৬ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত নতুন সেতু ও সংযোগ সড়ক খুলে দেয়ার দু’মাসের মধ্যে ধসে বেহাল দশায় চলাচলের অযোগ্য হয়ে পড়েছে। এতে দুর্ভোগে পড়া হাজারো মানুষের মধ্যে ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। পঞ্চগড় জেলার বোদা উপজেলার ঝলইশালশিরি ইউনিয়নের ধরধরা এলাকায় টাঙ্গন নদীর ওপর প্রায় ৪ বছর ধরে চলা কাজ তিনবার সংশোধন শেষে চলাচলের জন্য ওই সেতু ও সংযোগ সড়ক উন্মুক্ত করা হয়। এত টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই জনগুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো উদ্বোধনের আগেই এভাবে ধসে পড়ার জন্য ঠিকাদার ও স্থানীয় প্রকৌশলীদের যোগসাজশকে দায়ী করছেন ভুক্তভোগী এলাকাবাসী। তারা দ্রুত এই সংযোগ সড়কটি টেকসইভাবে সংস্কারের দাবি জানিয়েছেন।
সরজমিন দেখা যায়, টাঙ্গন নদীর উপর নবনির্মিত সেতু ও সংযোগ সড়কটি রাতের হালকা বৃষ্টিতে সেতুর উভয় পাশের ২০০ মিটারের হেরিংবোন (ইটের) ধসে পড়ে যান চলাচল ও মানুষের যাতায়াত অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, শুরু থেকেই এই কাজে চরম অনিয়ম ও নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার করা হয়েছে। কিছুদিন আগে সেতুটি আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করতে গিয়েছিলেন পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ। সে সময় এলাকাবাসীর একের পর এক অভিযোগের মুখে তিনি সেতু উদ্বোধন না করেই ফিরে যান। একই সঙ্গে কাজের এমন দুরবস্থা দেখে ক্ষোভ প্রকাশ করে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে পঞ্চগড় স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) জেলা নির্বাহী প্রকৌশলীকে নির্দেশ দেন। সেই ঘটনার ভিডিও ও খবর সে সময় বিভিন্ন মাধ্যমে ব্যাপক ভাইরাল হয়।
এলাকাবাসী ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, এর আগেও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে সেতু সংলগ্ন টাঙ্গন নদী থেকে অবৈধভাবে ড্রেজার মেশিন দিয়ে বালু তুলে রাস্তা ভরাট ও মেরামতের অভিযোগ ওঠেছিল। স্থানীয় ইউপি সদস্য প্রিয়নাথসহ একাধিক বাসিন্দা জানান, নদী থেকে ড্রেজার দিয়ে বালু তুলে ফিলিং (ভরাট) করলে রাস্তা আরও বেশি মজবুত ও টেকসই হবে-এমন যুক্তি দেখিয়ে এলাকাবাসীকে বুঝিয়েছিলেন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মালিক ও এলজিইডি’র মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা। তাদের এই আশ্বাসের ওপর ভরসা করেই স্থানীয়রা তখন কাজ করতে বাধা দেননি। কিন্তু নদী থেকে তোলা নরম বালুর ওপর তড়িঘড়ি করে ইটের হেরিংবোন রাস্তা করার কারণেই হালকা বৃষ্টিতেই তা ধসে পড়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা শিক্ষক মফিজুর রহমান ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ৪ বছরে অধিক সময় ধরে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলা এ কাজটি মাত্র দুই মাস আগে চলাচলের জন্য খুলে দেয়া হয়েছিল। কিন্তু সামান্য হালকা বৃষ্টিতেই এই রাস্তা যেভাবে তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়েছে তাতে পরিষ্কার বোঝা যায় এখানে এলজিইডি’র তদারকির অভাব ছিল এবং ঠিকাদার চরম জালিয়াতি করেছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে এলজিইডি’র বোদার সহকারী প্রকৌশলী আকরাম হোসেন ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে বলেন, সেতুর দুইদিকের প্রায় ২০০ মিটারের হেরিংবোন রাস্তাটি বৃষ্টিতে ভেঙে পড়েছে।
ইতিমধ্যেই রাস্তাটি চলাচলের উপযোগী করতে সংস্কারের ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। এত অল্প সময়ের ব্যবধানে রাস্তাটি এভাবে ধসে যাবে তা আমরাও ভাবিনি। নিম্নমানের কাজের পেছনে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কী ধরনের গাফিলতি ছিল তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তিনি আরও জানান, সেতুর আটোয়ারী অংশের রাস্তাটি হেরিংবোনের পরিবর্তে স্থায়ীভাবে পাকা (কার্পেটিং) করার জন্য একটি নতুন বরাদ্দের প্রস্তাবনা পাঠানো হয়েছে। এলজিইডি’র নির্বাহী প্রকৌশলী শফিউল ইসলাম বলেন, বিষয়টি জানার পরপরই আমরা সেখানে যান চলাচল স্বাভাবিক করার উদ্যোগ নিয়েছি। সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে এখনো চূড়ান্ত বিল দেয়া হয়নি। তদন্তে যদি ঠিকাদারের গাফিলতি বা কাজের নিম্নমানের প্রমাণ মেলে তাহলে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে। উল্লেখ্য, এই প্রকল্পের নির্মাণ কাজের দায়িত্বে ছিল ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান-এমএস করপোরেশন।
