত করলে পুলিশ জানায়, ফাঁস হওয়া রেকর্ডটি বিশ্লেষণ করে দেখা হবে। নিহত রাফি নেত্রকোণা সদর উপজেলার মেদনী ইউনিয়নের পশ্চিম উলুয়াটি গ্রামের মতিউর রহমানের ছেলে। স্থানীয়রা জানান, তখন ঘটনাটি অপমৃত্যু হিসেবে নথিভুক্ত হলেও কীভাবে শিশুটির মৃত্যু হয়েছে, তা নিয়ে জনমনে নানা প্রশ্ন ছিল। ছয় বছরের রাফি উচ্চতায় প্রায় তিন ফুট। এমন একটি ছেলে এক ফুট গভীরতার পানিতে ডুবে মারা যাওয়ার কথা নয়। বিশেষ করে বাড়ির পাশে জমে থাকা অল্প পানিতে শিশুটির মৃত্যু কীভাবে হলো, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন অনেকে। ঘটনার প্রায় তিন মাস পর রায়হানের করা একটি কল রেকর্ড সামনে আসার পর সেই প্রশ্নগুলো আরও জোরালো হয়েছে।

তবে রেকর্ডে থাকা বক্তব্যের ভিত্তিতেই অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণ এখনো পুলিশের যাচাই বাছাইয়ের মধ্যেই রয়েছে। কাতার থেকে সদ্য দেশে আসা রায়হানের বক্তব্য, অপরাধ যেই করে থাকুক, তার দৃষ্টান্তমূলক বিচার হওয়া উচিত। যাতে ভবিষ্যতে কেউ যেন এ ধরনের ঘটনা ঘটানোর সাহস না পায়। অপরদিকে রেকর্ডে হত্যার বর্ণনাকারী রুপার হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগ করলে তিনি জানান, আমাকে স্বামী ও শ্বশুরবাড়ির লোকজন ফাঁসাতে চাচ্ছে। আমাকে যখন এলাকাবাসী সন্দেহ করা শুরু করে তখন স্বামী আমাকে বাড়ি ছেড়ে চলে যেতে বলে। আমি তখন তাকে বলেছিলাম যদি আমি খুন করেও থাকি তুমি আমাকে বাঁচিও। আমার দুইটা সন্তান আছে। আমার স্বামীর অন্য মেয়ের সঙ্গে সম্পর্ক আছে। আমাকে পরিবার থেকে বের করার উদ্দেশ্যে আমাকে ফাঁসাতে চাচ্ছে। আমি অপরাধ করেছি প্রমাণ করুক। তার এই বক্তব্য এবং কল রেকর্ডে উঠে আসা বর্ণনা রাফির মৃত্যুর ঘটনায় নতুন করে তদন্তের দাবি জানান স্থানীয়রা। রুপার শ্বশুরবাড়ির লোকজনের অভিযোগ, এর আগেও তিনি তার দেবরকে বিষ খাওয়ানোর চেষ্টা করেছিলেন। এমনকি ননদের শিশুকন্যার গায়ে ফুটন্ত পানি ঢেলে হত্যার চেষ্টার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। লাশ উদ্ধারের পর ময়নাতদন্তের রিপোর্টে পানিতে ডুবে মৃত্যুর কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এমনকি শরীরে কোনো আঘাতের কথাও উল্লেখ নেই। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, রাফি হত্যার শিকার হয়ে থাকলে ময়নাতদন্তে তা শনাক্ত হয়নি কেন? সেই প্রতিবেদন এখন কতোটা গুরুত্বপূর্ণ, তা তদন্তে স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।

এ বিষয়ে নেত্রকোণা আধুনিক সদর হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার মো. মাজহারুল ইসলাম বলেছেন, ময়নাতদন্তের রিপোর্টে পানিতে ডুবে মারা যাওয়ার লক্ষণ পাওয়া গেছে। ছাদ থেকে পড়লে শরীরে আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যেতো। পুলিশের সুরতহাল রিপোর্টেও আঘাতের কোনো উল্লেখ নেই। তবে পানিতে কেউ আহত অবস্থায় ফেলেছে কিনা তা রিপোর্টে আসবে না। নেত্রকোণা মডেল থানার ওসি আবুল খায়ের জানান, লাশ উদ্ধারের সময়কালে অপমৃত্যুর মামলা করা হয়েছে। এখন যে কল রেকর্ডটি পেয়েছি তা বিশ্লেষণ করে দেখা হচ্ছে। হত্যার আলামত পাওয়া গেলে অভিযোগের ভিত্তিতে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।