একজন ‘যুদ্ধাপরাধী’, জাতিসংঘে বয়কট, মামদানির ইউটার্ন, নেতানিয়াহু নন- গ্রেপ্তার হলেন বিক্ষোভকারীরা

মন্তব্য প্রতিবেদন

একজন ‘যুদ্ধাপরাধী’, জাতিসংঘে বয়কট, মামদানির ইউটার্ন, নেতানিয়াহু নন- গ্রেপ্তার হলেন বিক্ষোভকারীরা

ফন্ট সাইজ:

বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে গ্রেপ্তার করা হলো না। গ্রেপ্তার করা হলো তার সফরের বিরুদ্ধে যারা বিক্ষোভ করছিলেন তাদেরকে। কমপক্ষে ৭৩ হাজার ৯শত ২৮ জন ফিলিস্তিনিকে নৃশংসভাবে হত্যা করার পরও নেতানিয়াহু নিজের কোনো দোষ খুঁজে পেলেন না। উল্টো তিনি গাজায় নিজেদের ভূখণ্ড রক্ষা, অধিকার আদায়ের দাবিতে লড়াইরত গাজাবাসী এবং তার সহযোগীদের সন্ত্রাসী আখ্যা দিলেন। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি) মানবতা বিরোধী অপরাধ, যুদ্ধাপরাধের দায়ে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে অভিযুক্ত করেছেন। এমনকি তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছেন। তিনি নিউ ইয়র্কে গেলে গ্রেপ্তার করার হুমকি দিয়েছিলেন নিউ ইয়র্কের মুসলিম মেয়র জোহরান মামদানি। নেতানিয়াহু নিউ ইয়র্ক গেলেন। জাতিসংঘের অধিবেশনে যোগ দিলেন। সেখানে তিনি ঔদ্ধত্য দেখিয়ে গাজাবাসী, তাদেরকে সমর্থনকারীদের সন্ত্রাসী আখ্যা দিলেন। তার বক্তব্যের প্রতিবাদে প্রায় ৭০টি দেশের প্রতিনিধিরা অধিবেশন বয়কট করলেন। তাদেরকে নিয়েও রক্তাক্ত ভ্যাম্পায়ারের মতো যেন অট্টহাসি করলেন বিশ্বমঞ্চে নেতানিয়াহু। আর অধিবেশন স্থলের বাইরে রাজপথে হাজার হাজার মানুষ তার বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করলেন। মামদানি নির্বাচনের আগে এবং পরে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন নেতানিয়াহুকে গ্রেপ্তার করার। কিন্তু তিনিও বোল পাল্টে ফেললেন। গ্রেপ্তার করা হলো না নেতানিয়াহুকে। উল্টো গ্রেপ্তার করা হলো বিক্ষোভকারীদের। এর মধ্য দিয়ে প্রমাণ হয়ে গেল ‘জোর যার, মুল্লুক তার’। বৃহস্পতিবার জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর অংশগ্রহণের প্রতিবাদে নিউইয়র্ক শহরে বিক্ষোভ চলাকালে কয়েক ডজন মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। জাতিসংঘের সদর দপ্তরের বাইরে জিউশ ভয়েস ফর পিস এবং প্যালেস্টিনিয়ান ইয়ুথ মুভমেন্ট আয়োজিত মিছিলসহ শহরের বিভিন্ন স্থানে অনুষ্ঠিত বিক্ষোভে হাজার হাজার মানুষ অংশ নেন। জাতিসংঘের দিকে যাওয়া একটি প্রধান সড়ক অবরোধ করে অবস্থান কর্মসূচি পালনকালে যেসব বিক্ষোভকারীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে তার মধ্যে আছেন অভিনেত্রী সুসান সারান্ডন ও হান্না আইনবিন্ডার, অধিকারকর্মী ও হুইসেলব্লোয়ার চেলসি ম্যানিং।

হাতকড়া পরিয়ে নিউইয়র্ক পুলিশ বিভাগের (এনওয়াইপিডি) এক কর্মকর্তা আইনবিন্ডারকে নিয়ে যাওয়ার সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত একটি ভিডিওতে তাকে বলতে শোনা যায়, ‘নেতানিয়াহু নিউইয়র্ক থেকে বের হয়ে যাও, লেবাননে বোমা হামলা বন্ধ করো, ইরানে বোমা হামলা বন্ধ করো, গণহত্যা বন্ধ করো।’ নিউইয়র্ক সিটি কাউন্সিলের সদস্য ও রাজনৈতিক প্রার্থীদেরও গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তাদের মধ্যে আছেন আলেক্সা আভিলেস, লিন্ডা সারসুর, জেনিফার গুতিরেজ, চি ওসে, দারিয়ালিজা আভিলা-শেভালিয়ে এবং অ্যাবের কাওয়াস। জিউশ ভয়েস ফর পিস এবং ডেমোক্রেটিক সোশ্যালিস্টস অব আমেরিকা জাতিসংঘের কাছে সড়কে যান চলাচল বন্ধ করে দেয়। তাদের পরনে ছিল ‘বোমা নয়, মানুষের জন্য অর্থায়ন করুন’ লেখা টি-শার্ট। তারা গাজায় ইসরাইলের গণহত্যা এবং ইরানের বিরুদ্ধে চলমান যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল যুদ্ধের প্রতিবাদ জানায়। গ্রেপ্তারের কয়েক ঘণ্টা পর নিউইয়র্ক অঙ্গরাজ্যের সিনেট প্রার্থী কাওয়াস বলেন, ‘আমার বিশ্বাস, সবারই রাস্তায় নেমে আসা উচিত।’ তিনি বলেন, বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর উপস্থিতির বিরুদ্ধে আরও বেশি নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির কথা বলা প্রয়োজন। একজন যুদ্ধাপরাধী নিউইয়র্ক অঙ্গরাজ্যে, নিউইয়র্ক শহরে উপস্থিত। কাওয়াস বলেন, আমি গর্বিত যে প্রতিবাদে অংশ নিয়েছি, এমনকি গ্রেপ্তারের মুখোমুখি হয়েছি। কারণ আমি মনে করি, এই মুহূর্তে নৈতিকভাবে সঠিক অবস্থানের পক্ষে আরও বেশি মানুষকে দাঁড়াতে হবে। আমরা সেই বার্তাই দিচ্ছি।

উল্লেখ্য, নেদারল্যান্ডসের দ্য হেগে অবস্থিত আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি) ২০২৪ সালের নভেম্বরে নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে। তার বিরুদ্ধে অন্তত ২০২৩ সালের ৮ অক্টোবর থেকে যুদ্ধের অস্ত্র হিসেবে অনাহারকে ব্যবহার, হত্যা, নিপীড়ন এবং বেসামরিক নাগরিকদের ওপর হামলার নির্দেশ দেয়ার মতো অভিযোগ আনা হয়। কাওয়াসের সঙ্গে গ্রেপ্তার হওয়া ইবতেহালও প্যালেস্টাইনিয়ান ইয়ুথ মুভমেন্টের নিউইয়র্কভিত্তিক একজন পরিচিত সংগঠক। ইবতেহাল বলেন, আমরা প্রতিবাদ করছিলাম এই কারণে যে একজন যুদ্ধাপরাধী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে কোনো জবাবদিহির মুখোমুখি করা হয়নি। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এই যুদ্ধাপরাধীকে গ্রেপ্তার করেনি এবং তার সংঘটিত অপরাধের জন্য কোনো নিষেধাজ্ঞা বা অস্ত্র নিষেধাজ্ঞাও আরোপ করেনি।

জোহরান মামদানি কিভাবে এত তাড়াতাড়ি তার প্রতিশ্রুতি ভুলে গেছেন। কিভাবে তিনি ইউটার্ন নিলেন তা নিয়েও আছে বিস্তর সমালোচনা। নির্বাচনী প্রচারের সময় তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তার প্রশাসন শহরের পুলিশ ব্যবহার করে নেতানিয়াহুকে গ্রেপ্তার করবে। কিন্তু নির্বাচিত হওয়ার প্রায় আট মাস পর জুলাইয়ে তিনি ঘোষণা করেন, আইসিসির জারি করা গ্রেপ্তারি পরোয়ানা কার্যকর করার আইনগত ক্ষমতা নিউইয়র্ক শহরের নেই। এটা যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল সরকারের বিষয়। বিক্ষোভ চলাকালে মামদানি গাজা থেকে আসা ফিলিস্তিনি পরিবারগুলোর সঙ্গে গ্রেসি ম্যানশনে একটি জলপাইগাছ লাগানোর ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করেন। গ্রেসি ম্যানশনই নিউইয়র্কের মেয়রের সরকারি বাসভবন। ফিলিস্তিনিদের নেতৃত্বাধীন কমিউনিটি সংগঠন ‘উইদিন আওয়ার লাইফটাইমে’র প্রতিষ্ঠাতা নারদিন কিসওয়ানি মামদানির ওই ভিডিওর সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, এটি নেতানিয়াহুকে গ্রেপ্তারের প্রতিশ্রুতি দিয়ে নির্বাচনী প্রচার চালানোর সম্পূর্ণ বিপরীত। তিনি লিখেছেন, এই লোকদেখানো কর্মকাণ্ড আসলে এই সত্য থেকে মানুষের দৃষ্টি সরানোর চেষ্টা যে আজ শত শত এনওয়াইপিডি গাড়ি নেতানিয়াহুকে জাতিসংঘে নিয়ে গেছে এবং তাকে এমন জাঁকজমকপূর্ণ অভ্যর্থনা দিয়েছে, যা অধিকাংশ- সম্ভবত কোনো কোনো ক্ষেত্রেই সব রাষ্ট্রপ্রধানও পান না।

নেতানিয়াহুকে গ্রেপ্তার করার পরিবর্তে এনওয়াইপিডি গ্রেপ্তার করেছে বিক্ষোভকারীদের। কিসওয়ানি লিখেছেন, মামদানি নির্বাচনে যে প্রতিশ্রুতির ভিত্তিতে প্রচার চালিয়েছিলেন, এটি তার সম্পূর্ণ বিপরীত। বিক্ষোভে অংশ নেয়া ব্যক্তিরা মিডিয়াকে বলেন, জাতিসংঘের নেতানিয়াহুকে বক্তব্য দেয়ার সুযোগ দেওয়া উচিত নয়। বরং তার দ্য হেগে গিয়ে বিচারের মুখোমুখি হওয়া উচিত। গাজায় স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে কাজ করা চিকিৎসক থায়ের আহমেদ বলেন, গাজার মানুষ শুধু রাতে ঘুমানোর চেষ্টা করছেন, আর তাদের বাড়ির ওপর ২ হাজার পাউন্ড ওজনের মার্কিন বোমা ফেলা হচ্ছে। তিনি বলেন, তাদের চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় সরবরাহ থেকেও আমরা বঞ্চিত হয়েছিলাম। এরপর একের পর এক মৃতদেহ নিয়ে আসা হচ্ছিল। আমাদের শুধু তা দেখতে হয়েছে। তিনি আরও বলেন, জাতিসংঘ তার নৈতিক কর্তৃত্ব হারিয়েছে। থায়ের আহমেদ বলেন, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে কেউ কী বলছে, তা আমাদের শোনা উচিত বলে আমি মনে করি না। বিশেষ করে বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু নামের একজন শিশুহত্যাকারীর কথা তো নয়ই।

ইহুদি নারী ক্যারল চোক-এর পরিবারের কয়েকজন সদস্য হলোকাস্টে মারা গিয়েছেন। তিনি বলেন, ইহুদিবাদ ও জায়নবাদের মধ্যে পার্থক্য আছে। তার মতে, ইহুদি ধর্মের নামে যা করা হচ্ছে, তা তার ধর্মের প্রতিনিধিত্ব করে না। তিনি বলেন, আমরা মানুষের যত্ন নিই, দান করি। যাদের প্রয়োজন, তাদের জন্য আমরা ক্ষেতের প্রান্তের ফসল রেখে দিই। আমরা একটি সম্পূর্ণ সংস্কৃতি ধ্বংস করে দিই না।

রাস্তায় যেমন বিক্ষোভ হয়েছে, তেমনি বৃহস্পতিবার জাতিসংঘ ভবনের ভেতরেও প্রতিবাদ হয়েছে। নেতানিয়াহু বক্তব্য দেয়ার জন্য মঞ্চে যাওয়ার সময় কয়েক ডজন দেশের প্রতিনিধি উঠে দাঁড়িয়ে কক্ষের দরজার দিকে চলে যান। এভাবে তারা নেতানিয়াহুর বক্তব্য বয়কট করেন। এ সময় তাকে লক্ষ্য করে দুয়োধ্বনি ও কটূক্তিও করা হয়। তবে নারীবাদী তৃণমূলভিত্তিক যুদ্ধবিরোধী সংগঠন কোডপিঙ্কের সহপ্রতিষ্ঠাতা মেডিয়া বেনিয়ামিন বলেন, নেতানিয়াহুর বক্তব্যের সময় প্রতিনিধিদের কক্ষ থেকে বেরিয়ে যাওয়া যথেষ্ট নয়। তিনি বলেন, তাদের বলতে হবে- প্রথমে আমরা ইসরাইলের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করব, এরপর ইসরাইলকে জাতিসংঘ থেকে বহিষ্কার করব। তাদের জাতিসংঘে অংশ নেয়ার অনুমতি দেয়া উচিত নয়।

নেতানিয়াহু তার বক্তব্যে ইসরাইলের সবচেয়ে বড় অংশীদার প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প- এমন মন্তব্য করার প্রসঙ্গে বেনিয়ামিন ইসরাইলের কাছে যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র বিক্রির বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, যে দেশ এখনও ইসরাইলের কাছে অস্ত্র বিক্রি করছে, সেই দেশের জনগণের উচিত তাদের সরকারকে উৎখাত করা। তিনি আরও বলেন, এটি দেখিয়ে দেয় যে ওই দেশ গণতন্ত্র নয়। কারণ সত্যিকারের গণতন্ত্র হলে আমরা ইসরাইলের কাছে ওই অস্ত্র বিক্রি করতাম না। একই সঙ্গে আমাদের জাতীয় প্রতিরক্ষা অনুমোদন আইনে এখন এমন একটি ধারা রয়েছে, যার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সামরিক বাহিনীকে আগের চেয়েও আরও ঘনিষ্ঠভাবে একীভূত করার কথা বলা হয়েছে।