কুমিল্লায় দেয়ালে দেয়ালে কিশোর গ্যাংয়ের নাম

দল গড়ছে সামাজিক মাধ্যমেও

কুমিল্লায় দেয়ালে দেয়ালে কিশোর গ্যাংয়ের নাম

ফন্ট সাইজ:

দেয়ালে দেয়ালে কিশোর গ্যাংয়ের নাম। টাউন হলের মাঠঘেঁষা দেয়ালের বিভিন্ন স্থানে লেখা ‘সিবিকে’, ‘ডিবিএক্স’, ‘কেজিএস’। এগুলোর প্রত্যেকটাই দুর্ধর্ষ কিশোর গ্যাং। সাম্প্রতিক অভিযানকেও যেন পাত্তাই দিচ্ছে না কুমিল্লার এসব গ্যাং। সূত্রগুলো জানাচ্ছে, দেয়ালে নাম লিখে নিজেদের পরিচয় জানানোর চেষ্টা এসব কিশোর গ্যাংয়ের। এখন দেয়ালের পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও দল গড়া ও শক্তি প্রদর্শনের তথ্য পাওয়া যাচ্ছে।

সূত্রমতে, কুমিল্লা শহরে অন্তত ২০টি গ্যাং সক্রিয়। চলতি বছরের প্রায় ৯ মাসে অন্তত ২৫টি আলোচিত অপরাধের ঘটনায় এসব দলের সদস্যদের নাম এসেছে। এ ধরনের অপরাধী চক্রের তৎপরতা চলছে এক দশকের বেশি সময় ধরে। তবে বর্তমানে কতোগুলো অপরাধী চক্র সক্রিয়, তার কোনো হালনাগাদ তালিকা নেই জেলা পুলিশের কাছে। ২০১৭-২০২৫ সাল পর্যন্ত অন্তত ১২টি হত্যাকাণ্ডে কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের নাম পাওয়া গেছে। ‘কিশোর গ্যাং’ বলা হলেও সবাই কিশোর নয়; দলনেতাসহ সদস্যদের অনেকের বয়স ১৮ বছরের বেশি।

সম্প্রতি স্কুলছাত্র ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম হত্যার পর কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা নতুন করে আলোচনায় এসেছে। এর মধ্যে বুধবার সন্ধ্যা থেকে গভীর রাত পর্যন্ত কুমিল্লার ১৮টি থানায় একযোগে অভিযান চালিয়ে পুলিশ ৬২৪ জনকে আটক করেছে। যাচাই-বাছাই শেষে বৃহস্পতিবার ৪৫১ জনকে মুচলেকায় অভিভাবকদের জিম্মায় ছেড়ে দেয়া হয়েছে। বাকি ১৭৩ জনকে বিভিন্ন অভিযোগে আদালতে পাঠানো হয়েছে।

কুমিল্লার পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান বলেন, গত বছরের ৩০শে নভেম্বর তিনি দায়িত্ব নেয়ার পর থেকে কিশোর গ্যাংয়ের ২৫০ জনের বেশি সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অনেকে দ্রুত মুক্তি পেয়ে আবার একই ধরনের অপরাধে জড়াচ্ছে। অনেকের মা-বাবাকে ডেকে মুচলেকাও নেয়া হয়েছে। নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের মতে, বড় অভিযানের পাশাপাশি নিয়মিত নজরদারি ও অপরাধের যথাযথ তদন্ত জরুরি।

দেয়ালে পরিচয়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দল: কুমিল্লা টাউন হলের পাশের মার্কেটের পেছনের মাঠঘেঁষা দীর্ঘ দেয়ালে কালো রংয়ে লেখা ‘সিবিকে’ ও ‘ডিবিএক্স’। মাঝে লাল রংয়ে ‘কেজিএস’। একটু এগোলে আবার একই নাম। দেয়ালের নিচের অংশেও লেখাগুলো আছে। মাঠের অপর পাশে কুমিল্লা মিনিস্টেরিয়াল অফিসার্স ক্লাবের সামনের দেয়ালেও ডিবিএক্স লেখা রয়েছে।

সাধারণত বিভিন্ন অনলাইন বা টিকটক-ভিত্তিক কিশোর অপরাধী চক্র এ ধরনের সাংকেতিক নাম যুক্ত করে অপরাধ জগতে এবং সামাজিক মাধ্যমে নিজেদের গ্রুপকে তুলে ধরে। এর মধ্যে সিবিকে ‘কুমিল্লা ব্রাদার্স কমিউনিটি’ নামে পুলিশের কাছে পরিচিত। ২০২৪ সালের অক্টোবরে তানজিম আবদুল্লাহ নামের এক গ্যাং নেতাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তখন পুলিশ জানিয়েছিল, তানজিম সিবিকে এবং এর অধীন বিভিন্ন নামের কয়েকটি উপদলের নেতৃত্ব দিতেন। তখন এসব দলের বিরুদ্ধে ছিনতাই, চাঁদাবাজি, মাদক বিক্রি ও মোটরসাইকেলে মহড়ার অভিযোগ আনা হয়েছিল। দলগুলোয় আনুমানিক ৭৫০ সদস্য থাকার কথাও বলেছিল পুলিশ।

ডিবিএক্স (ডেডলি বয়েজ) এবং কেজিএস (কিং গ্যাংস্টার স্কোয়াড)-এ দু’টির পেছনে কারা, তা পুরোপুরি নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে কুমিল্লার আলোচিত কিশোর গ্যাং ‘কিং স্কোয়াডের’ সঙ্গে কেজিএসের কিছুটা মিল রয়েছে। আর ডিবিএক্স লেখাটির সামনে একই কালিতে লেখা রয়েছে ‘প্রিন্স নেহাল’।
দেয়ালের পাশাপাশি টিকটকের ভিডিও ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের গ্রুপের মাধ্যমে কিশোর-তরুণদের জড়ো করার তথ্য এসেছে। এরপর দলবদ্ধভাবে সড়কে নামা, মোটরসাইকেলে মহড়া ও অস্ত্র প্রদর্শনের ঘটনাও ঘটেছে।

পুরনো দল, নতুন উপদল: ২০১৫ সালের দিকে কুমিল্লায় কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা ব্যাপকভাবে আলোচনায় আসে। তখন তিন থেকে চারটি দল বেশি সক্রিয় ছিল। ২০২২ সালের দিকে আলোচিত দলের সংখ্যা বেড়ে অন্তত ২০টিতে দাঁড়ায়। বর্তমানে কিং স্কোয়াড, স্কোয়াড বা রতন গ্রুপ, ইগল, সিবিকে ও ক্রাইম সেটআপ বেশি আলোচনায় রয়েছে। অপু ও সাব্বিরের নামে আরও দু’টি দলের তথ্যও পাওয়া গেছে।

একই সদস্যের একাধিক দলের সঙ্গে চলাফেরার নজির রয়েছে। বড় দলের ভেতরে আলাদা নামে উপদলও তৈরি হয়েছে। পুলিশের হালনাগাদ তালিকা না থাকায় কতোটি দল এখন সক্রিয়, কার নেতৃত্বে কোনটি চলছে এবং সদস্যরা এক দল থেকে অন্য দলে যাচ্ছে কিনা— তার পূর্ণাঙ্গ চিত্র পাওয়া যাচ্ছে না। অনুসন্ধানে জানা যায়, কান্দিরপাড়, ধর্মসাগর, রানীর দীঘি, তালপুকুরপাড় ও আদালতপাড়া ঘিরে গ্যাংয়ের সংঘাতের তথ্য এসেছে। গত বছরের ২৫শে এপ্রিল কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষার সময় রানীর দীঘি, তালপুকুরপাড় ও আদালতপাড়ায় দেশীয় অস্ত্র নিয়ে কয়েকটি পক্ষ মহড়া দেয়। এতে পরীক্ষার্থী, অভিভাবক ও পথচারীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়ায়। ওই মহড়ায় সিবিকে ও ইগলের নাম আসে। দুইদিন পর যৌথ বাহিনী দুর্গাপুর ও রেসকোর্স এলাকায় ৯ জনকে গ্রেপ্তার করে। তাদের কাছ থেকে অস্ত্র ও গুলি উদ্ধার করা হয়।

চলতি বছরের মে মাসে ভাটারপুকুর, কাপ্তানবাজার, বৌবাজার, চানপুর ও সংরাইশ এলাকায় আরেকটি অস্ত্রের মহড়ার তথ্য পাওয়া যায়। কোতোয়ালি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তৌহিদুল আনোয়ার জানান, দলটির নাম ‘ক্রাইম সেটআপ’। কুমিল্লা বর্ডার গার্ড পাবলিক স্কুলের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম ১৮ই সেপ্টেম্বর দুপুরে কোটবাড়ির গন্ধমতী এলাকার বাসা থেকে বের হওয়ার পর নিখোঁজ হয়। পরদিন লালমাই পাহাড়ের নির্জন জঙ্গল থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। সে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক নাহিদা বেগমের একমাত্র সন্তান।

পুলিশের পাশাপাশি অভিযান চালিয়ে যাওয়ার কথা জানিয়েছে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়নও (এসআরবি)। এসআরবি-১১ এর সিপিসি-২ কুমিল্লার উপ-পরিচালক মেজর সাদমান ইবনে আলম বলেন, সাবেক র‍্যাব ও বর্তমান এসআরবি আগেও কুমিল্লায় কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়েছে। তারা সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের গ্রেপ্তার করে। মেজর সাদমান দাবি করেন, ‘আমরা মূলত গ্যাং কালচারে নেতৃত্বে থাকা কিশোর বা তরুণদের বেশি গ্রেপ্তার করেছি। এদের মধ্যে চলতি বছরেই অন্তত ২০ জন গ্যাং লিডারকে ধরা হয়েছে।’