একটি আইনের বিধানগুলোকে কার্যকর করতে বিধিমালার প্রণয়নের বিকল্প নেই। তাই তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন সংশোধনের পর এখন দ্রুততম সময়ের মধ্যে বিধিমালা প্রণয়ন জরুরি বলে মন্তব্য করেছেন তামাকবিরোধী নারী ফোমসমূহের সদস্যরা। রোববার শিল্পকলা একাডেমিতে নারী মৈত্রী আয়োজিত ‘‘সংশোধিত তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন ২০২৬: প্রত্যাশা ও অর্জন’’ শীর্ষক মতবিনিময় সভায় এই মন্তব্য করেন বক্তারা।
সেই সাথে বক্তারা সংসদের প্রথম অধিবেশনেই ‘ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) আইন, ২০০৫ (সংশোধিত ২০২৬)’ পাস করার জন্য সরকারকে ধন্যবাদ জানান।
সভায় জানানো হয়, বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ তামাক ব্যবহারকারী দেশ। দক্ষিণ এশিয়ার দেশসমূহের মধ্যে বাংলাদেশে তামাক ব্যবহারের হার সবচেয়ে বেশি ৩৫.৩ শতাংশ, যা ভারতে ২৮.৬ শতাংশ এবং পাকিস্তানে ১৯.১ শতাংশ। গ্লোবাল এডাল্ট টোব্যাকো সার্ভে (গ্যাটস, ২০১৭)-এর তথ্যমতে, বর্তমানে বাংলাদেশে ৩ কোটি ৭৮ লাখ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ তামাক ব্যবহার করে। টোব্যাকো এটলাস ২০২৫ এর তথ্যমতে, তামাক ব্যবহারজনিত রোগে বাংলাদেশে প্রতিবছর প্রায় ২ লাখ মানুষ মৃত্যু বরণ করে, পঙ্গুত্ব বরণ করে আরো কয়েক লাখ মানুষ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের সাম্প্রতিক গবেষণালব্ধ তথ্য অনুযায়ী ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তামাক খাত থেকে রাজস্ব আয় হয়েছিল প্রায় ৪১ হাজার কোটি টাকা পক্ষান্তরে, তামাক ব্যবহারজনিত কারণে মৃত্যু, অন্যান্য স্বাস্থ্য ক্ষতি এবং পরিবেশের ক্ষতি বছরে প্রায় ৮৭ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ রাজস্ব আয়ের তুলনায় তামাকের অর্থনৈতিক ক্ষতি দ্বিগুণেরও বেশি।
এই বাস্তবতায় গত ১০ই এপ্রিল ২০২৬ ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) আইন, ২০০৫ (সংশোধিত ২০২৬) পাস হয়েছে। তামাক নিয়ন্ত্রণে সংশোধিত এই আইন পাস অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। কিন্তু সেই আইনের পরবর্তী পদক্ষেপ অর্থাৎ বিধিমালা প্রণয়নেও একই মাত্রার গুরুত্ব ও অগ্রাধিকার প্রয়োজন।
সভায় নেওয়াজ হালিমা আরলি এমপি বলেন, বর্তমান সরকার তামাকের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে জনস্বাস্থ্যকে রক্ষা করতে বদ্ধপরিকর। সংশোধিত তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন প্রণয়নের মাধ্যমে বর্তমান সরকার তার নীতিগত ভিত্তি তৈরি করেছে। এখন এই উদ্যোগকে এগিয়ে নিতে দ্রুত বিধিমালা প্রণয়ন করা প্রয়োজন। বিধিমালা প্রণয়নের ক্ষেত্রে ইতিমধ্যে একটি কমিটি গঠিত হয়েছে। আমি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানাব, অগ্রাধিকার ভিত্তিতে যেন বিধিমালা প্রণয়নের প্রক্রিয়া দ্রুত এগিয়ে যায়।’
ফরিদা ইয়াসমিন এমপি বলেন, বাংলাদেশ ২০০৩ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এফসিটিসি -তে স্বাক্ষর করেছে, যা তামাক নিয়ন্ত্রণে বিশ্বের প্রথম আন্তর্জাতিক জনস্বাস্থ্য চুক্তি। তবে সংশোধিত তামাক নিয়ন্ত্রণ আইনে এফসিটিসি-এর সব গুরুত্বপূর্ণ দিকের প্রতিফলন এখনও নেই। বিশেষ করে তামাকশিল্পের প্রভাব থেকে জনস্বাস্থ্য নীতি সুরক্ষা, তামাকজাত পণ্যের উপাদান ও নিঃসরণ নিয়ন্ত্রণ, জনসচেতনতা এবং তামাক ছাড়তে সহায়তার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো সংশোধিত আইনে প্রতিফলিত হয়নি। তাই বিধিমালা প্রণয়নের সময় এফসিটিসি-এর বাধ্যবাধকতা ও বাস্তবায়ন নির্দেশিকাগুলো বিবেচনায় নিয়ে দেশের তামাক নিয়ন্ত্রণ কাঠামোকে আরও শক্তিশালী করা জরুরি।
হেলেন জেরিন খান এমপি বলেন, ‘সংশোধিত তামাক নিয়ন্ত্রণ আইনে এখনও কিছু গুরুত্বপূর্ণ সীমাবদ্ধতা রয়ে গেছে। ই-সিগারেট ও হিটেড টোব্যাকোসহ উদীয়মান নিকোটিন ও তামাকজাত পণ্যের নিয়ন্ত্রণ এবং খুচরা শলাকা ও খোলা তামাকজাত পণ্যের বিক্রয় নিয়ন্ত্রণের মতো বিষয়গুলো আইনে যথাযথভাবে অন্তর্ভুক্ত হয়নি। এসব পণ্য বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে তামাক ও নিকোটিন ব্যবহারের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। একইভাবে খুচরা শলাকা বিক্রির ফলে তামাকজাত পণ্য তরুণদের জন্য সহজলভ্য হয়ে উঠছে। তাই বিধিমালা প্রণয়নের সময় এসব সীমাবদ্ধতা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নিয়ে জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় প্রয়োজনীয় কার্যকর ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি।
সেলিনা সুলতানা এমপি বলেন, সংশোধিত আইনে পাবলিক প্লেস ও পাবলিক পরিবহণে শর্তসাপেক্ষে নির্ধারিত ধূমপান এলাকা রাখার সুযোগ রয়েছে। তামাক কোম্পানিগুলো যাতে বিভিন্ন কূটকৌশল অবলম্বন করে এই সুযোগের অপব্যবহার করতে না পারে, তা নিশ্চিত করতে বিধিমালায় সুস্পষ্ট ও কার্যকর নির্দেশনা থাকতে হবে।
নারী মৈত্রীর নির্বাহী পরিচালক শাহিন আকতার ডলির সভাপতিত্বে সভায় আরে উপস্থিত ছিলেন তামাকবিরোধী মায়েদের ফোরাম, তামাকবিরোধী শিক্ষক ফোরাম, তামাকবিরোধী নারী সাংবাদিক ফোরাম ও তামাকবিরোধী ইয়ূথ ফোরামের সদস্যবৃন্দ।
