নিউইয়র্ক থেকে তুরস্কের আন্টালিয়া। জলবায়ু সুবিচার, অর্থায়ন ও অভিযোজন সহায়তায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতা আদায়ে বাংলাদেশের সামনে নতুন সুযোগ। দূরত্বের চেয়ে বাংলাদেশের জলবায়ু কূটনীতির জন্য এই পথের গুরুত্ব অনেক বেশি। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি, জলবায়ু সুবিচার, অর্থায়ন এবং অভিযোজন সহায়তার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছে। এবার সেই বার্তাকে আরও সুসংগঠিতভাবে আন্তর্জাতিক আলোচনার কেন্দ্রে নেয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে আসন্ন কপ-৩১ সম্মেলনে।
বাংলাদেশের বাস্তবতা বিশ্ববাসীর কাছে নতুন নয়। বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণে দেশের অবদান তুলনামূলকভাবে কম হলেও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় বাংলাদেশকে প্রতিনিয়ত বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, নদীভাঙন, লবণাক্ততা, তাপপ্রবাহ, খরা ও অনিয়মিত বৃষ্টিপাত সব মিলিয়ে দেশের কৃষি, পানি, স্বাস্থ্য, অবকাঠামো ও মানুষের জীবনে বাড়ছে জলবায়ু ঝুঁকি।
তবে বাংলাদেশের বার্তার গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, দেশটি শুধু আন্তর্জাতিক সহায়তার অপেক্ষায় নেই। নিজস্ব সক্ষমতা বাড়ানো, প্রকৃতি ও পরিবেশ রক্ষা এবং জলবায়ু-সহনশীল উন্নয়নকে এগিয়ে নেওয়ার ওপরও জোর দেওয়া হচ্ছে।
জাতিসংঘে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলায় দেশের নিজস্ব সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছ থেকে ন্যায্য ও কার্যকর সহযোগিতার প্রত্যাশাও তুলে ধরা হয়েছে। এই অবস্থান বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক ভিত্তি তৈরি করে। কারণ জলবায়ু পরিবর্তন এখন শুধু পরিবেশের বিষয় নয়; এটি অর্থনীতি, খাদ্য নিরাপত্তা, পানি নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য, অভিবাসন ও উন্নয়নের সঙ্গেও সরাসরি যুক্ত।
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক কিছু উদ্যোগও এই প্রস্তুতির অংশ। আগামী পাঁচ বছরে ২৫ কোটি গাছ লাগানোর কর্মসূচি, বন্যা ও খরার ঝুঁকি কমাতে খাল খনন ও পুনঃখননের উদ্যোগ এবং পরিচ্ছন্ন ও সৌর জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর পরিকল্পনা, এসব উদ্যোগ জলবায়ু অভিযোজন ও পরিবেশ সুরক্ষায় দেশের অভ্যন্তরীণ প্রস্তুতির দিকটি তুলে ধরে।
এতে একটি ইতিবাচক বার্তাও যায়, বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক অর্থায়ন চাইছে, কিন্তু সেই অর্থ ব্যবহারের জন্য দেশের নিজস্ব পরিকল্পনা ও সক্ষমতা তৈরির কাজও এগিয়ে নিচ্ছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় প্রয়োজনগুলোর একটি হলো পর্যাপ্ত অর্থায়ন। কপ-২৯-এ উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য ২০৩৫ সালের মধ্যে বছরে অন্তত ৩০০ বিলিয়ন ডলার জলবায়ু অর্থায়ন সংগ্রহে উন্নত দেশগুলোর নেতৃত্ব দেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারিত হয়েছে। একই সঙ্গে সরকারি ও বেসরকারি সব উৎস মিলিয়ে বছরে ১ দশমিক ৩ ট্রিলিয়ন ডলার পর্যন্ত অর্থায়ন বাড়ানোর আহ্বান জানানো হয়েছে।
এই সিদ্ধান্ত উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি তৈরি করেছে। এখন বাংলাদেশের সামনে বড় সুযোগ হলো, এই বৈশ্বিক প্রতিশ্রুতিকে বাস্তব প্রকল্পে রূপ দেওয়ার জন্য নিজের প্রয়োজন ও অগ্রাধিকারগুলো আরও স্পষ্টভাবে তুলে ধরা।
বাংলাদেশের জন্য শুধু অর্থের পরিমাণ নয়, অর্থের ধরনও গুরুত্বপূর্ণ। জলবায়ু অভিযোজনের ক্ষেত্রে অনুদান, স্বল্পসুদের অর্থায়ন এবং সহজ শর্তের অর্থায়ন কতটা পাওয়া যাবে তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে অর্থ পাওয়ার প্রক্রিয়া সহজ, দ্রুত ও পূর্বানুমেয় হওয়াও প্রয়োজন। কারণ জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোকে যদি অতিরিক্ত ঋণের ওপর নির্ভর করতে হয়, তাহলে জলবায়ু অভিযোজনের পাশাপাশি ঋণের চাপও বাড়তে পারে। তাই আন্টালিয়ায় বাংলাদেশের কূটনীতিতে অর্থের পরিমাণের পাশাপাশি অর্থের গুণগত মান ও প্রবেশাধিকার গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে যে ক্ষতি ও ক্ষয়ক্ষতি হয়, আন্তর্জাতিক আলোচনায় সেটি ‘লস অ্যান্ড ড্যামেজ’ বা ক্ষয়ক্ষতি ও লোকসান হিসেবে পরিচিত। এই অর্থায়ন ব্যবস্থাকে কার্যকর করা বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রত্যাশা।
বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরেই জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর জন্য আন্তর্জাতিক সহায়তার প্রয়োজনীয়তার কথা বলে আসছে। এখন এই তহবিল থেকে অর্থ কীভাবে দ্রুত, সহজ ও স্বচ্ছভাবে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর কাছে পৌঁছাবে, সেই প্রশ্নে বাংলাদেশের সক্রিয় ভূমিকা রাখার সুযোগ রয়েছে।
এখানে বাংলাদেশের নিজস্ব অভিজ্ঞতাও একটি বড় শক্তি। ঘূর্ণিঝড় মোকাবিলা, দুর্যোগ প্রস্তুতি, আগাম সতর্কতা, উপকূলীয় আশ্রয়কেন্দ্র এবং স্থানীয় পর্যায়ে অভিযোজনের বহু বছরের অভিজ্ঞতা আন্তর্জাতিক জলবায়ু আলোচনায় বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ।
জলবায়ু অর্থায়ন ও কার্বন ব্যবস্থাপনাকে আরও সমন্বিত করতে ২৫ সদস্যের জাতীয় জলবায়ু অর্থায়ন কমিটি গঠনও একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। জলবায়ু অর্থায়ন, কার্বন সনদ এবং কার্বন বাণিজ্য নিয়ে সমন্বিত কাঠামো তৈরির উদ্যোগ ভবিষ্যতের জলবায়ু অর্থনীতিতে বাংলাদেশের অবস্থান শক্তিশালী করতে পারে।
কার্বন সনদের আন্তর্জাতিক বাজার বাংলাদেশের জন্য নতুন অর্থনৈতিক সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে। তবে এর সঙ্গে স্বচ্ছতা, নির্ভুল হিসাব এবং পরিবেশগত অখণ্ডতার বিষয়টিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
কোন প্রকল্প কতটা কার্বন নিঃসরণ কমিয়েছে, সেই হিসাব নির্ভুলভাবে করা, একই কার্বন হ্রাস যেন একাধিকবার গণনা না হয় তা নিশ্চিত করা এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অধিকার রক্ষা করা, এসব ক্ষেত্রে শক্তিশালী ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারলে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের আস্থা বাড়বে।
বাংলাদেশের জলবায়ু অভিযোজনের আলোচনায় তিস্তা মহাপরিকল্পনা ও পদ্মা ব্যারাজের মতো বড় পানি ব্যবস্থাপনা প্রকল্পও গুরুত্ব পাচ্ছে। পানি সংরক্ষণ, কৃষি উৎপাদন, বন্যা ব্যবস্থাপনা ও জননিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে এসব উদ্যোগের সম্ভাব্য ভূমিকা রয়েছে।
তবে আধুনিক জলবায়ু অভিযোজনের মূল শিক্ষা হলো, একটি দেশের সব অঞ্চলের সমস্যা এক নয়। উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা ও ঘূর্ণিঝড়, হাওর অঞ্চলে আকস্মিক বন্যা, উত্তরাঞ্চলে খরা এবং শহরাঞ্চলে জলাবদ্ধতা ও তাপপ্রবাহ, প্রতিটি সমস্যার জন্য প্রয়োজন ভিন্ন ধরনের সমাধান।
তাই বড় অবকাঠামোর পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ের অভিযোজন, জলাধার সংরক্ষণ, জলবায়ু-সহনশীল কৃষি, আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা এবং নগর পানি ব্যবস্থাপনায়ও বিনিয়োগ বাড়ানো প্রয়োজন।
তিস্তা ইস্যুতে আন্তঃসীমান্ত পানি সহযোগিতার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। পানি নিরাপত্তাকে আঞ্চলিক সহযোগিতা ও কূটনীতির অংশ হিসেবে এগিয়ে নিতে পারলে বাংলাদেশের জলবায়ু ও পানি কূটনীতি আরও কার্যকর হতে পারে।
কপ-৩১ অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ৯ থেকে ২০ নভেম্বর তুরস্কের আন্টালিয়ায়। আয়োজক দেশ তুরস্ক এবং অংশীদার দেশ অস্ট্রেলিয়া মিলে সম্মেলনের প্রক্রিয়া এগিয়ে নিচ্ছে।
এর আগে বাংলাদেশ ও তুরস্কের মধ্যে উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগও হয়েছে। নিউইয়র্কে দুই দেশের শীর্ষ পর্যায়ের বৈঠকে অর্থনীতি, বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও পারস্পরিক স্বার্থের বিভিন্ন বিষয় আলোচনায় এসেছে। একই সময়ে কপ-৩১-এ বাংলাদেশের অংশগ্রহণ নিয়েও কূটনৈতিক যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে আন্টালিয়া বাংলাদেশের জন্য কেবল জলবায়ু সম্মেলন নয়; বরং জলবায়ু অর্থায়ন, অভিযোজন, প্রযুক্তি ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার নতুন ক্ষেত্র তৈরির একটি সুযোগ।
বাংলাদেশ এখানে তিনটি বিষয়কে বিশেষ গুরুত্ব দিতে পারে। প্রথমত, জলবায়ু অর্থায়নে পরিমাণের পাশাপাশি অর্থের ধরন, সহজ প্রবেশাধিকার ও পূর্বানুমেয়তা নিশ্চিত করার দাবি জোরালো করা। দ্বিতীয়ত, ক্ষয়ক্ষতি ও লোকসানের তহবিল থেকে দ্রুত ও কার্যকর অর্থায়নের ব্যবস্থা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া, যাতে জলবায়ু ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলো বাস্তব সুবিধা পায়।
তৃতীয়ত, বাংলাদেশের নিজস্ব অভিযোজন প্রকল্পগুলোর একটি সুসংগঠিত তালিকা, সম্ভাব্য ব্যয়, প্রত্যাশিত ফলাফল এবং জনগণের ওপর প্রভাব স্পষ্টভাবে আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সামনে তুলে ধরা।
নিউইয়র্কের বার্তা থেকে আন্টালিয়ার বাস্তবতা: বাংলাদেশের জলবায়ু কূটনীতি এখন এমন একটি পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে শুধু ঝুঁকির কথা বলাই যথেষ্ট নয়; নিজের সক্ষমতা, পরিকল্পনা ও অগ্রাধিকারও তুলে ধরতে হবে।
নিউইয়র্কে বাংলাদেশের বার্তা ছিল, দেশটি জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে নিজস্ব সক্ষমতা বাড়াচ্ছে এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার জন্যও সক্রিয় রয়েছে। আন্টালিয়ায় সেই বার্তাকে বাস্তব আলোচনার মাধ্যমে আরও এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা, দুর্যোগ মোকাবিলায় অর্জন এবং অভিযোজন সক্ষমতা আন্তর্জাতিক জলবায়ু আলোচনায় দেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ শক্তি। এর সঙ্গে যদি স্বচ্ছ অর্থ ব্যবস্থাপনা, শক্তিশালী প্রকল্প প্রস্তুতি এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা যুক্ত হয়, তাহলে আন্তর্জাতিক জলবায়ু অর্থায়নের সুযোগগুলো আরও কার্যকরভাবে কাজে লাগানো সম্ভব।
কপ-৩১ তাই বাংলাদেশের জন্য শুধু দাবি জানানোর মঞ্চ নয়; এটি নিজের সক্ষমতা তুলে ধরার, নতুন অংশীদারত্ব গড়ে তোলার এবং জলবায়ু অভিযোজনকে আরও অর্থবহ করার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ।
শেষ পর্যন্ত জলবায়ু কূটনীতির সাফল্য শুধু সম্মেলনের ঘোষণায় নয়, প্রতিশ্রুতি থেকে অর্থ, অর্থ থেকে প্রকল্প এবং প্রকল্প থেকে মানুষের জীবনে বাস্তব পরিবর্তন তৈরির মধ্যেই তার মূল্যায়ন হবে। নিউইয়র্ক থেকে আন্টালিয়া পর্যন্ত বাংলাদেশের কূটনৈতিক যাত্রা সেই বাস্তব পরিবর্তনের পথকে আরও শক্তিশালী করার একটি নতুন অধ্যায় হয়ে উঠতে পারে।
লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিস্ট
E-mail: [email protected]
নিউইয়র্ক থেকে তুরস্কের আন্টালিয়া: জলবায়ু কূটনীতিতে বাংলাদেশের নতুন সম্ভাবনা
নিয়াজ মাহমুদ
মত-মতান্তর
১ ঘন্টা আগে
২৭ সেপ্টেম্বর (রবিবার), ২০২৬, ৪ঃ০৯ (অপরাহ্ণ)
লিংক কপি হয়েছে!
ফন্ট সাইজ:
100%
