নয়াদিল্লির ছায়া থেকে বেরিয়ে নতুন পথে বাংলাদেশ

ডনের নিবন্ধ

নয়াদিল্লির ছায়া থেকে বেরিয়ে নতুন পথে বাংলাদেশ

ফন্ট সাইজ:

বিগত ৫৪ বছর ধরে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির গল্প মূলত এক দিকেই লেখা হয়েছে- নয়াদিল্লিমুখী। এর পেছনে ঐতিহাসিক বাস্তবতাও ছিল। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনে ভারতের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। স্বাধীনতার পর বিভিন্ন সরকার, বিশেষ করে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন দীর্ঘ আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে, ভারতের সঙ্গে এমন ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে ওঠে যে, দুই দেশের আমলাতন্ত্র, নিরাপত্তা ও বাণিজ্যিক যোগাযোগের ক্ষেত্রেও এর ছাপ স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
বাংলাদেশি আমলাদের একটি অংশ ভারতের বিভিন্ন একাডেমিতে প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। দুই দেশের নিরাপত্তা সংস্থার মধ্যে সহযোগিতা ও সমন্বয়ও হয়েছে। বাণিজ্যের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের যোগাযোগব্যবস্থা অনেকাংশে ভারতের বন্দর ও ভূখণ্ডকেন্দ্রিক হয়ে উঠেছিল। এটি ছিল অংশীদারিত্ব। তবে বাংলাদেশের বহু সাধারণ মানুষের কাছে সেই ঘনিষ্ঠতাই একসময় নির্ভরতার প্রতীক হয়ে উঠেছিল।

২০২৪ সালের আগস্টে সেই বাস্তবতায় বড় পরিবর্তন আসে। ছাত্র নেতৃত্বাধীন আন্দোলনের মুখে শেখ হাসিনা সরকারের পতন ঘটে। এরপর নোবেলজয়ী মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর ঢাকা ভারতের বাইরে অন্যান্য সম্ভাব্য অংশীদারের দিকে নতুন করে তাকাতে শুরু করে।
একসময় যে পাকিস্তান ছিল বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে প্রায় অনুচ্চারিত এক প্রতিবেশী, সেই পাকিস্তানও আলোচনার টেবিলে ফিরে আসে। এটি ছোট কোনো পরিবর্তন নয়।
নয়াদিল্লির কিছু বিশ্লেষক যেভাবে বিষয়টিকে ষড়যন্ত্র কিংবা বিশ্বাসঘাতকতা হিসেবে দেখছেন, বিষয়টি তেমন নয়। বরং একটি সার্বভৌম রাষ্ট্র তার পররাষ্ট্রনীতিকে বহুমুখী করার চেষ্টা করছে।
বিশ্বের প্রায় সব রাষ্ট্রই নিজেদের স্বার্থে একাধিক দেশের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলে, ঝুঁকি ভাগ করে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী অংশীদার নির্বাচন করে। বাংলাদেশও তার ব্যতিক্রম নয়।

পাকিস্তানের সঙ্গে নতুন যোগাযোগ
এই পরিবর্তনের বাস্তব উদাহরণও রয়েছে। ২০২৫ সালের শেষ দিকে পাকিস্তানের তৎকালীন জয়েন্ট চিফস অব স্টাফ কমিটির চেয়ারম্যান জেনারেল সাহির শামশাদ মির্জা ঢাকা সফর করেন। তিনি মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে বৈঠক করেন। বৈঠকে বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা এবং পাকিস্তানের হাইকমিশনারও উপস্থিত ছিলেন।
বৈঠকে বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা হয়। কয়েক বছর আগেও এমন বৈঠক ছিল প্রায় অকল্পনীয়। কিন্তু দুই দেশের রাজধানীই এখন মনে করছে, ১৯৭১ সালের যুদ্ধ তাদের সম্পর্কের চিরস্থায়ী সীমারেখা হয়ে থাকতে পারে না। এরপর আসে যোগাযোগের প্রশ্ন।

২০২৬ সালের শুরুতে করাচি ও ঢাকার মধ্যে সরাসরি নৌ ও বিমান যোগাযোগ পুনরায় চালু হয়। এর মধ্যদিয়ে ১৪ বছরের বিরতির অবসান ঘটে। এতদিন দুই দেশের পণ্য ও যাত্রীদের ব্যয়বহুল ও দীর্ঘ ঘুরপথে চলাচল করতে হতো।
বাংলাদেশ-চীন বাণিজ্যের ট্রানজিট পয়েন্ট হিসেবে করাচি বন্দর ব্যবহারের প্রস্তাবও দিয়েছে পাকিস্তান। কোনো একটি স্থল বা সমুদ্রপথের ওপর বাংলাদেশের নির্ভরতা কমানোর ক্ষেত্রে এটি একটি বিকল্প হতে পারে।
গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এসব উদ্যোগের কোনোটির জন্যই বাংলাদেশকে ভারতের সঙ্গে বিদ্যমান সম্পর্ক ছিন্ন করতে হয়নি। বরং ঢাকার সামনে একটি অতিরিক্ত দরজা খুলেছে।

নির্বাচনের পরও বহুমুখীকরণ
২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল জয়ী হয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের অধ্যায়ের অবসান ঘটায়। একটি নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নেয়ার পরও এখন পর্যন্ত পররাষ্ট্রনীতির এই বহুমুখীকরণ থেমে যায়নি।
এটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এতে বোঝা যায়, নীতিটি শুধু কোনো অন্তর্বর্তী সরকারের সিদ্ধান্ত হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকেনি। নির্বাচনের মধ্যদিয়েও এর ধারাবাহিকতা বজায় রয়েছে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশই একই ধরনের বহুমুখী কূটনীতি অনুসরণ করে। ভিয়েতনাম যেমন চীন ও যুক্তরাষ্ট্র- দুই দেশের সঙ্গেই সম্পর্ক বজায় রাখে। ভারতও একই সময়ে রাশিয়ার কাছ থেকে তেল কেনে এবং যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে অস্ত্র সংগ্রহ করে।

সুতরাং বাংলাদেশ ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখেও পাকিস্তান, চীন ও তুরস্কের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ালে সেটিকে অস্বাভাবিক বলা কঠিন। এটি বরং একটি রাষ্ট্রের নিজের কূটনৈতিক পরিসর বাড়ানোর প্রচেষ্টা।
বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক বাড়ানোর ক্ষেত্রে পাকিস্তানের জন্য সুযোগ তৈরি হয়েছে। তবে এখানে উচ্ছ্বাসের চেয়ে সংযম বেশি প্রয়োজন।
বাংলাদেশের কৌশলগত চিন্তায় ভারতের জায়গা দখল করা পাকিস্তানের লক্ষ্য হওয়া উচিত নয়। বরং বাণিজ্য, প্রতিরক্ষা শিল্পে সহযোগিতা, প্রশিক্ষণ ও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিময়ের মতো বাস্তব ক্ষেত্রগুলোতে দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক গড়ে তোলা বেশি কার্যকর হতে পারে।
অর্গানাইজেশন অব ইসলামিক কো-অপারেশন বা ওআইসি’র মতো আন্তর্জাতিক ফোরামেও দুই দেশ অভিন্ন স্বার্থে সহযোগিতা করতে পারে।

আওয়ামী লীগ সরকারের সময় পাকিস্তান বাংলাদেশি কর্মকর্তাদের বিভিন্ন প্রশিক্ষণ ও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিময় কর্মসূচিতে আমন্ত্রণ জানিয়েছিল। সে সময় এসব উদ্যোগ খুব বেশি সাড়া পায়নি। এখন পরিস্থিতি বদলেছে। ইসলামাবাদের উচিত এই পরিবর্তনকে বাস্তববাদী ও সংযতভাবে কাজে লাগানো।
বাংলাদেশের ভেতরে ও বাইরে অনেকেই সতর্ক করছেন যে, ইসলামাবাদের দিকে বেশি ঝুঁকে পড়লে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি ও ক্ষত নতুন করে সামনে আসতে পারে। একইভাবে চীনের প্রতিরক্ষা ও প্রযুক্তি ব্যবস্থার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়ালে বাংলাদেশ নয়াদিল্লি ও বেইজিংয়ের বৃহত্তর প্রতিদ্বন্দ্বিতার অংশ হয়ে পড়তে পারে- এমন আশঙ্কাও রয়েছে।
এসব উদ্বেগকে উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। পাকিস্তানেরও উচিত এগুলোকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা। তবে এটাও সত্য যে পররাষ্ট্রনীতিতে সব ধরনের সম্পর্কেরই ঝুঁকি রয়েছে। ভারতের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতারও নিজস্ব ঝুঁকি ছিল। দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশ সেই ঝুঁকিগুলো বহন করেছে। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর সেই বাস্তবতার কিছু দিক আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হতে পারে, কোনো একটি দেশের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল না হয়ে কীভাবে সবার সঙ্গে কার্যকর সম্পর্ক বজায় রাখা যায়।
এই পরিবর্তনকে শুধু ভারত-পাকিস্তান বা ভারত-চীন প্রতিযোগিতার চশমায় দেখলে বিষয়টির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক আড়ালে থেকে যায়।
মূল বিষয়টি হলো, বাংলাদেশ তার পররাষ্ট্রনীতিতে আরও বেশি বিকল্প তৈরি করতে চাইছে। যে দেশ পাঁচ দশক ধরে অনেকাংশে অন্য একটি শক্তিশালী প্রতিবেশীর প্রভাববলয়ের মধ্যে ছিল, সে দেশ এখন নিজের কূটনৈতিক পরিসরকে আরও বিস্তৃত করার চেষ্টা করছে।
পাকিস্তান সেই নতুন দরজাগুলোর একটি। তুরস্ক আরেকটি। চীনও গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র ও বৃহত্তর পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গেও বাংলাদেশের সম্পর্কের গুরুত্ব রয়েছে।

এই বহুমুখীকরণের অর্থ ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করা নয়। বরং এর অর্থ হলো, ভারতের পাশাপাশি অন্যদের সঙ্গেও বাংলাদেশের নিজস্ব স্বার্থে সম্পর্ক রাখা।
শেষ পর্যন্ত এই নীতি কতোদূর যাবে, তা নির্ধারণ করবে বাংলাদেশের জনগণ ও তাদের নির্বাচিত সরকার। ইসলামাবাদ বা বেইজিং নয়।
একটি আত্মবিশ্বাসী বাংলাদেশ যদি নিজের সার্বভৌমত্বের জায়গা থেকে পাকিস্তানের সঙ্গে কথা বলতে পারে, আবার একইসঙ্গে ভারতের সঙ্গে সম্পর্কও বজায় রাখে, তবে সেটিকে শুধু কোনো দেশের বিরুদ্ধে অবস্থান হিসেবে দেখার প্রয়োজন নেই। বরং এটি দক্ষিণ এশিয়ায় একটি রাষ্ট্রের নিজের পররাষ্ট্রনীতির পরিসর নির্ধারণের স্বাভাবিক প্রয়াস হিসেবেও দেখা যেতে পারে।

বাংলাদেশের সামনে এখন প্রশ্ন একটাই- কোনো একক শক্তির ছায়ায় থাকা, নাকি নিজের স্বার্থে একাধিক শক্তির সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি করা। সেই সিদ্ধান্ত শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশেরই।

লেখক: ড. কামার চিমা, এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর, সানোবর ইনস্টিটিউট।
(ডন থেকে অনূদিত)