উচ্চাশার বিপরীতে কী পেলো বিশ্ব?

ট্রাম্প-শি বৈঠক

উচ্চাশার বিপরীতে কী পেলো বিশ্ব?

ফন্ট সাইজ:

বিশ্বের শক্তিধর দুই রাষ্ট্র চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ও ডনাল্ড ট্রাম্পের বৈঠক ঘিরে পুরো বিশ্বের যে অধীর আগ্রহ ও আশা তৈরি হয়েছিল- তা বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি। গত বুধবার থেকে বিশ্ব মিডিয়ায় স্থান দখল করে ছিলেন বিশ্বের বৃহৎ অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক শক্তির এই দুই শীর্ষ নেতা।
মধ্যপ্রাচ্য সংকট, জ্বালানির দাম বৃদ্ধি, বাণিজ্য যুদ্ধ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), ইউক্রেন যুদ্ধ ও তাইওয়ান ইস্যু ঘিরে বিশ্ববাসীর যে চরম অস্থিরতা তাতে তেমন স্বস্তি আনতে পারেনি ট্রাম্প-শি’র বহুল প্রত্যাশিত এই বৈঠক।
উভয় নেতাই নিজেকে জয়ী দেখাতে ব্যস্ত ছিলেন এবং তাদের আলোচনা থেকে উল্লেখযোগ্য কোনো অগ্রগতি বা চুক্তি হয়নি।

এবারের বৈঠকের অন্যতম বাস্তব ফল হলো শুধু দুই দেশের বাণিজ্যযুদ্ধের বিরতি আরও কিছু সময় বাড়ানো। এ নিয়ে দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা কমানোর উদ্যোগকে ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। যদিও সেটা আগামী জানুয়ারি পর্যন্ত।
বর্তমানে ইরান যুদ্ধের কারণে বিশ্ব জুড়ে জ্বালানিসহ যে নানা সংকট শুরু হয়েছে তা এই শক্তিধর নেতাদের বৈঠকেও আশু সমাধান আসেনি।
বিশ্লেষকরা ধারণা করেছিলেন, ইরানের মিত্র চীন তেহরানকে রাজি করিয়ে চুক্তির মাধ্যমে যুদ্ধ বন্ধে ব্যবস্থা করবে বা ফলপ্রসূ পদক্ষেপ নেবে। তবে ইরান যুদ্ধ নিয়ে ট্রাম্প-শি’র মধ্যে আদৌ কোনো কথা হয়েছে কিনা তা এখন পর্যন্ত প্রকাশ্যে আসেনি।

উল্টো এবারের বৈঠকে তাইওয়ান ঘিরে ট্রাম্পকে পাল্টা ‘চাপ’ দিয়েছেন শি। তার ভাষ্য, তাইওয়ান ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রকে নিরপেক্ষ অবস্থানে থাকতে হবে। বেইজিং তাইওয়ানকে নিজেদের ভূখণ্ডের অংশ বলে মনে করে। এবং যেকোনো সময় প্রয়োজনে সামরিক শক্তির মাধ্যমে তাইওয়ানকে দখলে নেয়ার হুমকি দিয়েছে।
গত মে মাসের বৈঠকে শি ট্রাম্পকে সতর্ক করে বলেছিলেন, তাইওয়ান ইস্যু ভুলভাবে মোকাবিলা করলে দুই দেশ ‘সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়তে, এমনকি যুদ্ধে’ প্রবেশ করতে পারে।
এরপর ট্রাম্প তাইওয়ানের জন্য ১৪ বিলিয়ন ডলারের একটি অস্ত্র প্যাকেজ অনুমোদন পিছিয়ে দেন। এবারো তাইওয়ান ইস্যুতে যেন শি-ই এগিয়ে থাকলেন।

দুই নেতার আলোচনায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল। শি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে মিলে এআইয়ের উন্নয়নকে দায়িত্বশীলভাবে পরিচালনার আহ্বান জানিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্র ও চীন বর্তমানে এআই প্রযুক্তিতে বিশ্বে শীর্ষস্থানীয় দুই শক্তি।
মার্কিন কর্মকর্তারা চীনের দ্রুত এআই অগ্রগতি নিয়ে উদ্বিগ্ন। অন্যদিকে চীন অভিযোগ করে আসছে, যুক্তরাষ্ট্র প্রযুক্তি রপ্তানিতে বিধিনিষেধ আরোপ করে চীনের অগ্রগতি বাধাগ্রস্ত করতে চাইছে।
দুই নেতার মধ্যে এআই নিয়ে আলোচনা হয়েছে তবে এটি ব্যবহারে কোনো নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে তারা একমত হয়েছেন কিনা, তা স্পষ্ট নয়।

এর আগে অ্যানথ্রপিকের প্রধান নির্বাহী দারিও আমোদেই একটি প্রবন্ধে এআই উন্নয়নের গতি কমিয়ে নিরাপত্তা বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছিলেন। একই কোম্পানির এক শীর্ষ এআই নিরাপত্তা গবেষক সতর্ক করে বলেছিলেন, এআইয়ের কারণে মানবজাতির বিলুপ্তির ‘১০ শতাংশের বেশি’ সম্ভাবনা রয়েছে।
কিন্তু শি শুধু এআই যেন ‘সবসময় মানুষের নিয়ন্ত্রণে থাকে’, তার গুরুত্ব তুলে ধরেছেন। এর বাইরে উল্লেখযোগ্য কোনো ঘোষণা পাওয়া যায়নি।
অন্যদিকে ট্রাম্প সমপ্রতি এআইয়ের কারণে মানবজাতির বিলুপ্তির আশঙ্কাকে ‘ভাঁওতা’ বলে উড়িয়ে দিয়েছেন।
একইসঙ্গে গত প্রায় পাঁচ বছর ধরে বিশ্বের অন্যতম বড় ভূরাজনৈতিক সংকট হয়ে আছে ইউক্রেন যুদ্ধ। একদিকে রাশিয়ার ঘনিষ্ঠ মিত্র চীন, অন্যদিকে ইউক্রেনের প্রধান সামরিক ও আর্থিক সহায়তাদাতা যুক্তরাষ্ট্র। ফলে এই যুদ্ধের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ। অথচ ট্রাম্প-শি বৈঠকের এত আয়োজনের মধ্যেও ইউক্রেন যুদ্ধের অবসান নিয়ে দুই নেতার মধ্যে আদৌ কোনো আলোচনা হয়েছে কিনা, তা এখনো স্পষ্ট নয়।

তবে এই বৈঠকের দৃশ্যমান লাভের পাল্লা শি’র দিকেই ভারী বলে প্রতীয়মান। বিশ্বের পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প যেভাবে চীনা প্রেসিডেন্টকে প্রশংসায় ভাসিয়েছেন এবং উষ্ণ আতিথেয়তায় বরণ করেছেন, তা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তো বটেই, নিজ দেশেও শি’র ভাবমূর্তি আরও শক্তিশালী করতে পারে।
এবারের বৈঠক ঘিরে জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজন ও উষ্ণ কথাবার্তা হয়তো সাময়িকভাবে দুই দেশের সম্পর্কের উত্তাপ কিছুটা কমাতে পারে। কিন্তু এই আড়ম্বরের আড়ালে বিশ্বের দুই পরাশক্তির স্বার্থের সংঘাত ও আধিপত্যের প্রতিযোগিতা আগের মতোই তীব্র থাকবে। আর সেই প্রতিযোগিতার ছায়ায় বিশ্ব জুড়ে চলমান নানা সংকটের সমাধান যখন অধরাই থেকে যায়, তখন বিশ্ববাসীর হতাশ হওয়াই স্বাভাবিক।