স্বপ্নের অস্ট্রেলিয়া: কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীরা

স্বপ্নের অস্ট্রেলিয়া: কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীরা

ফন্ট সাইজ:

উচ্চশিক্ষা, আন্তর্জাতিক ডিগ্রি আর উন্নত ক্যারিয়ারের স্বপ্ন নিয়ে প্রতি বছর হাজারো বাংলাদেশি শিক্ষার্থী পাড়ি জমান অস্ট্রেলিয়ায়। বিমানবন্দরে নামার পর চোখে থাকে নতুন ভবিষ্যতের ছবি। কিন্তু সেই ছবির সঙ্গে বাস্তবতার দূরত্ব টের পেতে খুব বেশি সময় লাগে না। বাসস্থানের অনিশ্চয়তা, খণ্ডকালীন কাজের জন্য দীর্ঘ অপেক্ষা, বাড়তি জীবনযাত্রার ব্যয়, ভাষা ও সংস্কৃতির সঙ্গে মানিয়ে নেয়া এবং একাকীত্ব—সব মিলিয়ে অনেকের জন্য প্রথম কয়েক মাস পরিণত হয় টিকে থাকার পরীক্ষায়।

বিশ্বের অন্যতম শিক্ষাগন্তব্য অস্ট্রেলিয়া। মানসম্মত শিক্ষা, বহুসাংস্কৃতিক পরিবেশ এবং আন্তর্জাতিক কর্মক্ষেত্রে সুযোগের আকর্ষণে বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশের শিক্ষার্থীরা এখানে আসছেন। তবে সিডনি, মেলবোর্ন, ব্রিসবেন ও পার্থের মতো বড় শহরে আবাসন ও নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্যের ব্যয় বাড়ায় নতুনদের ওপর তৈরি হচ্ছে বাড়তি চাপ। বাসা ভাড়ার সঙ্গে খাবার, যাতায়াত, স্বাস্থ্যবিমা, মোবাইল, ইন্টারনেট ও শিক্ষা-সংক্রান্ত খরচ মেটাতে গিয়ে অনেককেই হিসাব করে প্রতিটি ডলার খরচ করতে হচ্ছে।

শিক্ষার্থীদের প্রথম ধাক্কা আবাসনে:
অস্ট্রেলিয়ায় পৌঁছে শিক্ষার্থীদের বড় একটি অংশের সামনে প্রথম যে প্রশ্নটি দাঁড়ায়, তা হলো—থাকবেন কোথায়?
বিশেষ করে সিডনিতে বাসা খোঁজা নতুনদের জন্য কঠিন অভিজ্ঞতা হয়ে উঠছে। বাড়তি জামানত, আয়ের প্রমাণ, পরিচয়পত্রসহ নানা শর্তের পাশাপাশি রয়েছে প্রচণ্ড প্রতিযোগিতা। ফলে অনেকেই স্থায়ী ঠিকানা পাওয়ার আগ পর্যন্ত অস্থায়ী আবাসনে থাকছেন। কেউ আবার কয়েকজন মিলে ছোট ঘর বা ফ্ল্যাট ভাগ করে নিচ্ছেন।
সিকিউ বিশ্ববিদ্যালয়ের সিডনি ক্যাম্পাসের বাংলাদেশি শিক্ষার্থী কাব্য কর নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে মানবজমিনকে বলেন, প্রত্যাশা আর বাস্তবতা এক নয়। বাসা পেলেও স্বস্তি মিলছে না অনেকের। অগ্রিম ভাড়া ও জামানতের অর্থ জোগাড় করতে গিয়ে শুরুতেই বড় অঙ্কের টাকা খরচ হয়ে যাচ্ছে। নতুন পরিবেশে এসে তখন হাতে থাকা সঞ্চয় দ্রুত কমতে থাকে।

চাকরি পেতে অপেক্ষার পালা :
শিক্ষার্থী কাব্য কর আরও বলেন, দেশ ছাড়ার আগে অনেকের ধারণা থাকে, অস্ট্রেলিয়ায় পৌঁছানোর পর দ্রুতই খণ্ডকালীন কাজ পাওয়া যাবে। বাস্তবে চিত্রটা ভিন্ন।
চাকরির বাজারে প্রতিযোগিতার পাশাপাশি প্রয়োজন হয় ইংরেজিতে কার্যকর যোগাযোগ, স্থানীয় কর্ম-অভিজ্ঞতা, আন্তর্জাতিক মানের রেজ্যুমে এবং কিছু ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট প্রশিক্ষণ বা সনদ। এসব প্রস্তুতি না থাকলে আবেদন করেও সাড়া পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে কেউ কয়েক সপ্তাহ, আবার কেউ কয়েক মাস পর্যন্ত কাজের অপেক্ষায় থাকেন। আয় না থাকায় তখন পরিবারের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ আনতে হয়। অনেকেই পুরোনো সঞ্চয় ভেঙে দৈনন্দিন ব্যয় চালান বলে তিনি জানান।

এক আয়ে কতটা সামলানো যায়:
ভিক্টোরিয়ান ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজি এর সিডনি ক্যাম্পাসের বাংলাদেশি শিক্ষার্থী জালাল উদ্দীন নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বলেন, আবাসন ও কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তার সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে পড়াশোনার ব্যস্ততা। ক্লাস, অ্যাসাইনমেন্ট, পরীক্ষা এবং গবেষণার পাশাপাশি খণ্ডকালীন কাজ চালিয়ে যাওয়া অনেকের জন্য কঠিন হয়ে পড়ে। বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক চাপের সঙ্গে যখন ভাড়া, খাবার, যাতায়াত, স্বাস্থ্যবিমা ও অন্যান্য বিলের হিসাব যুক্ত হয়, তখন অবসর বা বিশ্রামের সময়ও কমে যায়। সীমিত আয়ে চলতে গিয়ে কেউ খাবার ও বিনোদনের খরচ কমাচ্ছেন, কেউ দূরের এলাকায় বাসা নিয়ে যাতায়াতের অতিরিক্ত সময় মেনে নিচ্ছেন।

দূরদেশে একাকীত্বও বড় বাস্তবতা:
জালাল উদ্দীন আরও জানান, অর্থনৈতিক চাপের পাশাপাশি নতুন পরিবেশে মানিয়ে নেয়াও বড় চ্যালেঞ্জ। পরিবার-পরিজন থেকে হাজার মাইল দূরে থাকা, পরিচিত সামাজিক পরিমণ্ডলের অভাব, ভাষাগত সীমাবদ্ধতা এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা অনেকের মধ্যে মানসিক চাপ তৈরি করছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এ সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের কাউন্সেলিং, শিক্ষার্থী সহায়তা ও ক্যারিয়ার সেবা কাজে লাগানো গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি বন্ধু, সহপাঠী, বাংলাদেশি কমিউনিটি এবং স্থানীয় সামাজিক নেটওয়ার্কের সঙ্গে যোগাযোগ নতুন পরিবেশে মানিয়ে নেয়ার পথ সহজ করতে পারে।

বাড়ছে শুরুতেই খরচ:
আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য অস্ট্রেলিয়ায় আসা প্রাথমিক ব্যয়ও কম নয়। সম্প্রতি শিক্ষার্থী ভিসার আবেদন ফি ২৫ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে। একই সঙ্গে বাধ্যতামূলক ওভারসিজ স্টুডেন্ট হেলথ কভার—ওএসএইচসির খরচও বেড়েছে। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের টিউশন ফির বাইরে দেশটিতে যাওয়ার প্রস্তুতি পর্বেই শিক্ষার্থীদের বাড়তি অর্থের সংস্থান করতে হচ্ছে।

ভিসা নীতিতেও নতুন বাস্তবতা
বাসা, চাকরি ও ব্যয়ের চাপের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য ভিসা নীতিতেও এসেছে পরিবর্তন। গত ১৭ সেপ্টেম্বর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী টনি বার্ক শিক্ষার্থী ও অন্যান্য অস্থায়ী ভিসায় একাধিক সংস্কারের ঘোষণা দেন। এর মধ্যে অধিকাংশ শিক্ষার্থীর পরিবারের সদস্য আনার সুযোগ সীমিত করা এবং একই পর্যায়ের কোর্স বদলে অবস্থানের মেয়াদ বাড়ানোর প্রবণতা ঠেকানোর পরিকল্পনা রয়েছে। তবে নির্দিষ্ট কোর্স ও শিক্ষার্থীদের জন্য ব্যতিক্রম থাকছে।
ফলে অস্ট্রেলিয়ায় পড়তে যাওয়ার আগে বিশ্ববিদ্যালয় ও খরচের পাশাপাশি কোর্স নির্বাচন, ভবিষ্যৎ শিক্ষাগত পরিকল্পনা এবং ভিসার শর্ত সম্পর্কেও স্পষ্ট ধারণা রাখা জরুরি।

যাওয়ার আগে প্রস্তুতিই সুরক্ষা:
সংশ্লিষ্টদের মতে, অস্ট্রেলিয়ায় পড়তে যাওয়ার সিদ্ধান্ত শুধু বিশ্ববিদ্যালয় ও বিষয় নির্বাচনের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা উচিত নয়। অন্তত কয়েক মাসের ব্যয় বহনের মতো অর্থ হাতে রাখা জরুরি। একই সঙ্গে আগেভাগে আবাসনের ব্যবস্থা, আন্তর্জাতিক মানের রেজ্যুমে তৈরি এবং ইংরেজিতে যোগাযোগ দক্ষতা বাড়ানোর প্রস্তুতি নিতে হবে। কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে কী ধরনের শিক্ষার্থী সহায়তা, কাউন্সেলিং ও ক্যারিয়ার সেবা রয়েছে—সেটিও আসার আগে জেনে নেয়া প্রয়োজন। অস্ট্রেলিয়ায় থাকা বাংলাদেশি ও স্থানীয় কমিউনিটির সঙ্গে যোগাযোগ তৈরি করতে পারলে নতুন পরিবেশে কাজ ও জীবন—দুই ক্ষেত্রেই মানিয়ে নেওয়া সহজ হতে পারে।
অস্ট্রেলিয়ার একটি আন্তর্জাতিক ডিগ্রি ভবিষ্যতের দরজা খুলে দিতে পারে। কিন্তু সেই দরজায় পৌঁছানোর পথ সবসময় মসৃণ নয়। নতুন শহরে প্রথম রাতের থাকার জায়গা থেকে শুরু করে প্রথম চাকরি, প্রথম বেতন এবং পড়াশোনার খরচ—প্রতিটি ধাপেই বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয় শিক্ষার্থীদের।