জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশের অংশগ্রহণকে সফল হিসেবে তুলে ধরেছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির। তিনি বলেন, চার দিনের নিউইয়র্ক সফরে প্রধানমন্ত্রী মোট ৩০টি আন্তর্জাতিক কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছেন। এর মধ্যে সাধারণ পরিষদের সাধারণ বিতর্কে ভাষণ দেয়ার পাশাপাশি সাতটি উচ্চপর্যায়ের সভায় বক্তব্য এবং ১১টি দেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করেছেন তিনি।
সোমবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে বাংলাদেশের প্রতিনিধিদলের অংশগ্রহণের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন প্রতিমন্ত্রী।
সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের এবারের অধিবেশন বাংলাদেশের জন্য বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ ছিল। নতুন সরকারের জন্য এটি ছিল জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে প্রথম অংশগ্রহণ। একই সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও প্রথমবারের মতো বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেন। এর মধ্য দিয়ে একই পরিবারের দুই প্রজন্মের তিনজন প্রধানমন্ত্রীর জাতিসংঘের এই বিশ্বমঞ্চে প্রতিনিধিত্বের ইতিহাস তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাধারণ পরিষদের সভাপতির দায়িত্ব পালন করায় এবারের অধিবেশনে বাংলাদেশের মর্যাদা আরও বৃদ্ধি পেয়েছে বলেও উল্লেখ করা হয়।
গত ২১ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে পৌঁছান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সফর শেষে ২৫ সেপ্টেম্বর রাতে দেশের উদ্দেশে রওনা হয়ে ২৭ সেপ্টেম্বর ভোরে তিনি দেশে ফেরেন।
প্রতিমন্ত্রী জানান, ২২ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রী দিনব্যাপী জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের বিভিন্ন উচ্চপর্যায়ের কর্মসূচিতে অংশ নেন। সকালে জাতিসংঘ মহাসচিবের আয়োজনে রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানদের সঙ্গে প্রাতরাশে অংশ নেন তিনি। পরে অন্যান্য বিশ্বনেতার সঙ্গে সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে যোগ দেন। দিনের শেষে প্রধানমন্ত্রী ও তার সহধর্মিণী যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের আয়োজিত রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান এবং তাদের সহধর্মিণীদের সম্মানে দেওয়া অভ্যর্থনায় অংশ নেন।
২৪ সেপ্টেম্বর সাধারণ বিতর্কে বাংলায় ভাষণ দেন প্রধানমন্ত্রী। তার বক্তব্যে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক উত্তরণ, দেশ পুনর্গঠনে সরকারের পুনরুদ্ধার, পুনঃস্থাপন ও পুনর্গঠন কৌশল, নারী ও তরুণদের ক্ষমতায়ন, সামাজিক সুরক্ষা, শিক্ষা, প্রযুক্তি ও উদ্ভাবন এবং এলডিসি উত্তরণে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তার বিষয়গুলো উঠে আসে।
দীর্ঘায়িত রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই সমাধানে মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের দ্রুত প্রত্যাবাসনের ওপরও গুরুত্ব দেন প্রধানমন্ত্রী। যুদ্ধ, সংঘাত ও মানবিক সংকট মোকাবিলায় সংলাপ ও বহুপাক্ষিক কূটনীতির প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন তিনি। পাশাপাশি শান্তি ও নিরাপত্তা, ফিলিস্তিন, জলবায়ু ন্যায়বিচার, উন্নয়ন অর্থায়ন, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা ও শান্তি বিনির্মাণে বাংলাদেশের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন।
এর আগে ২৩ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ মহাসচিবের উদ্যোগে আয়োজিত জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক ‘ক্লাইমেট অ্যাকশন অ্যান্ড দ্য জাস্ট ট্রানজিশন’ শীর্ষক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে অংশ নেন প্রধানমন্ত্রী। একই দিন বাংলাদেশ ও গাম্বিয়ার যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত রোহিঙ্গা সংকটবিষয়ক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকেও অংশ নেন তিনি।
ওই বৈঠকে রোহিঙ্গাদের দ্রুত ও টেকসই প্রত্যাবাসনের জন্য সুস্পষ্ট রোডম্যাপ প্রণয়ন, মিয়ানমারে সহিংসতার অবসান, বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের জন্য পর্যাপ্ত মানবিক সহায়তা এবং রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের ন্যায়বিচার ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী।
এ ছাড়া জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতির উদ্যোগে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ঝুঁকি নিয়ে আয়োজিত উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে উদ্বোধনী বক্তব্য দেন তিনি। বাংলাদেশ ও সুইডেনের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় মিডওয়াইফারি অন্তর্ভুক্তির বিষয়ক উচ্চপর্যায়ের সভাতেও অংশ নেন প্রধানমন্ত্রী। সেখানে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় মিডওয়াইফদের অন্তর্ভুক্তির গুরুত্ব এবং এ বিষয়ে সরকারের পরিকল্পনা তুলে ধরেন।
অধিবেশনের ফাঁকে তুরস্ক ও ইরানের প্রেসিডেন্ট, মালদ্বীপের ভাইস প্রেসিডেন্ট, ভুটান, পাকিস্তান, থাইল্যান্ড, ক্রোয়েশিয়া ও হাইতির প্রধানমন্ত্রী এবং কুয়েতের ক্রাউন প্রিন্সের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করেন প্রধানমন্ত্রী। সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের উপপ্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রীও প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন।
এ ছাড়া জাতিসংঘ মহাসচিব, বিশ্বব্যাংক গ্রুপের প্রেসিডেন্ট, জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক হাইকমিশনার, জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার, মিয়ানমারবিষয়ক জাতিসংঘ মহাসচিবের বিশেষ দূত, ইন্টারন্যাশনাল পিস ইনস্টিটিউটের প্রতিষ্ঠাতা, গেটস ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী, বোয়িং গ্লোবালের প্রধান নির্বাহী এবং ওয়াল স্ট্রিটের বিনিয়োগকারীদের সঙ্গেও বৈঠক করেন প্রধানমন্ত্রী।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ভাষ্য, এসব বৈঠকের মধ্য দিয়ে সংশ্লিষ্ট দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থার সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক ও সহযোগিতার নতুন সুযোগ তৈরি হয়েছে।
ব্রিফিংয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জনকূটনীতি অনুবিভাগের সচিব এম. ফরহাদুল ইসলাম এবং অতিরিক্ত পররাষ্ট্র সচিব এ. কে. এম. শহীদুল করিম উপস্থিত ছিলেন।
