মিরপুরে দখলের থাবা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে

মিরপুরে দখলের থাবা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে

ফন্ট সাইজ:

রাজধানীর মিরপুর-১ এ অবস্থিত রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে মধ্যরাতে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে। গুঁড়িয়ে দেয়া হয়েছে স্বাস্থ্যকেন্দ্রটির একটি পাকা ও তিনটি সেমিপাকা ভবনসহ পুরো স্থাপনা। গত বৃহস্পতিবার রাত ১টার দিকে মুখে মাস্ক ও মাথায় লাল কাপড় বেঁধে ২০০ থেকে ২৫০ জন দুর্বৃত্ত দেশীয় অস্ত্র নিয়ে স্বাস্থ্যকেন্দ্রটিতে হামলা চালায়। এ সময় হামলাকারীরা দুই নিরাপত্তা কর্মীকে বেঁধে ক্লিনিকের মূল্যবান যন্ত্রপাতি, ওষুধ, ভ্যাকসিন, ফ্রিজ, এসি, নগদ টাকাসহ বিভিন্ন মালপত্র লুট করে। এরপর প্রতিষ্ঠানটির সামনে ও পেছনে ‘সমমনা সমবায় সমিতি লি.’ নামে দু’টি সাইনবোর্ড টাঙিয়ে দেয়। স্বাস্থ্যকেন্দ্রটির ১০ কাঠা জমি দখল নিতেই এ হামলা চালানো হয় বলে দাবি করেছে প্রতিষ্ঠানটি। এই দখল ও হামলার নেপথ্যে সংরক্ষিত নারী আসানের সংসদ সদস্য ও ঢাকা উত্তর বিএনপি’র যুগ্ম আহ্বায়ক ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টির নাম উঠে এসেছে স্থানীয়দের বক্তব্যে।

এই স্বাস্থ্যকেন্দ্রের লিজ নিতে তিনি গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ে আবেদনও করেছিলেন। এদিকে এ ঘটনায় প্রতিষ্ঠানটির নির্বাহী পরিচালক ড. নাসরিন আখতার বাদী হয়ে একটি মামলা করেছেন। আজ থেকে স্বাস্থ্যকেন্দ্রটিতে সরকারি হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচি শুরু হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু প্রতিষ্ঠানটি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় হাম-রুবেলা ক্যাম্পেইনসহ সব ধরনের স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গেছে।
শুক্রবার সরজমিন দেখা যায়, রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারের পেছনের দেয়াল পুরোপুরি গুঁড়িয়ে দেয়া হয়েছে। ঘরগুলো ভেঙে দেয়া হয়েছে। ঘরের মধ্যে কোনো মালামাল নেই। দরজা জানালা খুলে নিয়ে গেছে। দু’টি গাছ পুরোপুরি উপড়ে ফেলা হয়েছে। পেছনের দিকে একটি আমের গাছের বড় একটি ডাল ভেঙে ফেলা হয়েছে। ওই গাছটি উপড়ে ফেলার চেষ্টা করা হয়। প্রতিষ্ঠানটির সামনে ভাঙা ইটের স্তূপ পড়ে আছে। ঘরের চালগুলো একদিকে পড়ে ছিল। প্রতিষ্ঠানটির পেছনের দিকে ১৭টি ভ্রাম্যমাণ দোকান রয়েছে।

দোকানগুলোর ত্রিপল মাটিতে গুটিয়ে রয়েছে। ওই অবস্থাতেই দোকান খুলেছিলেন মালিকরা। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, রাত ১টার দিকে ২০০ থেকে ২৫০ জন মানুষ এসে স্বাস্থ্যকেন্দ্রটির আশেপাশের পুরো এলাকা ঘিরে নেয়। তারা দায়িত্বরত গার্ড মেন্দ্রিও ও আব্দুল হাইকে মারধর করে বেঁধে রাখেন। পরে প্রতিষ্ঠানটির সব মালামাল কয়েকটি গাড়িতে করে নিয়ে যায়। একপর্যায়ে বুলডোজার দিয়ে একটি পাকা ও তিনটি সেমিপাকা ভবন ভেঙে ফেলে। লুটপাটের খবর পেয়ে দোকানের মালিকরা মালামাল সরিয়ে নিতে ঘটনাস্থলে আসেন। তাদেরকে মালামাল সরাতে ১০ মিনিট সময় দেয়া হয়। এরমধ্যে সবাই যতটুকু পেরেছে মালামাল সরিয়ে নেন।

নেপথ্যে যারা: সম্মাননা দোকানদার সমবায় সমিতি লিঃ-এর ব্যানারে স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি দখল ও লুটপাট করা হয়। সরজমিন এমন কোনো সমিতির অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। স্থানীয়দের কাছে জানতে চাইলে তারা এমন কোনো সংগঠনের নাম কখনো শুনেননি বলে জানান। সাইনবোর্ডে দেয়া ঠিকানায় গিয়েও সংগঠনটির সন্ধান পাওয়া যায়নি। এ ঘটনার পর স্থানীয়রা কেউ মুখ খুলতে রাজি না। তবে এ ঘটনায় সরকারদলীয় নেতা ও স্থানীয় সন্ত্রাসীদের নাম উঠে এসেছে। স্থানীয় পদধারী সরকারদলীয় নেতা লেলিন, হানিফ, আল আমিনের নেতৃত্বে এ হামলা চালানো হয়। হামলায় নেতৃত্ব দেয়া নেতারা ঢাকা উত্তর বিএনপি’র যুগ্ম আহ্বায়ক ও সাবেক কমিশনার ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টির অনুসারী। এর আগে স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি দখল নিতে হামলার ঘটনা ঘটে।

কয়েকজন প্রত্যক্ষদর্শী মানবজমিনকে জানান, রাত ১টার দিকে সেখানে কর্মরত কয়েকজন শ্রমিক আমাদের ফোন দিয়ে বলেন, রাড্ডা দখল করা হচ্ছে। আপনারা দ্রুত আসেন। রাড্ডার পেছনের দেয়ালেই আমাদের দোকান। আমরা সকলে দ্রুত ঘটনাস্থলে চলে আসি। এরপর আমাদের ১০ মিনিট সময় বেঁধে দেয়া হয়। এরমধ্যে যে যতটুকু পেরেছি মালামাল সরিয়ে নিয়েছি। অনেক মালামাল সরাতে না পেরে নষ্ট হয়ে যায়। তারা জানান, যারা জায়গাটি দখল করতে এসেছিল তারা সকলে এখানকার বাসিন্দা। বেশির ভাগই চেনা। কিন্তু আমরা কারও নাম বলতে পারবো না। নাম বললে কাল আর এখানে থাকতে পারবো না। তারা আমাদের মেরে ফেলবে।

দখলের অভিযোগের বিষয়ে ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি মানবজমিনকে বলেন, জায়গাটি লিজ নেয়ার জন্য আমি আবেদন করেছিলাম এটা সত্য। এ ছাড়া সম্মাননা দোকানদার সমবায় সমিতিতে আমার নাম থাকায় হয়তো অনেকে আমার নাম বলছে। তবে গত রাতের হামলার বিষয়ে আমি কিছু জানি না।

যা বলছে রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টার: প্রতিষ্ঠানটির অভিযোগ, হামলাকারীরা সরকারি ইপিআই টিকা, টিকা প্রদানের সরকারি রেজিস্টার ও নথি, পরিবার পরিকল্পনার বিভিন্ন যন্ত্রপাতি ও উপকরণ, ওষুধ ও ভ্যাকসিন, নগদ প্রায় ১১ লাখ ৪০ হাজার টাকা, প্রায় ৪৫ লাখ টাকা মূল্যের একটি আল্ট্রাসনোগ্রাম মেশিন, একটি জেনারেটর, তিনটি ফ্রিজ, তিনটি এসি, সিসিটিভি ক্যামেরা, তিনটি স্টিলের আলমারি, পাঁচটি স্টিলের ফাইল কেবিনেট, ল্যাবরেটরির যন্ত্রপাতি ও রিএজেন্ট, দু’টি টিভি, দু’টি কম্পিউটার, দু’টি ল্যাপটপ, দু’টি প্রিন্টারসহ চেয়ার-টেবিল ও অন্যান্য আসবাবপত্র নিয়ে যায়। পরে ভেকু দিয়ে একটি পাকা ও তিনটি সেমিপাকা ভবনসহ পুরো স্থাপনা ভেঙে ফেলা হয়। সেখানে ‘সম্মাননা দোকানদার সমিতি লিঃ’-এর সাইনবোর্ড লাগানো হয়। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, লুটপাট ও ভাঙচুরে যন্ত্রপাতি ও মালপত্রের ক্ষতির পরিমাণ প্রায় দেড় কোটি টাকা। ১০ কাঠা জমি দখলের উদ্দেশ্যে এ হামলা চালানো হয়েছে বলেও দাবি করেছে প্রতিষ্ঠানটি।

মানববন্ধন: এ ঘটনার প্রতিবাদে মানববন্ধন করেছেন প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তা-কর্মচারী ও স্থানীয়রা। শুক্রবার বিকাল ৫টার দিকে তারা ঘটনায় জড়িতদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি জানান। এ সময় প্রতিষ্ঠানটির নির্বাহী পরিচালক ডা. নাসরিন আখতার বলেন, সরকারের সঙ্গে অংশীদারত্বের ভিত্তিতে রাড্ডা স্বাস্থকেন্দ্রটি প্রায় ৫০ বছর ধরে এলাকার দরিদ্র, অসহায় ও শিশুদের বিনামূল্যে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা, প্রসূতি ও পরিবার পরিকল্পনা সেবা দিয়ে আসছে। এটি এলাকার হাজারো নারী ও শিশুর স্বাস্থ্যসেবার গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র ছিল। তিনি বলেন, এই প্রতিষ্ঠানটি ট্রাস্টের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। আমাদের ট্রাস্টের সঙ্গে সরকারের চুক্তি ছিল। চুক্তিতে বলা ছিল, রাড্ডা যতদিন চায় এ জমি ব্যবহার করবে। ঘটনা জানার পর আমরা পুলিশকে ফোনে জানাই। তখন পুলিশ আশ্বাস দিয়েছিল, তারা এসে সবাইকে সরিয়ে দেবে। কিন্তু তারা আমাদের সহযোগিতা করেনি।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সহায়তা করলে এই ধ্বংসযোগ্য দেখতে হতো না।

রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারের বিবৃতি: এদিকে রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারের পক্ষে প্রতিষ্ঠানটির নির্বাহী পরিচালক ডা. নাসরিন আখতার এক বিবৃতিতে এটিকে পরিকল্পিত সন্ত্রাসী হামলা হিসেবে উল্লেখ করে লুটপাটে জড়িতদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে যা ঘটেছে, তা নিছক কোনো ডাকাতি বা হামলা নয়- এটি একটি সুপরিকল্পিত সন্ত্রাসী কার্যক্রম, যা সমাজের অসহায় ও প্রান্তিক মানুষের স্বাস্থ্যসেবার অধিকার কেড়ে নেয়ার একটি জঘন্য ষড়যন্ত্র। এই হামলা শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের ওপর আঘাত নয়; এটি এই দেশের প্রতিটি গরিব মা, প্রতিটি শিশু এবং প্রতিটি অসহায় মানুষের স্বাস্থ্যসেবার অধিকারের ওপর সরাসরি আঘাত।’ দেশের সচেতন নাগরিক, মানবাধিকার সংগঠন, চিকিৎসক সমাজ ও গণমাধ্যমের প্রতি এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।

মামলা: এ ঘটনায় প্রতিষ্ঠানটির নির্বাহী পরিচালক ড. নাসরিন আখতার বাদী হয়ে মো. হানিফ মিয়ার (৫০) নামে ও অজ্ঞাত ২০০ থেকে ২৫০ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন। মামলায় উল্লেখ করেন, বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত ১২টার দিকে প্রায় ২০০ থেকে ২৫০ জন মুখোশধারী দুর্বৃত্ত ‘সম্মাননা দোকানদার সমবায় সমিতি লিঃ’-এর ব্যানারে ক্লিনিকে হামলা চালায়। তারা সেখানে কর্তব্যরত দুই নিরাপত্তাকর্মীকে জিম্মি করে ভেতরে প্রবেশ করে ভাঙচুর ও লুটপাট চালায়। এ বিষয়ে শাহ আলী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জাহাঙ্গীর আলম মানবজমিনকে বলেন, এ ঘটনায় মামলা হয়েছে। পুলিশ তদন্ত করছে। অভিযুক্তদের দ্রুত আইনের আওতায় আনা হবে।