সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক হিসেবে নিয়োগের জন্য চূড়ান্তভাবে সুপারিশ পাওয়ার পরও অনিশ্চয়তায় পড়েছেন শত শত প্রার্থী। বৃহস্পতিবার বিভিন্ন জেলায় নিয়োগপত্র দেয়া শুরু হয়। কিন্তু অনেক প্রার্থীর চূড়ান্ত ফলাফলে নাম এলেও পাননি নিয়োগপত্র। তারা ভেরিফিকেশনের কারণে নিয়োগপত্র পাননি বলে ধারণা করলেও সুনির্দিষ্ট কারণ জানেন না। নিয়োগপত্র না পাওয়ার কারণ হিসেবে কয়েকজন প্রার্থী এনএসআই ও ডিএসবি যাচাইয়ের ‘নেতিবাচক’ প্রতিবেদনের কথা উল্লেখ করেছেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেয়া পোস্টে তারা দাবি করছেন, নিরাপত্তা যাচাইয়ের পর তাদের নাম নিয়োগপত্রের তালিকায় রাখা হয়নি।
ভোলার এক প্রার্থী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বলেন, চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত হওয়ার পরও ভেরিফিকেশনের প্রতিবেদনের কারণে নিয়োগ আটকে গেছে। কী কারণে তাকে বাদ দেয়া হয়েছে। তিনি কর্তৃপক্ষের কাছে বাদ হওয়ার ব্যাখ্যা চেয়েছেন। আরেক প্রার্থী বলেন, দীর্ঘদিন ধরে যোগদানের জন্য বসে আছি। কিন্তু কোনো কারণ ছাড়াই আমাকে বাদ দেয়া হয়েছে। আবার আদৌও বাদ দেয়া হয়েছে কিনা সেটা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। নিয়োগ প্রত্যাশীদের ফেসবুক গ্রুপে অনেকেই এমন পোস্ট দিচ্ছেন। বিভিন্ন জেলার প্রার্থীদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করে অন্তত ২৭ জেলায় প্রায় ৮০০ জনের তথ্য পাওয়া গেছে; যারা নিয়োগপত্র হাতে পাননি।
নিয়োগপ্রত্যাশীদের করা দু’টি সার্ভের প্রথমটিতে দেখা যায়, চাঁদপুরে ২৭ জন, মুন্সীগঞ্জে ৩ জন, শরীয়তপুরে ৬ জন, সাতক্ষীরায় ২ জন, ঝালকাঠিতে ১২ জন, লক্ষ্মীপুরে ২ জন, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ২৪ জন, চাঁপাইনবাবগঞ্জে ৭ জন, পাবনায় ৩৫ জন, রাজবাড়ীতে ১৫ জন, ফরিদপুরে ১২ জন, বগুড়ায় ৪৮ জন, সুনামগঞ্জে ১২০ জন কুষ্টিয়ায় ১৬ জন, মানিকগঞ্জে ২২ জন এবং মাদারীপুরে ২১ জনের তথ্য পাওয়া গেছে। আরেকটি সার্ভেতে ২৭ জেলায় ৭৭৮ জনের তথ্য পাওয়া গেছে। এর মধ্যে সুনামগঞ্জে ১২০ জন, ভোলায় ৮৪, বগুড়ায় ৪৮, খুলনায় ৫৯, জামালপুরে ৫২, পিরোজপুরে ৪৫, পাবনায় ৩৫, মাগুরায় ৩৩ এবং বাগেরহাটে ২৯ জন নিয়োগপত্র না পাওয়ার কথা জানিয়েছেন। অন্য জেলাগুলোতেও কয়েকজন থেকে কয়েক ডজন পর্যন্ত প্রার্থীর একই অভিযোগ রয়েছে।
সরকারি চাকরির জন্য দীর্ঘদিন ধরেই পরীক্ষা দিচ্ছি। বয়স প্রায় শেষের দিকে, এখন এই চাকরিটা হয়েছে। কয়েক মাস ধরে অপেক্ষার পর নিয়োগের জন্য আশা দেখলাম। কিন্তু আমার পরিচিত অনেকেই নিয়োগপত্র পেলেন। আমি পেলাম না। আমাকে কী বাদ দেয়া হয়েছে নাকি পরবর্তীতে মিলবে সেই ব্যাখ্যাটাও দেয়া হচ্ছে না বলেন ভোলার এক প্রার্থী।
তবে বিষয়টিকে এখনই নিয়োগ থেকে বাদ পড়া হিসেবে দেখছে না প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর। অধিদপ্তরের মহাপরিচালক শাহীনা ফেরদৌসী জানিয়েছেন, নিয়োগপত্র ডাকযোগে পাঠানো হয়েছে। বিভিন্ন এলাকায় চিঠি পৌঁছাতে সময় লাগতে পারে। এ কারণে নির্বাচিতদের যোগদানের সময় ১লা অক্টোবর পর্যন্ত রাখা হয়েছে। এনএসআই যাচাইয়ের কারণে কাউকে বাদ দেয়া হয়েছে কি না-এমন প্রশ্নের জবাবে মহাপরিচালক বলেন, নির্দিষ্ট কোনো প্রার্থী বাদ পড়েছেন এমন তথ্য তার কাছে তখনও আসেনি। কোনো প্রার্থীর বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া গেলে বিষয়টি খতিয়ে দেখা যেতে পারে।
বিষয়টি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম। শুক্রবার এক বিবৃতিতে অভিযোগ করেন, লিখিতসহ নিয়োগের সব ধাপ সফলভাবে সম্পন্ন করার পরও অন্তত এক হাজার তরুণকে দীর্ঘ আট মাস ভেরিফিকেশনের নামে অনিশ্চয়তা ও হয়রানির মধ্যে রাখা হয়েছে এবং শেষ পর্যন্ত নিয়োগপত্র দেয়া হয়নি। তিনি সুনির্দিষ্ট ও আইনসম্মত অভিযোগ না থাকা প্রার্থীদের নিয়োগ নিশ্চিত করার পাশাপাশি বাদ দেয়ার প্রক্রিয়া ও ভেরিফিকেশনের মানদণ্ড জনসমক্ষে স্পষ্ট করার দাবি জানান।
ডাকসু ভিপি সাদিক কায়েম শুক্রবার ফেসবুক পোস্টে বলেন, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ তরুণদের ভেরিফিকেশনের নামে বাদ দেয়া চরম বৈষম্যমূলক ও অন্যায্য। কোনো সুস্পষ্ট কারণ না দেখিয়ে মেধাবী প্রার্থীদের বাদ দেয়া হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বাদ পড়া প্রার্থীদের বিষয়ে পুনঃসিদ্ধান্ত নেয়া এবং ভেরিফিকেশন প্রক্রিয়া স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক করার দাবি জানান।
উল্লেখ্য, প্রাথমিকের সহকারী শিক্ষক নিয়োগের লিখিত পরীক্ষা হয়েছিল গত ৯ই জানুয়ারি। পার্বত্য তিন জেলা বাদে দেশের ৬১ জেলায় অনুষ্ঠিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন ৬৯ হাজার ২৬৫ জন। পরে ৮ই ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত চূড়ান্ত ফলে ১৪ হাজার ৩৮৪ জনকে নিয়োগের জন্য প্রাথমিকভাবে নির্বাচিত করা হয়।
