তিস্তায় নৌকা নিয়ে নামার আগে এখন আর মাছের আশায় বুক বাঁধেন না জেলে আব্দুল জলিল। জানেন, ঘণ্টার পর ঘণ্টা জাল ফেলেও হয়তো ফিরতে হবে প্রায় খালি হাতে। তবু নদীতে নামেন— পেশাটা যে তার বাপ-দাদার। কিন্তু মাছ না পাওয়ায় সেই পেশা দিয়ে এখন আর সংসার চলে না। তাই নদীর জালের বদলে কখনো ধরতে হয় অন্যের জমির কাজের হাতিয়ার, কখনো যেতে হয় ঢাকায়। শুধু আব্দুল জলিল নন, তিস্তাপাড়ের অনেক জেলের গল্প এখন প্রায় একই। নদীতে মাছ কমেছে, কমেছে তাদের আয়। সংসারের খরচ মেটাতে একে একে বদলে ফেলতে হচ্ছে দীর্ঘদিনের পেশা। কেউ দিনমজুর, কেউ কৃষিশ্রমিক, কেউ ইটভাটার শ্রমিক। কেউ অটোরিকশা চালাচ্ছেন। আবার কেউ অন্যের পুকুরে মাছ ধরার কাজ নিচ্ছেন। রাজারহাটের তিস্তাতীরবর্তী তিন ইউনিয়নে এমন অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছেন ৬৮৬টি নিবন্ধিত জেলে পরিবার। উপজেলা মৎস্য বিভাগের হিসাবে, বিদ্যানন্দ ইউনিয়নে এই পরিবারের সংখ্যা ১৭৫, ঘড়িয়ালডাঙ্গায় ৩৮০ এবং নাজিমখানে ১৩১। পুরো উপজেলায় নিবন্ধিত জেলে পরিবারের সংখ্যা ১ হাজার ৭৬৭। জেলেদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কয়েক বছর আগেও তিস্তায় মাছ ধরাই ছিল তাদের প্রধান আয়ের উৎস।
একসময় তিস্তায় রুই, কাতলা, মৃগেল, বোয়াল, আইড়, শোল, গজার, চিতল, পাবদা, টেংরা, বাচা, বাতাসি, পুঁটি, মলা, চেলা, কাঁচকি, চাঁদাসহ নানা প্রজাতির দেশীয় মাছ পাওয়া যেত। বর্তমানে এসবের অনেক প্রজাতিই আগের তুলনায় কমে গেছে। সিংগার ডাবরীহাট এলাকার জেলে মানিক বললেন, ‘নদীত মাছ ধরিয়া সংসার চালা নাগে, ছাওয়া-পোয়ার খরচা দেয়া নাগে। এই কাম ছাড়া অন্য কাম তো জানি না। এলা মাছ পাই কম। আগোত ৪০-৪৫ রকমের মাছ পাওয়া গেছিল। এলাতো ওগলা মাছ চোকোত পড়েই না।’ বিদ্যানন্দ ইউনিয়নের পাড়ামৌলা এলাকার জেলে আব্দুল জলিল ও তৈয়বখাঁ মৌজার জেলে বিজয়ের জীবনে এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে। তাদের ভাষ্যমতে, একসময় তিস্তায় মাছ শিকার করাই ছিল তাদের সংসারের একমাত্র ভরসা। এখন সেই নদী থেকে আয় না হওয়ায় অন্যের জমিতে কাজ করতে হয়।
তবে কেউ কেউ এখনো ভিন্ন পন্থায় ধরে রেখেছেন তাদের বাপ-দাদার এই পেশা। কাশেম বাজারের মোজাম্মেল ও আফজাল জেলের ভাষ্য, হামরা এলা আর নদীত যাই না, ঝরির দিনোত নদীত পানি বাইড়লে মাছ হয়। তখন যাই নদীত, আর কয়মাস পর এলাতো পানি কইমবে। মাছ আর পাওয়াই যাবার নয়। এইজন্য এলা মাইষের ডিগিত মাছ মারি দেই। এক খ্যাওয়ে ৩০০ টাকা দেয়। তাকে দিয়ে চলি কোনমতে। উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. এমদাদুল হকও মাছ কমে যাওয়ার পেছনে কয়েকটি কারণের কথা জানিয়েছেন। তার ভাষ্য, নদী দূষণ, নাব্যতা কমে যাওয়া এবং জলবায়ুর পরিবর্তনের কারণে মাছের প্রজননের অনুকূল সময় ও পরিবেশ কমে যাচ্ছে।
এর ফলে মাছের উৎপাদন কমছে এবং তার সরাসরি প্রভাব পড়ছে জেলেদের ওপর। তবে তিস্তায় এখনো নৌকা নামে, জালও ফেলা হয়। কিন্তু আগের মতো মাছ নিয়ে ঘরে ফেরেন না জেলেরা। নদীর সঙ্গে তাদের সম্পর্ক টিকে থাকলেও সেই নদী আর আগের মতো জীবিকার নিশ্চয়তা দিতে পারছে না। তাই তিস্তাপাড়ে জাল গুটিয়ে অন্য কাজের সন্ধানে বেরিয়ে পড়ছেন বহু জেলে পরিবারের মানুষ।
