মিরপুর স্বাস্থ্যকেন্দ্রে খোলা আকাশের নিচে টিকা কার্যক্রম

ফন্ট সাইজ:

নিরাপত্তাকর্মীদের বেঁধে রেখে মধ্যরাতে ভাঙচুর ও যন্ত্রপাতি, ওষুধ, ভ্যাকসিন, নগদ টাকা ও মালপত্র লুটের পর ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয় রাজধানীর মিরপুরের রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টার। সেই ধ্বংসস্তূপেই পড়ে আছে শিশুদের জন্য সংরক্ষণ করা ভ্যাকসিন, খালি সিরিঞ্জ-সুঁচ আর নষ্ট হওয়া মেডিকেল যন্ত্রপাতি। ধ্বংস হওয়া স্বাস্থ্যকেন্দ্রের সামনেই চেষ্টা চলছে স্বাস্থ্যসেবা চালিয়ে নেয়ার। কেন্দ্রের ভবন ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় খোলা আকাশের নিচেই ত্রিপল টানিয়ে শিশুদের টিকাদান কার্যক্রম চালানো হয়েছে গতকাল। শিশুদের নিয়মিত টিকাদান যাতে বন্ধ না হয়, সে জন্য অস্থায়ীভাবে এ ব্যবস্থা। তীব্র গরম, ভাঙাচোরা ইট-কংক্রিটের মাঝেই চলছে কার্যক্রম। এমন পরিস্থিতিতে ভোগান্তিতে পড়ে যান টিকা নিতে যাওয়া অভিভাবক, শিশু ও স্বাস্থ্যকর্মীরা। শনিবার সরজমিন ভেঙে যাওয়া টিকাকেন্দ্র ঘুরে এসব চিত্র দেখা গেছে।

দুপুরে স্বাস্থ্যকেন্দ্রতে গিয়ে দেখা যায়, সেন্টারের মূল ফটকের বাইরে খোলা জায়গায় কয়েকটি টেবিল ও চেয়ার রাখা। মাথার উপর ত্রিপল টানিয়ে তৈরি করা হয়েছে অস্থায়ী টিকাদানকেন্দ্র। টিকা দেয়ার জন্য রাখা চেয়ারে বসে কেউ কেউ অপেক্ষা করছিলেন, কেউ দাঁড়িয়ে ছিলেন। গরমে অস্বস্তিতে পড়ে যায় শিশুরা। টিকার টেবিলের পেছনের একটি সাইনবোর্ড টানানো আছে। সেখানে লেখা ছিল- এই প্লটের মালিক সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতি লিমিটেড। সেখানে গভর্নমেন্ট রেজিস্ট্রেশন নম্বর, নিবন্ধন নম্বর, জমির পরিমাপসহ প্লটের তফসিল লেখা ছিল। স্থানীয়রা জানিয়েছেন, দুর্বৃত্তরা রাতে ভাঙচুর চালিয়ে সঙ্গে সঙ্গে এই সাইনবোর্ড টানিয়ে দিয়েছে। টিকাদানকেন্দ্রের বিভিন্ন জায়গায় দুইটি সাইনবোর্ড ও একটি ব্যানার লেখা ছিল একই রকমের।

কেন্দ্রের কর্মকর্তারা জানান, শনিবার প্রায় ১১০ জনের বেশি মানুষকে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবাসহ বিভিন্ন সেবা দেয়া হয়েছে। মিরপুরের বাইরেও রাজধানীর বাইরের বিভিন্ন এলাকা থেকেও অনেকে টিকা নিতে এ কেন্দ্রে এসেছেন। সেখানকার চিকিৎসকরা বলছেন, শনিবার চারজন চিকিৎসক ও প্রায় ১৫ জন স্বাস্থ্যকর্মী টিকাদান কার্যক্রম চালাচ্ছেন। সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির পাশাপাশি হাম-রুবেলা টিকা পূরণ কর্মসূচি ২০২৬-এর টিকাদানও করা হচ্ছে। এ ছাড়া গর্ভবতী ও প্রসবোত্তর মায়েদের সেবা এবং মা ও শিশুর স্বাস্থ্য ও পুষ্টিসেবা চালুর উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে।

রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারের নির্বাহী পরিচালক ড. নাসরিন আখতার বলেন, ভবন ভেঙে ফেলার পর ফাঁকা জায়গায় অস্থায়ীভাবে টিকাদানের ব্যবস্থা করা হয়েছে। আশপাশের বাসিন্দারাও এ কাজে সহযোগিতা করছেন। তবে টিকাদান ছাড়া অন্যান্য চিকিৎসাসেবা আগের মতো দেয়া সম্ভব হচ্ছে না।

সন্তানকে নিয়ে টিকা দিতে আসা নাসরিন আখতার বলেন, আগেরবার স্বাস্থ্যকেন্দ্রের ভেতরে বসে টিকা দেয়া গেলেও এবার কেন্দ্রটি ভেঙে দেয়ায় বাইরে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে। বাচ্চার এমনিতেই ঠান্ডা-জ্বর। তার ওপর তীব্র গরমে হাঁসফাঁস লাগছে নিজেরই। শিশুর তো কষ্ট হচ্ছেই। আফসানার বাচ্চার বয়স ১৫ মাস। তিনি শনিবার সকালে গাজীপুর থেকে ঢাকায় এসেছেন শিশুকে টিকা দিতে। আফসানা বলেন, স্বাস্থ্যকেন্দ্র ভেঙে ফেলার পর ভেবেছিলাম টিকাই দেয়া যাবে না। কিন্তু, একটু কষ্ট হলেও টিকা দেয়া গেছে এটা ভেবে স্বস্তি লাগছে।

এদিকে স্বাস্থ্যকেন্দ্রের ভেতরে গিয়ে দেখা যায়, শিশু ও মায়েদের জন্য সংরক্ষণ করা টিকার শত শত শিশি পড়ে আছে মেঝেতে। বেশির ভাগই ভেঙে গেছে। স্বাস্থ্যসেবা সচেতনতামূলক বিভিন্ন ব্যানার লিফলেট ভেঙেচুরে পড়ে আছে। পুরো ভবনের কোনো দেয়াল পুরোপুরি অবশিষ্ট নেই। ভাঙা ইট-কংক্রিটের টুকরোয় ঠাসা পুরো এলাকা। শুধু স্বাস্থ্যকেন্দ্র নয়, ভবনের সামনে থাকা অনেকগুলো দোকানও ভেঙে ফেলা হয়েছে। দোকানদাররা তাদের মালামাল নিয়ে ভাঙা ভবনের সামনে রাস্তার উপর টেবিল দিয়ে নিজেদের ব্যবসা পরিচালনা করছিলেন।

ভুক্তভোগী দোকানিরা বলছেন, দোকানের মালামাল সরিয়ে নিতে মধ্যরাতে তাদের কল দেয় স্থানীয়রা। সময়মতো এসেও কেউ কেউ সব মালামাল বের করতে পারেননি বলে দাবি তাদের। ওয়ানটাইম প্যাকেজিং ব্যবসায়ী মোহাম্মদ শাহীন বলেন, আমার ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকা লোকসান হয়েছে। আমাদের জাস্ট কল করলো যে এই অবস্থা। রাত একটার সময় আমি এসেছি। তার আগে থেকেই ভাঙছিল। আরেক দোকানদার মেহেদী হাসান ঘটনার বর্ণনা দিয়ে মানবজমিনকে বলেন, বৃহস্পতিবার আমাদের আধাবেলা দোকান বন্ধ থাকে। তিনটার সময় দোকান বন্ধ করে চলে যাই। চলে যাওয়ার পর রাত সাড়ে ১২টার সময় শুনি এখানে ভাঙচুর হচ্ছে। আমাদের গার্ড ফোন দিয়েছে। বলছে এখানে ভাঙচুর হচ্ছে, আপনাদের দোকান ভাঙে কিনা আসুন। তাড়াহুড়ো করে আসলাম, এসে দেখলাম ভেতরে কেবল শব্দই শোনা যাচ্ছে ভাঙচুরের। পরে আমরা তাড়াহুড়ো করে আমাদের মালামালগুলো সরালাম। বাইরের তাদের লোকজন বললো, আপনাদের জিনিসপত্র তাড়াতাড়ি সরান। আমরা সরানোর কিছুক্ষণ পরে বুলডোজার সব সাইডটা ভাঙচুর করছে। এর মধ্যে যে যার মতো যা পারছে ভেতর থেকে বেসিন, এসিসহ চেয়ার, টেবিল, যা ছিল সব নিয়ে যাচ্ছে।
বিকাল ৫টার দিকে শাহআলী থানাধীন ‘এলাকার সচেতন নাগরিক ও ছাত্র, যুব ও গণঅধিকার পরিষদ’-এর ব্যানারে রাড্ডা হাসপাতালের হামলা ও গুঁড়িয়ে দেয়ার প্রতিবাদে মানববন্ধন করে। মানববন্ধনে নাহিদ আলম নামের এক মানববন্ধনকারী বলেন, গোয়েন্দা সংস্থা যারা আছেন তাদের কাছে আমাদের আহ্বান, আপনারা দ্রুত ব্যবস্থা নিন। আপনারা অপরাধীদের চিহ্নিত করুন, জাতির সামনে উন্মুক্ত করুন। যেন তারা আমাদের ভোটের মাধ্যমে যে সরকার নির্বাচিত হয়েছে, যেন এই সরকার কলুষিত না হয়, এই সরকারের গায়ে যেন কলঙ্কের দাগ না লাগে।

আরও পড়ুন:
অচল চুয়েট

৪ জন কারাগারে: স্বাস্থ্যকেন্দ্র গুঁড়িয়ে দেয়ার ঘটনায় গ্রেপ্তার চারজনকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। গতকাল ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. ছিদ্দিক আজাদ তাদের কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন বলে প্রসিকিউশন বিভাগের এসআই লুৎফুর রহমান জানিয়েছেন। ওই চারজন হলেন- মো. সোহেল (২২), মো. জুয়েল (২৩), মো. জিহাদ হাসান (২১) ও মো. রাব্বি (২০)। এর আগে এ বিষয়ে শাহআলী থানায় একটি মামলা করেন রাড্ডার নির্বাহী পরিচালক নাসরিন আখতার। মামলায় স্থানীয় বিএনপি নেতা হানিফসহ ২০০/২৫০ জনকে আসামি করা হয়। শুক্রবার রাতে একাধিক অভিযান চালিয়ে আসামিদের গ্রেপ্তার করা হয়। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা শাহআলী থানার এসআই মো. আতোয়ার রহমান তাদের কারাগারে পাঠানোর আবেদন করেন।

স্বাস্থ্যকেন্দ্র ভাঙার ঘটনায় ‘পুলিশের গাফিলতি’ খতিয়ে দেখা হচ্ছে: শনিবার ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমদ জানান, রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টার গুঁড়িয়ে দেয়ার ঘটনায় পুলিশের কোনো অবহেলা বা গাফিলতি ছিল কি না, তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। এজন্য ৩ সদস্যের কমিটি করা হয়েছে। মোসলেহ উদ্দিন আহমদ বলেন, গভীর রাতের এ ঘটনা প্রতিরোধ করা অবশ্যই পুলিশের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। খবর পাওয়ার পর পুলিশ কতো দ্রুত পৌঁছেছিল বা তাদের কোনো অবহেলা কিংবা গাফিলতি ছিল কি না তা খতিয়ে দেখতে এডিসি দারুস সালামকে প্রধান করে ৩ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্ত কমিটিকে আজকের (শনিবার) মধ্যেই প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেয়া হয়েছে এবং গাফিলতি প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেয়ার আশ্বাস দেন তিনি। ঘটনাটি আধা ঘণ্টা বা এক ঘণ্টায় ঘটানো সম্ভব নয় নয় বলে মনে করেছেন তিনি। ডিএমপি কমিশনার বলেন, ঘটনাস্থল পরিদর্শনে মনে হয়েছে, এটি সময় নিয়ে করা হয়েছে। বিশেষ করে, ভবনের দুই পাশের টিনশেড ক্ষতিগ্রস্ত ও ভাঙচুর করা হয়েছে। ভবনের বিভিন্ন জায়গায়ও ভাঙচুরের আলামত পাওয়া গেছে।

বিকাল ৫টার দিকে ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে রক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য সানজিদা ইসলাম তুলি বলেন, প্রশাসনকে বলছি ইনভেস্টিগেশনটা প্রোপার হোক। এমনকি ৩ জনের টিম গঠন করেছে। ইনভেস্টিগেশন তাড়াতাড়ি হোক এবং সত্যের উপর ভিত্তি করে প্রোপারলি প্রশাসন ব্যবস্থা গ্রহণ করুক। অন্যায় যেই করুক, এটা আওয়ামী লীগ, জামায়াত, বিএনপি যার নাম ধরেই করুক, অন্যায়কে প্রশ্রয় দেয়া যবে না।

শনিবার রাজধানীর কড়াইলে হাম-রুবেলার বিশেষ টিকাদান কর্মসূচির উদ্বোধন অনুষ্ঠান শেষে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন বলেছেন, রাতের আঁধারে মিরপুরের ক্লিনিক রাড্ডা ভেঙে দেয়া অনাকাঙ্ক্ষিত। জমি নিয়ে বিরোধ থাকতেই পারে। কিন্তু এর মানে এই না যে রাতের আঁধারে ভেঙে দিতে হবে। এ ঘটনার ব্যাপারে ব্যবস্থা নেয়া উচিত।