ইরানের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা ও নৌ অবরোধ বহাল রাখতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই)। এতে তেহরানের সঙ্গে শান্তি আলোচনা পুনরায় শুরুর প্রচেষ্টা আরও জটিল হয়ে উঠেছে। একই সময়ে ইরানের হামলার কারণে উপসাগরীয় দেশগুলোর তেল রপ্তানিও হুমকির মুখে পড়েছে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুদ্ধ বন্ধের উদ্যোগে মধ্যস্থতাকারী দেশ কাতারসহ কয়েকটি দেশ আগামী সপ্তাহের শুরুতেই ওমানে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে আলোচনা আয়োজনের চেষ্টা করছে। এর লক্ষ্য হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেয়া এবং ধীরে ধীরে যুদ্ধের অবসান ঘটানো। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পও গত মঙ্গলবার জানিয়েছেন, দুই পক্ষের মধ্যে শিগগিরই আবার বৈঠক হতে পারে।
তবে পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলো সাধারণভাবে নতুন করে মার্কিন সামরিক অভিযান বাড়ানোর বিরোধিতা করলেও সৌদি আরব ও ইউএই নিষেধাজ্ঞা এবং নৌ অবরোধের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রকে ছাড় না দেয়ার আহ্বান জানাচ্ছে।
আলোচনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বরাত দিয়ে ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল জানিয়েছে, সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান সম্প্রতি মার্কিন কর্মকর্তাদের বলেছেন, ইরানকে নতুন একটি চুক্তিতে স্বাক্ষর করতে বাধ্য না করা পর্যন্ত নৌ অবরোধ বহাল রাখা উচিত।
এ অবস্থান কয়েক মাস আগের সৌদি নীতির তুলনায় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। গ্রীষ্মকালে সৌদি আরবসহ কয়েকটি আরব দেশ আলোচনার পক্ষে অবস্থান নিয়েছিল এবং হরমুজ প্রণালিতে ইরানের কিছু প্রভাব স্বীকার করে একটি সমঝোতার বিষয়েও তারা বিবেচনা করতে প্রস্তুত ছিল।
কিন্তু সৌদি জাহাজে ইরানের হামলা এবং লোহিত সাগর দিয়ে বিকল্প তেল রপ্তানি পথ সীমিত করতে হুতিদের প্রচেষ্টায় সেই আস্থায় ভাটা পড়েছে। ইউএই কর্মকর্তারাও এখন আলোচনার সম্ভাবনা নিয়ে কম আশাবাদী। তাদের দাবি, জাহাজ চলাচলে হামলা ও নতুন করে সহিংসতা প্রমাণ করছে, তেহরান দ্রুত কূটনীতিতে ফিরতে আগ্রহী নয়।
তারা আরও বলছেন, হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের স্থায়ী নিয়ন্ত্রণ মেনে নেয়া উপসাগরীয় দেশগুলোর জন্য গ্রহণযোগ্য নয়।
এদিকে ওমান ও কাতার ভিন্ন অবস্থান নিয়েছে। দেশ দুটি মনে করে, ধাপে ধাপে হরমুজ প্রণালি খুলে দেয়া এবং পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোর ওপর হামলা বন্ধ করাই চলমান যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে আসার বাস্তবসম্মত পথ।
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনকে কেন্দ্র করে কাতার মধ্যস্থতার উদ্যোগ জোরদার করেছে। গত রোববার ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী দোহা সফর করে বিভিন্ন প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা করেন। এর মধ্যে সাত দিনের জন্য যুদ্ধবিরতি এবং এর বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ তুলে নেয়ার প্রস্তাবও রয়েছে। অবরোধ প্রত্যাহার করা হলে ইরান জাহাজ চলাচলে হামলা বন্ধ করবে বলে প্রস্তাবে বলা হয়েছে।
তবে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মার্কিন কর্মকর্তারা কাতারকে বারবার জানিয়েছেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নৌ অবরোধ তুলে নেয়ার কোনো পরিকল্পনা করছেন না।
হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তা বলেন, নিষেধাজ্ঞা ও নৌ অবরোধ যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করেছে। তিনি বলেন, ‘সঠিক পরিস্থিতিতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে আলোচনা করতে আগ্রহী। তবে ইরানের সঙ্গে আলোচনায় বসার জন্য তার কোনো প্রয়োজন নেই।’
অন্যদিকে ইরানের অভ্যন্তরেও আলোচনার বিরোধিতা রয়েছে। তেহরানের আশঙ্কা, যুক্তরাষ্ট্র আলোচনা ব্যবহার করে মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর পর্যন্ত সময়ক্ষেপণ করতে পারে এবং এরপর আবার হামলা শুরু করতে পারে। অর্থনৈতিক চাপ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ইরানের কট্টরপন্থীরাও আরও কঠোর অবস্থান নিয়েছে।
আরব মধ্যস্থতাকারীদের বরাতে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানি কূটনীতিকরা বিভিন্ন প্রস্তাব দিয়েছে এবং অর্থনৈতিক সংকট আরও খারাপ হওয়ার বিষয়টি স্বীকার করেছে। তবে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর বা আইআরজিসি নতুন আলোচনার কাঠামো প্রত্যাখ্যান করেছে এবং দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতির কথা জানিয়েছে।
আইআরজিসি এমন একটি সমঝোতা চায়, যা জুনে হওয়া প্রাথমিক চুক্তির কাছাকাছি। এর মধ্যে তেল নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা, বিদেশে আটকে থাকা ইরানি সম্পদে প্রবেশাধিকার এবং হরমুজ প্রণালির ব্যবস্থাপনায় ইরানের ভূমিকা স্বীকার করার বিনিময়ে জলপথটি পুনরায় খুলে দেওয়ার বিষয় রয়েছে।
তবে যুক্তরাষ্ট্র মধ্যস্থতাকারীদের জানিয়েছে, তারা ওই চুক্তিতে ফিরবে না। ওয়াশিংটনের ধারণা, অব্যাহত অর্থনৈতিক চাপ তেহরানকে যুক্তরাষ্ট্র ও তার পারস্য উপসাগরীয় মিত্রদের জন্য আরও অনুকূল শর্ত মেনে নিতে বাধ্য করবে।
